শুনতে শুনতে সীমাহীন আতঙ্কে হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা যেন থমকে গেছে বিনয়ের। শ্বাস আটকে আসছে। বার বার ঝিনুকের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। তাকে কত খুঁজেছে বিনয়, কিন্তু তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অধর ছুঁইমালী খবর দিয়েছিল, তাকে একটা মাঝবয়সী লোকের সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশনে দেখেছে। লোকটা ভাল না মন্দ, তার মাথায় কোনও দুরভিসন্ধি রয়েছে কি না, শেষ অবধি ঝিনুককে সে নরকের খাসতালুকে পৌঁছে দিয়েছে কি না, কে জানে।
হরিচরণ বলছিলেন, আমরা কজন ফ্রিডম-ফাইটার ইস্ট পাকিস্তানের দুঃখী মেয়েদের জন্যে একটা হোম খুলেছি। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য কম। শখানেকের মতো মেয়েকে শেলটার দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কলকাতার চারপাশের রেড-লাইট এরিয়া ঘুরে ঘুরে অনেক মেয়েকে উদ্ধার করে এনেছি। আরও আনব। তিনি জানালেন, একটা মাঝারি তেতলা বাড়িতে কাজ চালাচ্ছেন। তাদের বিরাট পরিকল্পনা। মেয়েগুলো যাতে অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য ওদের নানারকম হাতের কাজ শেখানো হচ্ছে। তাঁত বোনা, চামড়ার কাজ, নানারকম হ্যাঁক্র্যিাফট, এ-সব শিখলে, ওদের তৈরি প্রোডাক্ট বাজারে বিক্রি করে মোটামুটি লাভ হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। বড় জমি না পেলে তেমন কিছুই করা যাবে না। হরিচরণরা এজন্য সরকারের কাছে বরানগরে বিঘে, খানেক জমি চেয়েছেন। ছমাস হয়ে গেল, প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি। সরকারি ব্যাপার তো। সমস্ত বিষয়ে গড়িমসি। তাদের আঠারো মাসে বছর।
হরিচরণ বললেন, কলকাতার সব কাগজগুলোকে বলেছি। তারা এই নিয়ে লিখবে। প্রসাদকেও বলেছিলাম। সে জানালো রিফিউজিদের নিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট তোমাকে দেওয়া হয়েছে। যা লেখার তুমিই লিখবে। কাগজগুলো শোরগোল তুললে সরকারি কর্তাদের কানে জল ঢুকবে। একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, কী, লিখবে তো?
অন্যমনস্কর মতো বিনয় বলল, লিখব। কয়েক লহমা থেমে থাকার পর ঝিনুকের জন্য তার হৃৎস্পন্দনের গতি এখন অনেক বেড়ে গেছে। সে যেন বুকের ভেতর লক্ষ লক্ষ হাতুড়ি পেটার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল।
হরিচরণ বলছিলেন, তোমাদের লেখালিখিতেও যদি কাজ না হয়, বিধান রায়ের সঙ্গে দেখা করব। জমি আমাদের চাইই ।
তার শেষ কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল না বিনয়। আচমকা সে জিজ্ঞেস করে, আপনাদের হোমে ঝিনুক নামে কোনও মেয়ে আছে? তার চোখেমুখে, কণ্ঠস্বরে তীব্র উৎকণ্ঠা।
হরিচরণ অবাক।–কে ঝিনুক?
পরিচয় দিতে গিয়েও থমকে যায় বিনয়। বলে, আমার জানাশোনা একটি মেয়ে। দাঙ্গায় ওর সর্বনাশ হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই ও নিখোঁজ।
হরিচরণ খানিক ভেবে বললেন, এতগুলো মেয়ে আমাদের হোমে রয়েছে। সবার নাম কি মনে আছে!
আমি যদি আপনাদের হোমে একদিন যাই?
ঝিনুকের খোঁজে? ঠিক আছে, আমি নিয়ে যাব? বলে একটু চুপ করলেন হরিচরণ, তারপর বললেন, ঝিনুকের জন্যে না হলেও তোমাকে আমি নিয়ে যেতাম। আমাদের হোমের মেয়েগুলোকে নিয়ে কাগজে লেখা খুব জরুরি।
আপনারা তো ইস্ট পাকিস্তানের মেয়েদের উদ্ধার করতে ব্রথেলগুলোতে যান?
হ্যাঁ, যাই
আপনাদের হোমে ঝিনুককে না পাওয়া গেলে আপনাদের সঙ্গে ব্রথেলগুলোতে গেলে আপত্তি নেই তো?
বিনয়ের উদ্দেশ্যটা অনুমান করতে পারছিলেন হরিচরণ। বললেন, ঠিক আছে, যেও। দেখ যদি মেয়েটাকে খুঁজে পাও–।
একসময় উঠে পড়লেন হরিচরণ। অনেক রাত হয়েছে। আজ, চলি হঠাৎ কিছু খেয়াল হতে তাঁর সঙ্গী প্রৌঢ়টিকে দেখিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন, ওই দেখ, তোমাদের আলাপই করিয়ে দেওয়া হয়নি। ও আমার ভাইপো হিমাংশু। আমি ওদের কাছেই থাকি। এই রাস্তারই বত্রিশ নম্বর বাড়ি। মাঝে মাঝে যেও
বিনয় আগেই আন্দাজ করেছিল, প্রৌঢ়টি হরিচরণের আত্মীয়স্বজন কেউ হবেন। বলল, নিশ্চয়ই যাব।
হরিণচরণরা চলে গেলেন। বিনয় তাঁদের সঙ্গে নিচে এসে রাস্তা অবধি এগিয়ে দিল।
.
৫৮.
কার অনবরত ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল বিনয়ের। গা থেকে মোটা চাদরটা সরিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে সে। সব দরজা জানালা বন্ধ। শিয়রের দিকের দেওয়ালের মাথায় উঁচু ঘুলঘুলি দিয়ে সোনালি রোদের দু-চারটে সরু-মোটা ফালি এসে পড়েছে ঘরে। ওই সামান্য আলোয় কোনও কিছুই স্পষ্ট নয়।
ঘুমের ঘোর লেগে আছে চোখে। প্রথমটা বিনয় বুঝে উঠতে পারল না কে ডাকছে কিংবা এই মুহূর্তে সে কোথায় রয়েছে।
দুয়ার খুলেন। ম্যালা বেইল (অনেক বেলা) অইয়া গ্যাছে। ফের ডাকটা শোনা যায়। এবার কণ্ঠস্বর অনেকটা উঁচুতে উঠেছে। সেটা চেনাও গেল। সুবল।
বিছানা থেকে নেমে প্রথমে ভেতর দিকের দরজা খুলে দিল বিনয়। সুবলকে বলল, এস
সুবল বলে, অহন যামু না। আপনে মুখ ধুইয়া তরাতরি দাদার ঘরে আসেন। আমি চা লইয়া এটু পরে হেইখানে যামু প্রসাদকে দাদা বলে সে।
আমার চানের জন্যে বাথরুমে গরম জল দিয়েছ?
কালই সুবলকে গরম জলের কথা বলা হয়েছিল। কেন না সকালে চানটান সেরে একটু কিছু খেয়ে সে রিফিউজিদের কলোনি কি রিলিফ ক্যাম্পে চলে যাবে।
সুবল বলল, না, দেই নাই। দাদায় অহন আপনেরে বাইর অইতে না করছে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কেন?
আমি কইতে পারুম না। তেনির কাছে গ্যালে জানতে পারবেন।
উদ্বাস্তুদের কলোনি টলোনিতে রোজ সকালে যাবার অ্যাসাইনমেন্ট প্রসাদই তাকে দিয়েছিলেন। কী এমন ঘটল যে আজ যেতে বারণ করছেন? কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল বিনয়। তারপর অন্যমনস্কর মতো ঘরের বাকি দরজা জানালাগুলো খুলে দিল। শীতল রোদ আর ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শীতটা প্রায় চলেই গিয়েছিল। দার্জিলিংয়ে প্রচুর বরফ পড়ায় আবার সেটা সাময়িক হলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
