বলরাম লক্ষ রাখছিল। জিজ্ঞেস করল, যেটা খাইলে সোটা কন জিনিস কহন্তু
বলরাম ওড়িয়া বললেও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। বিনয় বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না।
বলরাম ভুরু দুটো সামান্য নাচিয়ে ছড়া কাটল :
পিলাটি দিনরে (ছেলেবেলায়) মুণ্ডরে টুপি
কুষ্ণ অবতারে মহিলা গুপি।
রাম অবতারে রাবণ মারি
আজি হইথিলা সেই তরকারি।
কিছুই বোধগম্য হল না। হাঁ করে বলরামের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
প্রসাদ পাশ থেকে হেসে হেসে বললেন, বুঝলে না তো?
না
প্রসাদ বুঝিয়ে দিলেন। কচি বাঁশের কোঁড় যখন বেরোয়, তার ওপর মাটির হাঁড়ি চাপা দেওয়া হয়। বাঁশটি হাঁড়ির ভেতর বাড়তে বাড়তে গোলাকার হয়ে আটকে থাকে। তখন সেটা বার করে কেটে কুটে ঘি গরম মশলা দিয়ে উপাদেয় ব্যঞ্জন তৈরি করা হয়। এই মুহূর্তে তাই দিয়েই ভাত খাচ্ছে বিনয়। সে বলল, কিন্তু রাম, কৃষ্ণ–এঁদের সঙ্গে তরকারির কী সম্পর্ক?
প্রসাদ বললেন, রাম অবতারে এই বাঁশ দিয়ে তীর ধনুক তৈরি করে রাবণকে মারা হয়েছিল। সেই বাঁশই কৃষ্ণের হাতে বাঁশি হয়েছে। তাই ছড়াটাকে রহস্যময় করে তোলার জন্য রাম, রাবণ আর কৃষ্ণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এবার মাথায় ঢুকল?
বিনয় হেসে ফেলল। ঢুকেছে। বলরামকে খুব ভাল লেগে গেল তার। বেশ মজাদার মানুষ। কিছুক্ষণের জন্য আসামের চিন্তাটা সে ভুলিয়ে রাখল।
খাওয়া দাওয়ার পর প্রসাদরা রসা রোডে এসে বাস ধরল। ধর্মতলায় পৌঁছবার পর গাড়ি বদলে প্রসাদ চলে গেলেন নতুন ভারত-এর অফিসে। বিনয় এল শিয়ালদায়।
শিয়ালদার লেশমাত্র পরিবর্তন নেই। সেই এক দৃশ্য। অজস্র মানুষ থিক থিক করছে চারদিকে। সর্বক্ষণ ঝগড়াঝাটি, চিৎকার। বাতাসে দুর্গন্ধ অনড় হয়ে আছে। সমস্ত কিছু নোংরা, দুষিত, কুৎসিত।
মেন স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি সরকারি রিলিফ অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের অস্থায়ী অফিস। সেখানে আসতে অলোকপ্রসাদ সেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি এখানকার অফিসের দায়িত্বে রয়েছেন। উদ্বাস্তুদের জন্য সৌম্য, ভদ্র, হৃদয়বান এই মানুষটির অপার সহানুভূতি।
প্রথম যেদিন রামরতন গাঙ্গুলির মৃতদেহ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিনয় শিয়ালদায় এসেছিল সেদিনই অলোকপ্রসাদের সঙ্গে তার আলাপ। তারপর যতবার সে এই স্টেশনে এসেছে, তার সঙ্গে দেখা করেছে। বয়স্ক মানুষটি বিনয়কে যথেষ্ট স্নেহ করেন। সে যে খবরের কাগজে চাকরি পেয়েছে, সেটা জেনে গেছেন। উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়ে তাকে প্রচুর সাহায্য করেন।
গোড়ার দিকে বিনয়কে আপনি করে বলতেন অলোকপ্রসাদ। ঘনিষ্ঠতা হবার পর আপনিটা তুমি হয়ে গেছে।
অন্যদিন বিনয়কে দেখলে হই হই করে ওঠেন অলোকপ্রসাদ। আজ তাকে ভীষণ চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। বললেন, বোসো
বিনয় নিঃশব্দে একটা চেয়ারে বসে পড়ে।
তুমি কি খবরটা পেয়েছ?
আসাম থেকে উদ্বাস্তুদের চলে আসার কথা বলছেন কি?
হ্যাঁ।
পেয়েছি।
খুব খারাপ ব্যাপার। বিমর্ষ মুখে অলোকপ্রসাদ বলতে লাগলেন, ইস্ট বেঙ্গল থেকে রোজ রিফিউজি আসছে। তাদের নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। তার ওপর আসাম থেকে আসা বেড়ে গেল। সমস্যাটা বিরাট আকার নিচ্ছে। কলকাতার চারপাশের ক্যাম্পগুলো বোঝাই হয়ে গেছে। আসাম থেকে যারা আসছে তাদের কোথায় রাখা হবে, রিহ্যাবিলিটেশনের কী ব্যবস্থা করা যাবে, কে জানে।
দূরে গম গম আওয়াজ শোনা গেল।
অলোকপ্রসাদ এবং বিনয়, দুজনেই চকিত হয়ে ওঠে। ডিসটান্ট সিগনালের ওধারে সারা আকাশ কালো ধোঁয়ায় ভরে দিয়ে একটা ইঞ্জিন গাঁক গাঁক করতে করতে দৈত্যের মতো ছুটে আসছে।
অলোকপ্রসাদ বললেন, ওই বোধহয় আসামের ট্রেন এসে গেল।
.
৫৯.
সারা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের কয়েক হাজার উদ্বাস্তু বছরের পর বছর মুখ গুঁজে পড়ে আছে। সেই যে ঝিনুককে নিয়ে হেমন্তের রাত্তিরে রিফিউজিস স্পেশাল-এর গাদাগাদি। ভিড়ে এখানে এসে বিনয় নেমেছিল সেদিন যেমন দেখেছে আজও ছবিটা অন্যরকম কিছু নয়। অবিকল একই রয়ে গেছে।
আসাম থেকে নতুন উদ্বাস্তুরা যে আসছে সেই খবরটা কীভাবে যেন চাউর হয়ে গিয়েছিল। ট্রেন আসতে দেখে পুরানোদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। সবাই হইচই বাধিয়ে দেয়।
সমস্ত স্টেশনে তুমুল কলরোল। বিপুল জনতা একসঙ্গে চেঁচামেচি জুড়লে কিছুই বোঝা যায় না। দুর্বোধ্য শব্দপুঞ্জ থেকে এইটুকু শুধু শোনা যাচ্ছে–
আসাম থিকা নয়া রিফুজ আইতে আছে।
শিয়ালদায় আর পাও (পা) ফেলানের জাগা নাই। রিফুজে রিফুজে ঠাসা। হের উপুর মানুষ আইলে হেরা কই থাকব?
আসামে কী তাফাল (গোলমাল) যে হইল, ক্যাঠা জানে!
অলোকপ্রসাদ প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি চলে এলেন। সঙ্গে তার সহকারীরা রয়েছে। আর আছে পুলিশবাহিনী। ওদের সঙ্গে বিনয়ও এসেছে।
পুরানো উদ্বাস্তুরা যে যার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল। হয়তো কৌতূহলে, হয়তো উৎকণ্ঠায়। আসামে কী ধরনের সংকট হয়েছে তা জানার জন্য ওরা উদগ্রীব। পুলিশ ঠেলে, ধমকে ফের তাদের বরাদ্দ সীমানার ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এই-এই বাহার মাতৃ আও–পুরানো উদ্বাস্তুদের সঙ্গে নতুনরা মিলেমিশে দলা পাকিয়ে যাক, সেটা রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের লোকেরা অর্থাৎ অলোকপ্রসাদরা চাইছেন না। পুলিশবাহিনীকে সেই রকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
