হারান ঘোষ বলতে লাগল, দ্যাশ থিকা আইলাম ইন্ডিয়ায়। ভাবলাম চৈদ্দ পুরুষের ভিটামাটি তো পাকিস্থানে ফালাইয়া আইছি। এইহানে হগল পামু। কিন্তুক
শুনতে শুনতে মন ভারী হয়ে গিয়েছিল বিনয়ের। জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কী?
পাকিস্থানে একবার রিফুজ হইছি। আসামে গিয়া হইলাম আরও তিন বার। অথচ দ্যাখেন গিয়া কপিলি নদী, কলং নদী, ব্রহ্মপুত্তের চর, শিরচরের দিকে ময়মনসিংয়া মুসলমানে ভইরা গ্যাছে। আমাগো লাখান রিফুজগো লেইগাই খালি জাগা নাই। এর মধ্যে কম্পার্টমেন্ট থেকে অনেকে নেমে এসে গোল হয়ে বিনয়দের ঘিরে ধরেছে। বিনয়ের সঙ্গে হারান ঘোষকে কথা বলতে দেখে তারা আম্বিত। ওদের হয়তো ধারণা হয়েছে, হারানের যদি কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়, বিনয়কে ধরলে তাদেরও একটা গতি হবে। সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে, বাবু, আমরাও আসামে গিয়া তিন চাইর বার কইরা রিফুজ হইছি।
বিনয় দ্রুত ভিড়ের লোকজনকে দেখে নেয়। তারপর একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করে, আপনাদের দেশ ছিল কোথায়?
কেউ বলে, বরিশাল, কেউ ফরিদপুর, কেউ ময়মনসিং, কেউ বা নোয়াখালি। পূর্ব পাকিস্তানের নানা ডিস্ট্রিক্ট থেকে আসামে উদ্বাস্তু গেছে। কোনও একটা বিশেষ অঞ্চল থেকে নয়।
বিনয় জানতে চায়, ওখানে সরকারি সাহায্য টাহায্য কিছু পেয়েছেন?
সাহাইয্য! কী যে কন! একহান ফুটা পহাও (পয়সা) পাই নাই।
লোকগুলো আরও জানায়, নানা জাতের মানুষ-কামার কুমোর ছুতোর নাপিত–পূর্ব বাংলায় থাকতে যে যা করত, আসামে গিয়েও তাই শুরু করেছিল। তবে শতকরা নব্বই ভাগই ফাঁকা জমিতে চাষবাস করছিল। ওখানকার মাটি ভাল। প্রচুর ধান পাট ফলে। দেশ হারানোর দুঃখ তাদের অনেকটাই লাঘব হয়ে যেতে পারত। কিন্তু স্থানীয় মানুষজন অর্থাৎ আসামের ভূমিপুত্ররা চায় না উদ্বাস্তুরা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকুক, তাদের রুজি-রোজগারে ভাগ বসাক। তাই প্রথম দিকে শাসানি শুরু করল, তারপর দল বেঁধে হামলা। ধান রুইবার পর চারা বেরুলে নষ্ট করে দিত। কোথাও বা ধান পাকলে রাতারাতি কেটে নিয়ে যেত। সর্বক্ষণ ত্রাস, সর্বক্ষণ অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে তো বাস করা যায় না। অগত্যা আসামের ভরসা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের দিকে তারা পা বাড়াল। কীভাবে শেষ অবধি কলকাতায় এসে পৌঁছেছে তারও সবিস্তার বিবরণ দিল।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের কলকাতায় চলে আসার জন্য বন্দোবস্ত করা হয়েছিল দেশভাগের ঠিক পরে পরেই। তাদের আলাদা স্টিমার। আলাদা ট্রেন। সেগুলোর মার্কামারা একটা নামও দেওয়া হয়েছে।রিফিউজিস স্পেশাল। এই ট্রেন এবং স্টিমারে অন্য কোনও প্যাসেঞ্জার ভোলা হয় না।
কিন্তু আসাম থেকে উৎখাত হওয়া উদ্বাস্তুদের জন্য ওই ধরনের ট্রেনের কোনও বন্দোবস্ত নেই। এই নতুন ইহুদির দল আমিনগাঁ স্টেশনে এসে দুদিন পড়ে ছিল। সেখান থেকে আসাম মেল ধরে রাজাভাতখাওয়ায় এসেছে। কারও টিকেট নেই। রেলের লোকেরা জোর করে তাদের নামিয়ে দেয়। রাজভাতখাওয়ায় একদিন কাটিয়ে ফের ট্রেন ধরে কাটিহার। কাটিহার থেকে মণিহারি ঘাট হয়ে সাহেবগঞ্জ। সেখান থেকে ফের ট্রেন এবং শিয়ালদা। খেপে খেপে ছদিন লাগল এখানে পৌঁছতে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, আপনাদের কী মনে হয়, পাকিস্ত্রনের যে রিফিউজিরা আসামে গিয়েছিল তারা সবাই পশ্চিমবাংলায় চলে আসবে?
লোকগুলো বেশ ধন্দে পড়ে যায়। এ প্রশ্নের সঠিক জবাব তাদের জানা নেই।
হারান ঘোষ বলল, হগলে আইব কি না কইতে পারুম না। তয় (তবে) আসামের ইস্টিশানে ইস্টিশানে কইলকাতার ট্রেন ধরনের লেইগা ম্যালা মাইনষেরে বইয়া থাকতে দেখছি।
বিনয়দা-বিনয়দা গলার স্বর উঁচুতে তুলে ভিড় ঠেলতে ঠেলতে অমর এসে হাজির। তার কাঁধ থেকে একটা ঢাউস ক্যামেরা ঝুলছে। সে নতুন ভারত-এর একজন প্রেস ফোটোগ্রাফার।
হারান ঘোষদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফোটো তোলার ব্যাপারটা খেয়াল ছিল না বিনয়ের। বলল, যাক, তুমি এসে গেছ।
প্রসাদদা পাঠিয়ে দিলেন। বাস পেতে দেরি হচ্ছিল, নইলে আধঘন্টা আগে পৌঁছে যেতাম। বলুন, কী ছবি তুলব।
হারানদের দেখিয়ে বিনয় বলে, আগে এদের ছবি নাও। তারপর যে তিনটে কামরায় রিফিউজিরা রয়েছে সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, প্রত্যেকটা কম্পার্টমেন্টে উঠে যতগুলো পার, ভেতরকার ছবি তুলবে। ডেভলাপ করার পর ওদের মুখগুলো যেন স্পষ্ট বোঝা যায়।
অমর করিতকর্মা ছেলে। ক্যামেরা বাগিয়ে চটপট কাজ শুরু করে দিল।
হারান ঘোষের ছবি ভোলা হলে সে বিনয়কে বলে, ছুটোবাবু ছয়দিন ছান (স্নান) নাই, দুগা (দুটি) চিড়ামুড়ি ছাড়া প্যাটে কিছু পড়ে নাই। আমাগো কথা না হয় ছাড়ান দ্যান, কিন্তুক, পোলাপানগুলান খিদায় জবর কাতর অইয়া পড়ছে। খাইতে না পারলে বাঁচব না।
বিনয় ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকটা তার মাথায় ছিল না। এত মানুষকে সে তো আর খাওয়াতে পারবে না। যা করার ত্রাণ এবং পুনর্বাসন দপ্তরকেই করতে হবে। বলল, আসুন তো আমার সঙ্গে
খানিক দূরে অলোকপ্রসাদ এবং অন্য অফিসারেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তিন কামরার উদ্বাস্তু ছাড়া ট্রেনের বাকি প্যাসেঞ্জাররা লটবহর নিয়ে চলে গেছে। হারান ঘোষদের নিয়ে বিনয় সোজা অলোকপ্রসাদের কাছে চলে আসে। বলে, স্যার, আসামের এই রিফিউজিরা ছদিন প্রায় কিছু খায়নি। ওদের
