কোথায়, কী উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল, জানিয়ে দেয় বিনয়।
মতিলাল কাজের মানুষ। সে উঠে পড়ল। বিনয়কে বলল, রাত্তিরে মেসের এতগুলো লোক খাবে। দেখি রাঁধুনী ঠাকুর রান্নাবান্নার কতটা কী করল। আপনি মেসোমশায়ের সঙ্গে কথা বলুন
শুধু ম্যানেজারই না, হরিচরণের ডান পাশে যে প্রৌঢ়টি বসে ছিলেন সে ছাড়া অন্যরা আর বসল না। বিনয়কে জানালো, এই মেসেই আমরা থাকি। প্রসাদবাবুর কাছে আপনার কথা শুনেছি। পরে ভাল করে আলাপ হবে। বিনয় এবং হরিচরণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারাও চলে গেল।
এই লোকগুলো যে এই মেসের বাসিন্দা আগেই তা অনুমান করে নিয়েছিল বিনয়। সে যখন চেয়ার টেবল কিনতে হারুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল সেই সময়টা ওরা হরিচরণকে সঙ্গ দিয়েছে।
এর আগে মাত্র একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামীকেই দেখেছে বিনয়। রাজদিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার মোতাহার হোসেন চৌধুরি। তিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট। বেয়াল্লিশের কুইট ইণ্ডিয়া মুভমেন্ট আর রশিদ আলি ডে আন্দোলনের সময় কিছুদিন জেল খেটেছেন। যুদ্ধের সময় ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট-এও ইংরেজের পুলিশ তার ওপর কম নির্যাতন চালায়নি। বাড়িতে কতবার যে তল্লাশি চালিয়েছে। দু-চার দিন পর পর তাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হতো।
মোতাহার হোসেনের পর ভারতবর্ষের আর-একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বচক্ষে দেখল বিনয়। অদ্ভুত এক শিহরন অনুভব করছিল সে। বলল, প্রসাদদার কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। দেশের জন্য আপনার কত যে স্যাক্রিফাইস! প্রসাদদা সেদিন বলেছিলেন, ইংরেজদের জেলে জীবনের সবচেয়ে ভ্যালুয়েবল কুড়িটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন।
তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন হরিচরণ। সামান্য উত্তেজিত দেখালো তাঁকে। বললেন, ও কিছু না। দেশকে কী বলা হয় জানো?
দেশকে তো অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। হরিচরণ ঠিক কোনটা ইঙ্গিত করেছেন, বোঝ যাচ্ছে না। বিনয় তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হরিচরণ গভীর স্বরে বললেন, দেশ হল মা। দেশমাতৃকা। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ডি এল রায় থেকে শুরু করে সব কবি, বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ভারতবর্ষকে জননী বলেছেন। মায়ের মুক্তির জন্যে কটা বছর জেল খেটেছি, সেটা কি খুব বড় কৃতিত্বের ব্যাপার হল?
বিনয় টের পাচ্ছিল ভারতবর্ষ সম্পর্কে হরিচরণের মধ্যে অনন্ত আবেগ বদ্ধমূল হয়ে আছে। তার প্রতিটি কথায় তা বেরিয়ে আসছিল।
একটু চুপচাপ।
তারপর হরিচরণ বললেন, প্রসাদ বলছিল, তুমি রিসেন্টলি পাকিস্তান থেকে এসেছ
আজ্ঞে হ্যাঁ। এই দুআড়াই মাস হল
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনয় সম্পর্কে সব জেনে নিলেন হরিচরণ। কোথায় দেশ, সেখানে এখনও কেউ রয়েছে কি না, কলকাতায় আত্মীয় পরিজনেরা থাকলে কোথায় আছে, ইত্যাদি। নানা প্রশ্নের পর বললেন, কী মনে হয় তোমার, যেভাবে বোজ হাজার হাজার রিফিউজি চলে আসছে, ইস্ট পাকিস্তানে কি মাইনোরিটি বলে কেউ থাকবে না?
এভাবে, কখনও চিন্তা করেনি বিনয়। একটু চুপ করে থেকে সে জানায়, পূর্ব বাংলায় এখনও এক কোটির মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। ট্রেন, স্টিমার বোঝাই হয়ে তাদের অনেকেই দলে দলে চলে আসছে। এটা যেমন ঠিক, তেমনি যারা আসেনি তাদের অনেকেই এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত যে ইণ্ডিয়ার দিকে পা বাড়িয়ে আছে। এমনটা চললে অদূর ভবিষ্যতে কী হবে, বিনয় জানে না।
হরিচরণ বললেন, লক্ষ লক্ষ মানুষ চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এত বড় হিউম্যান ট্র্যাজেডি ভারতবর্ষে আর কখনও ঘটেছে বলে জানি না। মুখে শুধু হা-হুতাশ না করে এখনই স্ট্রং স্টেপ নেওয়া দরকার। নইলে এই এক্সোডাস বন্ধ করা যাবে না।
বিনয় উত্তর দিল না।
হরিচরণের প্রশ্ন বা আলোচনা বিশেষ একটা জায়গায় স্থির থাকছে না। দাঙ্গা এবং দেশভাগের নানা বিপজ্জনক প্রান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি বলতে লাগলেন, পূর্ব পাকিস্তানের এই তো অবস্থা। তুমি নিশ্চয়ই জানো, ওয়েস্ট পাঞ্জাব থেকে ট্রেন ভর্তি হয়ে রিফিউজিরা চলে এসেছে দিল্লি আর ইস্ট পাঞ্জাবে। মুসলমানরাও একই পদ্ধতিতে চলে গেছে ওপারে।
বিনয় বলল, কাগজে পড়েছি।
সামনের দিকে ঝুঁকে হরিচরণ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আমার স্যাক্রিফাইসের কথা বলছিলে না?
তাঁর বলার ভঙ্গিতে এমন একটা শ্লেষের সুর ছিল যাতে হকচকিয়ে যায় বিনয়। বলে, আজ্ঞে হা–মানে
কণ্ঠস্বর অনেকটা উঁচুতে তোলেন হরিচরণ, আমার মতো হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর ইংরেজের জেলে পচেছে। কত সোনার টুকরো ছেলে ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়েছে। দেশভাগ হবে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে নতুন ইহুদি বানিয়ে দেওয়া হবে–ফ্রিডম-ফাইটারদের এত স্যাক্রিফাইস কি সেই জন্য?
ভারতবর্ষ বিভাজনের কারণে একটা জাতির জীবন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল, সেজন্য ক্ষোভ, কষ্ট আর আক্ষেপের শেষ নেই হরিচরণের। সব স্বাধীনতা-সংগ্রামীই বুঝি বা তার মতোই অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেন। চোখের সামনে তারা দেখলেন, অসংখ্য শহিদের জীবন দান, অজস্র মানুষের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে গেছে। মোতাহার হোসেনকেও দেশভাগের পর পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেখেছিল বিনয়। হরিচরণের মতোই।
কী উত্তর দেবে বিনয়? সে নীরবে বসে থাকে।
হরিচরণ জিজ্ঞেস করলেন, পাটিশানের আগে দাঙ্গায় কত লোক মারা গেছে বলে তোমার ধারণা?
