ট্রেন স্টেশনে ঢুকে পড়ল। বিশাল ইঞ্জিন লম্বা দৌড় শেষ করে এখন ফোঁস ফোঁস শ্বাস ছাড়ছে।
এই ট্রেনটা পুরোপুরি রিফিউজি স্পেশাল নয়। তিনটে কামরায় রয়েছে আসামের উদ্বাস্তুরা। বাকিগুলোতে অন্য প্যাসেঞ্জার।
বিনয় চকিতে একবার প্ল্যাটফর্মের দূর প্রান্তে তাকায়। প্রসাদ মেস থেকে বেরুবার সময় বলেছিলেন, নতুন ভারত-এ গিয়েই একজন ফোটোগ্রাফার পাঠিয়ে দেবেন। হয়তো স্বপন কিংবা অমর আসবে। কিন্তু এখনও তাদের পাত্তা নেই।
বিনয় আর দাঁড়াল না, সোজা উদ্বাস্তুদের কম্পার্টমেন্টগুলোর সামনে চলে এল। বাচ্চাকাচ্চা, যুবক-যুবতী, বুড়োবুড়ি–নানা বয়সের মানুষে তিনটে কামরা বোঝাই।
বিনয় তো এই প্রথম উদ্বাস্তু দেখছে না। সারি সারি ক্ষয়াটে, আতঙ্কগ্রস্ত সব মুখ। চোখ এক আঙুল গর্তে, গাল ভেঙে হাড় বেরিয়ে পড়েছে। ঘোলাটে দৃষ্টি। পরনে নোংরা জামাকাপড়। আশাহীন, ভবিষ্যৎহীন মানুষের একটা দঙ্গল।
কেউ ট্রেন থেকে নামেনি নতুন জায়গায় এসে। উদ্ভ্রান্তের মতো বসে আছে। একেবারে বোবা। বাচ্চাগুলো কিন্তু পরিত্রাহি চেঁচিয়ে চলেছে।
মাঝবয়সী একটা লোক তার কামরার জানালার ধারে বসে বিহ্বল দৃষ্টিতে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে ছিল। বিনয় তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী নাম?
লোকটা চমকে ওঠে। হঠাৎ একটি যুবক কলকাতায় পৌঁছতে না পৌঁছতে তার নাম জানতে চাইবে, এটা ভাবতে পারেনি। এর পেছনে কোনও অভিসন্ধি রয়েছে কি না, কে জানে। ত্রস্তভাবে সে জিজ্ঞেস করে, নাম জিগান ক্যান?
সহৃদয় ভঙ্গিতে বিনয় বলে, ভয় নেই, বলুন
একটু চিন্তা করে লোকটা বলেই ফেলল, মহাদেব শীল
দেশ ছিল কোথায়?
ফরিদপুরে। গেরামের নাম আশুগঞ্জ। পালংয়ের কাছে।
পরিবারে কতজন মানুষ?
পাঁচজন। আমি, আমার বউ আর তিন পোলা-মাইয়া।
এখন তো আসাম থেকে আসছেন?
আস্তে মাথা নাড়ে মহাদেব। প্রাথমিক ভয় কেটে যাচ্ছে তার। ক্রমশ স্বাভাবিক হচ্ছে। সে বলল, হ। উইহানে আর থাকন গ্যাল না। আসলে
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল মহাদেব, হঠাৎ কেউ ডেকে ওঠে, ছুটোবাবু না?
বিনয় অবাক। ডাকটা এসেছে কামরার ভেতর থেকে। কে হতে পারে? জানালা দিয়ে ভেতরে মুখ বাড়াতেই চোখে পড়ল। হারান ঘোষ। চেনা মুখ। সুজনগঞ্জের হাটে প্রথম যেদিন বিনয় যায়, অবনীমোহন, যুগল আর সে হারানের মিঠাইয়ের দোকানে রসগোল্লা, পানতুয়া আর মাঠা খেয়েছিল। সেই সঙ্গে একদলা ধবধবে মাখন। দইয়ের ঘোলকে যে পূর্ব বাংলায় মাঠা বলে সেই প্রথম জেনেছিল।
তারপর যতবার সুজনগঞ্জে গেছে, হারান ঘোষের দোকানে গিয়ে মিষ্টি খেয়েছে। মাথায় মাঝারি, গোলগাল চেহারায় সামান্য থলথলে ভাব-এই ছিল সেদিনের হারান। এখন তাকে চেনাই যায় না। শরীর ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কণ্ঠমণি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। হাড়ের ওপর খসখসে, জিলজিলে। চামড়া জড়ানো।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিনয় কলকাতায় আসার অনেক আগেই হারান ঘোষরা ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিল। তবে কোথায় কোন দিকে ছিটকে পড়েছিল, জানত না। তাকে একরকম ভুলেই গিয়েছিল সে।
আসাম থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জটলায় হারানকে দেখা যাবে, ভাবাই যায়নি। বিনয় বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকে।
হারান ঘোষ আচমকা হাউ হাউ কান্না জুড়ে দেয়। জড়ানো, দুর্বোধ্য স্বরে একনাগাড়ে কী বলে। যায়, তার একটি বর্ণও বোঝা যায় না।
বিনয় হতচকিত। বলে, কাঁদবেন না, কাঁদবেন না। নিচে নেমে আসুন- বয়সে অনেক বড়। দেশে থাকতে হারানকে আপনি করে বলত সে।
হারান ঘোষ কামরার ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। কান্না চলছিলই। তার মধ্যেই, গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে নিয়ে বলে, আমরা অ্যাকেরে (একেবারে) শ্যাষ ছুটোবাবু। বাইচা থাকনের আর আশা-ভরসা আছিল না। আপনেরে শিয়ালদার ইস্টিশনে দেইখা অকূলে কূল পাইলাম। আমাগো রক্ষা করেন ব্যাকুলভাবে বিনয়ের দুহাত জড়িয়ে ধরে সে।
অথই নৈরাশ্য আর দুর্ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে বিনয়কে পেয়ে আলোর ক্ষীণ একটা রশ্মি যেন হারানের চোখে পড়েছে। তার শেষ অবলম্বন।
বিনয় জানে, ছিন্নমূল মানুষেরা সীমান্তের এপারে এসে এই পশ্চিমবঙ্গেই কীভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হারান ঘোষকে তা বলে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেওয়া যায় না। তার মনে সাহস জাগিয়ে তোলার জন্য বলল, শান্ত হোন। পাকিস্তান থেকে যারা আসছে, সরকার তাদের জন্যে খুবই চেষ্টা করছে। আপনাদেরও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এই স্টেশনে বড় বড় সরকারি, অফিসাররা রয়েছেন। তাদের আমি বলে দেব। বলতে বলতে বিনয়ের ভেতরকার নবীন সাংবাদিকটি তৎপর হয়ে ওঠে। আসামের এই উদ্বাস্তুদের নিয়ে অফিসে ফিরে গিয়ে একটা প্রতিবেদন খাড়া করতে হবে। তাই তথ্য দরকার।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, অনেকদিন আপনাদের খবর জানি না। দেশ ছেড়েছিলেন কবে?
সরকারি অফিসারদের বিনয় বলে দেবে, তা শোনার পর থেকে উদ্ভ্রান্ত ভাব অনেকটাই কেটে গেছে হারান ঘোষের। চোখ মুছে বলল, বচ্ছর দ্যাডেক (দেড়েক) আগে। আপনেগো রাইজদায় (রাজদিয়ায়) অশান্তি হয় নাই। কিন্তুক আমাগো সুজনগঞ্জের উই দিকের গেরামগুলায় জবর গণ্ডগোল, অইছে।
ঢাকা বরিশাল নোয়াখালি ফরিদপুর–অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর মুখে যা শোনা। গেছে বা যাচ্ছে, হারান ঘোষ হুবহু তাই বলতে লাগল। সেই একই আতঙ্কের বিবরণ। হুমকি, আগুন, ধর্ষণ, হত্যা। তার অনিবার্য পরিণতি যা হয়–সুজনগঞ্জ এবং তার চারপাশের গ্রামগুলো ফাঁকা করে মানুষ ইণ্ডিয়ায় চলে যেতে থাকে। হারানরা গেল আসামে। প্রথমে উঠেছিল বরপেটায়। সেখানে– টেকা গেল না। বউ-ছেলেমেয়ের হাত ধরে সেখান থেকে পাড়ি দিল হোজাইতে। তারপর দরং। কোথাও পাঁচ মাস। কোথাও দু মাস। কোথাও ছ মাস। যেখানেই গেছে থিতু হয়ে বসার সময় পায়নি। খালি খেদানি। খেদানি। খেদানি। আসামের চৌহদ্দি ছেড়ে ভাগো।
