হ্যাঁ। হোমটা নিয়ে লিখতেও বলেছেন।
বিরাট কাজে ওঁরা হাত দিয়েছেন। যেভাবে পারা যায়, ওঁদের সাহায্য করা উচিত। তুমি সব ইনফরমেশন জোগাড় করে ডিটেলে লিখে অ৫ কে দেবে। নির্যাতিত মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হরিচরণরা যা পরিকল্পনা করেছেন তা নিয়ে কালই বিশদভাবে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যে কারণে আজ বিনয়ের ক্যাম্প বা কলোনিতে যাওয়া বন্ধ করেছেন তার ধার-কাছ দিয়েও যাচ্ছেন না প্রসাদ। একরকম মরিয়া হয়েই কথাটা তুলল বিনয়।
প্রসাদ বললেন, ওটা আমি ভুলে যাইনি। এখনই তোমাকে বলতাম। হরিচরণবাবুর সঙ্গে কাল তোমার কী কথা হয়েছে, সেটা আগে জেনে নিলাম। একটু থেমে ফের শুরু করলেন, তুমি কাল অফিসে যাওনি। এদিকে ভীষণ খারাপ একটা খবর এসেছে।
বিনয় চমকে উঠে, কী খবর?
আসাম থেকে মাঝে মাঝে কিছু রিফিউজি চলে আসছিল। সংখ্যায় কম। কিন্তু কাল থেকে দলে দলে আসতে শুরু করেছে। বলতে পার ঢল নেমেছে। আজ দুটো আড়াইটা নাগাদ একটা ট্রেন এইরকম উদ্বাস্তু বোঝাই হয়ে শিয়ালদায় ঢুকবে। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে তুমি আর আমি বেরিয়ে পড়ব। তুমি সোজা শিয়ালদায় চলে যাবে। আমি অফিসে গিয়ে সেখানে একজন ফোটোগ্রাফার পাঠিয়ে দেব।
বিনয় চমকে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিন্নমূল মানুষের স্রোত নেমেছে ইন্ডিয়ায়। চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি খুইয়ে সীমান্ত পেরিয়ে তারা রোজই হাজারে হাজারে চলে আসছে। বেশির ভাগই অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে। আসামে এবং ত্রিপুরাতেও যাচ্ছে অজস্র। এ তো চলছেই।
উদ্বাস্তুদের নিয়ে আসামে সেই দেশভাগের পর থেকেই নানা ধরনের অশান্তি শুরু হয়েছিল। বিনয় তা জানে। কিছু উদ্বাস্তু সেখানে টিকতে না পেরে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছে। এমন কারও কারও সঙ্গে বিনয়ের দেখাও হয়েছে। কিন্তু ট্রেন বোঝাই হয়ে তাদের আসার খবরটা এই প্রথম শোনা গেল।
প্রসাদ থামেননি, যারা আসছে, তাদের কোন পরিস্থিতিতে আসাম ছাড়তে হল, ডিটেলে সব জেনে নেবে। ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে তাদের ছবি তোলাবে। তারপর অফিসে এসে বড় করে একটা রিপোর্ট লিখে দেবে।
বিনয় এতক্ষণে বুঝতে পারল, জবরদখল কলোনি বা ত্রাণশিবিরগুলোতে গিয়ে তথ্য জোগাড় করার চাইতেও আসাম থেকে চলে-আসা উদ্বাস্তুদের ব্যাপারটা এই মুহূর্তে অনেক বেশি জরুরি।
একটু ভেবে প্রসাদ ফের শুরু করলেন, আসাম থেকে সব উদ্বাস্তু যদি চলে আসতে থাকে ওয়েস্ট বেঙ্গলের সমস্যা মারাত্মক বেড়ে যাবে।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়। হ্যাঁ
.
মেসের খাওয়ার ঘরটা একতলায়। বারোটা নাগাদ চানটান সেরে প্রসাদের সঙ্গে সেখানে চলে এল বিনয়। বাইরে বেরুবার মতো পোশাক পরে, তৈরি হয়ে এসেছে দুজনে। খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে এখন থেকেই ওরা বেরিয়ে পড়বে।
খাবার ঘরে এই প্রথম এল বিনয়। কাল রাতে ওপরে তার ঘরে ভাত মাছ টাছ সুবলকে দিয়ে আনিয়ে নিয়েছিল। তাই নিচে আর নামা হয়নি।
ঘরটা বেশ বড় মাপের। সেটার তিন পাশে গায়ে গায়ে লাগা আরও তিনটে ঘর, সামনের সরু প্যাসেজের উলটো দিকে কিচেন। আলো-হাওয়া খেলে না। এই দুপুরবেলাতেও ভেতরটা অন্ধকার অন্ধকার। তাই মাথার ওপর দুটো বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। খুব সম্ভব সারাক্ষণই সে দুটো জ্বলে।
টেবল চেয়ার নেই। খাওয়ার ব্যবস্থা মেঝেতে বসে। দেওয়ালের ধার ঘেঁষে লাইন দিয়ে আসন পাতা।
শান্তিনিবাস এখন একেবারে নিঝুম। বোর্ডাররা অনেক আগেই যে যার কাজে বেরিয়ে গেছে।
খাওয়ার ঘরটা ফাঁকা। প্রসাদরা আসনে গিয়ে বসতেই একটি আধবয়সী লোক দৌড়ে এল। গোলগাল চেহারা, গোল মুখ, গাওয়া ঘিয়ের মতো গায়ের রং। ঝাকড়া চুল ঝুঁটি বাধা। পানের রসে মুখ টইটম্বুর। চোখে এবং ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি লেগে আছে। তার সঙ্গে রয়েছে একটা সতেরো আঠারো বছরের ল্যাংপেঙে ছেলে।
প্রসাদ ঝুঁটি-বাঁধা লোকটি এবং ছেলেটার সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। মাঝবয়সীটি। মেসের রাঁধুনী ঠাকুর। নাম বলরাম। আদি বাড়ি ওড়িশার বালেশ্বর জেলায়। পঁচিশ বছরেরও বেশি শান্তিনিবাস-এর রান্নাঘর সামলাচ্ছে। ছেলেটির নাম গণেশ। বলরামের সহকারী।
প্রসাদ বললেন, বিনয়বাবু মেসে নতুন এসেছেন। আমার পাশের ঘরে আছেন।
বলরাম মানুষটি খুবই বিনয়ী। ভদ্র। বলল, তাঙ্কর (তার) এইটি আসিবার কথা গতকালই ম্যানেজারবাবু কহিথিলা।
প্রসাদ বললেন, বাবু এই প্রথম মেসে থাকছেন। যত্ন করে খাইও
সে আপনাঙ্কর ভাবিবার কিছি দরকার নাই। প্রভু জগন্নাথ কুপায়ে মু তার সব ব্যবস্থা করি পারিবি।
আমাদের এখনই বেরুতে হবে। তাড়াতাড়ি খেতে দাও–
বলরামরা ব্যস্তভাবে বেরিয়ে গেল। একটু পর বড় কাঁসার থালায় ভাত, বাটিতে বাটিতে ডাল, তরকারি, মাছ ইত্যাদি এনে দুজনের সামনে সাজিয়ে দিল। কাঁসার গেলাসে দিল খাবার জল।
দ্রুত খাওয়া চলছে।
বলরাম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পলকহীন। তার রান্না নতুন বোর্ডারটির কেমন লাগছে, জানার জন্য ভীষণ উগ্রীব। জিজ্ঞেস করল, রসুই কিমিতি হেইচি বাবু?
সত্যিই বলরামের রান্নার হাত চমৎকার। বিনয় বলল, খুব ভাল।
বলরামের মুখ খুশিতে ভরে যায়। একটা বাটি থেকে পাতে তরকারি ঢেলে ভাত দিয়ে মেখে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে বিনয়ের মনে হল, স্বাদটা পরিচিত নয়। একটু অন্যরকম।
