জাফর শা রোডে থাকতে তার বাসি, ধামসানো বিছানা ঝেড়ে, বেডশিট টান টান করে পেতে দিত উমা কি সুধা। শান্তিনিবাস-এ উমাও নেই, সুধাও নেই। নিজের যাবতীয় কাজ বিনয়কেই করতে, হবে। আজ থেকেই তার স্বাবলম্বী হবার ট্রেনিং শুরু।
বিছানাটা মোটামুটি গোছগাছ করে গামছা, দাঁতের মাজন, জিভছোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিনয়। তার পাশের ঘরটাই প্রসাদের। ভেতর দিকের রেলিং-লাগানো লম্বা প্যাসেজ ধরে তেতলার চান ঘরের দিকে যেতে যেতে চোখে পড়ল, প্রসাদ তার ইজি চেয়ারটিতে বসে আছেন। সামনের নিচু টেবলটায় এক পাউন্ড ওজনের লম্বা লম্বা পাউরুটির স্তূপ। ছুরি দিয়ে খুব যত্ন করে সমান মাপে কেটে কেটে রাখছেন। টেবলের পাশে শোঁ শোঁ আওয়াজ তুলে কেরোসিনের স্টোভ জ্বলছে। স্টোভটার মাথায় মাখনের মস্ত একটা কৌটো।
প্রথম যেদিন শান্তিনিবাস-এ বিনয় আসে, অবিকল এইভাবেই প্রসাদকে পাউরুটি কাটতে দেখেছিল বিনয়। রুটি কাটা হল স্লাইসগুলোতে মাখন লাগানো হবে। এই এলাকার বস্তিগুলোতে যে শীর্ণ, খেতে না-পাওয়া, কালো কালো বাচ্চাগুলো থাকে, কিছুক্ষণের মধ্যে ঝাঁকে ঝাকে তারা হানা দেবে। প্রসাদ বলেছিলেন; এই বাচ্চাগুলো পেট ভরে খেতে পায় না। অপুষ্টিতে ভোগে। তাই
এই রুটি-মাখন বিতরণ। এটা প্রসাদের নিত্যকর্মপদ্ধতির মধ্যে পড়ে।
বিনয় দাঁড়ায় না। বাথরুমের কাজ সেরে নিজের ঘরে গিয়ে বাসি জামাকাপড় পালটে, গায়ে। চাদর জড়িয়ে প্রসাদের ঘরে চলে আসে।
মুখ তুলে এক পলক বিনয়কে দেখে প্রসাদ বললেন, এসে গেছ! গুড। আমাকে একটু হেল্প কর। রুটির স্নাইসগুলোতে মাখন লাগিয়ে চিনি ছড়িয়ে দাও।
সেদিনও বিনয়কে এই কাজটাই করতে হয়েছিল। চামচে করে গলা মাখন তুলে নিঃশব্দে রুটিতে মাখাতে থাকে সে।
প্রসাদ এবার বললেন, কাল অফিস থেকে ফিরে এসে দেখি তোমার ঘরের দরজা বন্ধ। তুমি ঘুমোচ্ছ। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। তাই আর ডাকিনি।
বিনয় বলল, একা একা ভাল লাগছিল না। আপনার জন্যে অনেকক্ষণ জেগে ছিলাম। তারপর সুবলকে দিয়ে রান্নাঘর থেকে ভাত টাত আনিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়েছি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, খেয়াল নেই।
আমার তো ফিরতে ফিরতে দেড়টা দুটো হয়ে যায়। নাইট ডিউটি না থাকলে তোমার ছুটি হবে অনেক আগে। কালই তো বলেছি আমার জন্যে অত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে না।
আচ্ছ বিনয় কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর খিচটা থেকে গেছে। কেন যে প্রসাদ তাকে আজ বেরুতে বারণ করলেন, বোঝা যাচ্ছে না। জিজ্ঞেস করে যে জেনে নেবে, তেমন সাহসও হচ্ছে না।
ম্যানেজারের কাছে শুনলাম, কাল হরিচরণবাবু এসেছিলেন। কেমন লাগল তাকে? প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন।
ভীষণ ভাল। অতবড় ফ্রিডম-ফাইটার, কিন্তু এতটুকু অহঙ্কার নেই।
প্রসাদ বললেন, শুধু তাই না, হানড্রেড পারসেন্ট আইডিয়ালিস্ট। এই তো সেদিন দেশ স্বাধীন হল। এর মধ্যেই বেশ কিছু পুরোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভোল পালটে গেছে। আদর্শবাদ টাদ শিকেয় তুলে আখের গোছাবার ব্যবস্থা করছে। লোভ, লোভ, লোভ। দেশের জন্যে একসময় কিছু করেছে, এখন সুদে-আসলে তার রিটার্ন চায়। শেষ জীবনটা যাতে সুখে আরামে কাটিয়ে দিতে পারে। বিনয়, খবরের কাগজে কাজ করছ। এদের অনেকেরই সঙ্গে তোমার পরিচয় হবে। তখন এই লোকগুলোর স্বরূপ বুঝতে পারবে। তবে হরিচরণবাবুর মতো পেট্রিয়টরা একেবারে অন্য ধাতের। সৎ, নির্লোভ।
কালই তা বুঝতে পেরেছিল বিনয়। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার মন অপার শ্রদ্ধায় ভরে যাচ্ছিল। বলল, দেশভাগটা উনি মেনে নিতে পারেননি। এই নিয়ে ওঁর ভীষণ ক্ষোভ।
হ্যাঁ। হরিচরণবাবুদের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক।
হই হই করতে করতে বোগা রোগা এক পাল ছেলেমেয়ে পাঁচ মিনিটের ভেতর তাদের ভাগের রুটি-মাখন নিয়ে কলর বলর করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় নেমে গেল। প্রথম যেদিন বিনয় এই মেসে আসে সেদিনও এই ছেলেমেয়ের দঙ্গলটা দেখেছিল।
এদিকে সুবল চা-বিস্কুট নিয়ে এসেছে। বিনয় আগেই শুনেছিল, মেস থেকে দুপুরে এবং রাত্তিরে ভাত দেওয়া হয়। আর সকাল-সন্ধেয় চা-বিস্কুট। কিন্তু জলখাবারটা বোর্ডারদের আলাদা কিনে খেতে হয়।
এখনও সকালের খাবার খাওয়া হয়নি। রুটি-মাখন বস্তির বাচ্চাদের জন্য। সে-সব প্রসাদ কোনও দিন খান না। চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী আনাব বল। লুচি ছোলার ডাল, না হিঙের কচুরি আর আলুর দম?
বিনয় আজ সেদিনের মতো প্রসাদের গেস্ট নয়, এই মেসেরই একজন বোর্ডার। অতিথি হলে আপ্যায়ন করতেন–ঠিক আছে। কিন্তু অন্য একটি বোর্ডারের জন্য অহেতুক খরচ করবেন, এতে ভীষণ সঙ্কোচ বোধ করছিল বিনয়। অথচ মুখের ওপর আপত্তি করা যাচ্ছে না। সে চুপ করে থাকে।
মুখ-চোখ দেখে বিনয়ের মনোভাব আঁচ করে নিয়ে প্রসাদ হালকা গলায় বললেন, খাওয়ার ব্যাপারে এত লজ্জা কীসের? ঠিক আছে, পরে তুমি একদিন আমাকে খাইয়ে দিও। সুবলকে দিয়ে দোকান থেকে চুরি আর মিষ্টি টিষ্টি আনিয়ে নিলেন।
খেতে খেতে ফের হরিচরণের প্রসঙ্গে ফিরে গেলেন প্রসাদ, উনি আর ওঁর কজন বন্ধু একটা বড় হোম করছেন। ইস্ট পাকিস্তানে দাঙ্গায় যে মেয়েদের সর্বনাশ হয়েছে তাদের এনে এনে ওই হোমে শেলটার দেওয়া হচ্ছে। হরিচরণবাবু এ-সব কি তোমাকে জানিয়েছেন?
