প্রশ্নটা এমনই আকস্মিক যে হকচকিয়ে যায় বিনয়। সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্টের আগে দাঙ্গা কি কোনও একটা বিশেষ অঞ্চলে ঘটেছে? কলকাতা, বিহার নোয়াখালি, ঢাকা থেকে লাহোর, করাচি, বোম্বে, সুদূর সিন্ধুপ্রদেশ–গোটা উপমহাদেশ জুড়ে তখন রক্তের সমুদ্র। রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহের পাহাড়।
বিনয় অস্বস্তি বোধ করে। দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যাটা ঠিকমতো জানাতে না পারলে হরিচরণ কি রেগে যাবেন? ভয়ে ভয়ে সে বলে, সারা ইন্ডিয়া জুড়ে রায়ট হয়েছে। এত লোক মরেছে যে তার সঠিক রেকর্ড আছে বলে মনে হয় না।
রেকর্ড না থাক, আন্দাজ তো একটা করতে পারো
মিনিমাম লাখ খানেক
নো নো জোরে জোরে মাথা ঝাঁকান হরিচরণ, আমার হিসেবে অ্যাবাউট থ্রি মিলিয়ন। ত্রিশ লাখের কাছাকাছি। এরা সবাই ভেরি অর্ডিনারি পিপল। গরিব হতভাগ্য মানুষের দল
পূর্ব বাংলার এক নগণ্য শহরে থেকে হত্যার খতিয়ান জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় রাজদিয়ার কারও গায়ে একটা আঁচড়ও লাগেনি। কিন্তু ঢাকায়? নারায়ণগঞ্জে? বরিশাল কি নোয়াখালিতে? এই জায়গাগুলো তো রাজদিয়া থেকে এমন কিছু দূরে নয়। চল্লিশ থেকে এক শ দেড় শ মাইলের মধ্যে। ওই এলাকাগুলোয় তখন রক্তের স্রোত বয়ে চলেছে। বিনয়রা সেই সময় এমনই ত্রস্ত, বিহ্বল আর উৎকণ্ঠিত যে ভারতবর্ষ তো বিশাল ব্যাপার, শুধু পূর্ব বাংলায় কতজন খুন হয়েছে, তার খুঁটিনাটি হিসেব রাখার চিন্তাও মাথায় আসেনি।
হরিচরণ থামেননি। বললেন, যে কারণে এত রক্তপাত, এত হত্যা, সেই পার্টিশান তো হয়েই গেছে। তারপরও কি দাঙ্গা থেমেছে?
বিনয় আস্তে মাথা নাড়ে।-না, থামেনি।
তাহলে এই পার্টিশানের কি প্রয়োজন ছিল?
অস্পষ্টভাবে বিনয় কিছু একটা উত্তর দিল। ঠিক বোঝা গেল না।
একটু ভেবে হরিচরণ জিজ্ঞেস করেন, স্বাধীনতার পরও দাঙ্গায় কত লোক মারা গেছে?
কাঁচুমাচু মুখে বিনয় বলে, ঠিক বলতে পারব না।
হরিচরণ ধমকে ওঠেন, তুমি একজন সাংবাদিক। পার্টিশান, দেশভাগ নিয়ে কাজ করছ। এ সব তোমার জানা উচিত। থরো ধারণা না থাকলে আর সমস্ত তথ্য না জানলে পার্টিশানের কারেক্ট চিত্রটা তুলে ধরবে কী করে?
বিনয় বলল, আমি সবে কাগজে জয়েন করেছি। আপনি যা বললেন সেই সব ইনফরমেশন পুরোনো নিউজপেপার আর বইপত্র ঘেঁটে জোগাড় করে নেব।
হরিচরণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। অনেকটা স্বগতোক্তির ধরনে বললেন, এই রায়ট কোনও দিনই থামবে কি না সন্দেহ। ওপার থেকে উদ্বাস্তুদের আসাও বন্ধ হবে না। কেন জানো?
কেন? নিজের অজান্তেই যেন শব্দটা বিনয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
টু নেশন থিয়োরির বিষ মানুষের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম দুই কমিউনিটির মধ্যে বিদ্বেষ আর ঘৃণাটা এখন ডিপ-রুটেড। ওটা যতক্ষণ না উপড়ে ফেলা যাচ্ছে, হাজার বছরেও এই সমস্যার সমাধান হবে না। একটা কথা ভেবে আমার ভীষণ ভয় হয়।
প্রশ্ন না করে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
হরিচরণ বলতে লাগলেন, সেটা কী জানো? এখন থেকে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট যদি সাবধান না হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের কুফল আমাদের দেশেও এসে পড়বে। আজ হোক, কাল হোক বা দশ বিশ বছর পরেই হোক, তার হাত থেকে নিস্তার নেই। সেকুলার ভারতের পক্ষে সেটা হবে মারাত্মক।
ভবিষ্যতের নিরাশাজনক, ভয়ঙ্কর এক পরিণামের কথা চিন্তা করে মুহ্যমানের মতো বসে থাকেন বৃদ্ধ স্বাধীনতা-সংগ্রামী।
বিনয় অবাক। পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হলেও ভারত এক সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এখানে সব ধর্ম, সব ভাষা, সব জাতির মানুষের সমানাধিকার। দ্বিজাতি তত্ত্ব কীভাবে এ-দেশের আবহাওয়া বিষময় করে তুলবে, সেটা ভেবে পেল না বিনয়।
একটু চুপচাপ।
তারপর হরিচরণ বললেন, ও-সব আলোচনা এখন থাক। তোমার কাছে একটা বিশেষ দরকারে আজ আমাকে আসতে হয়েছে।
অপার বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বিনয়। তারপর বলে, কী দরকার বলুন
তুমি ইস্ট পাকিস্তান, রায়ট, রিফিউজিদের নিয়ে যা লিখছ সেগুলো আমাদের এই সময়ের সত্যিকারের ছবি। টু পিকচার। কিন্তু একটা বিরাট দুঃখের দিক বাদ থেকে যাচ্ছে। তার রেকর্ড না থাকলে এই সময়ের ইতিহাস সম্পূর্ণ হবে না। মস্ত ত্রুটি থেকে যাবে।
বিনয় বলল, আমি তো সব কিছুই তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। কোথায় ত্রুটি থেকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না।
বিনয়ের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে হরিচরণ বলেন, এই যে এত রায়ট হচ্ছে তার দুটো টার্গেট কী বলতে পার? প্রশ্নটা করে তার উত্তর নিজেই দিলেন, ল্যাণ্ড আর ইয়াং উইমেন। জমি আর যুবতী মেয়ে।
বিনয় চকিত হয়ে ওঠে। এই দুটো দিকের কথা সেও বহুবার ভেবেছে।
হরিচরণ বিমর্ষ সুরে বলতে থাকেন, অসংখ্য মানুষের ল্যাণ্ড প্রপার্টি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেসব আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তার চেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মেয়েদের। হাজার হাজার যুবতী মেয়ে নিখোঁজ।
হরিচরণ সবিস্তার বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। যাদের ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল তাদের কারওকে কারওকে উদ্ধার করে ইণ্ডিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এই ধর্ষিতা মেয়েদের মা-বাবা বা অভিভাবকরা নিজেদের সংসারে তাদের ফিরিয়ে নিতে একেবারেই রাজি নয়। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এদের জন্য কিছু উদ্ধারাশ্রম খোলা হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেগুলো খুবই কম। এমন অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে, বেশ কয়েকটা হোমের মেয়েদের নোংরা কাজে লাগানো হচ্ছে। একবার যাদের সম্ভ্রম নষ্ট হয়েছে তাদের প্রতি কারও সহানুভূতি বা মমতা নেই। ওদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নরকের দিকে। উদ্ধারাশ্রমে যে মেয়েদের জায়গা হচ্ছে না, শকুনের মতো আঁকে ঝকে দালালরা তাদের পৌঁছে দিচ্ছে বারবনিতাদের পাড়ায়। কলকাতা এবং চারপাশের বেশ্যাপল্লিগুলো ভরে যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা লাঞ্ছিতা এই মেয়েদের দিয়ে।
