কাঠগোলা থেকে বেরিয়ে বিনয়রা ফের ট্রাম রাস্তায় চলে আসে। হারুরা তার জন্য অনেকটা খাটাখাটনি করেছে। ওদের কিছু খাওয়ানো দরকার।
তিন ঠোঙা মশলা মুড়ি আর তিন ঠোঙা গরম গরম কুড়মুড় ভাজা কিনে খেতে খেতে ওরা হাঁটতে থাকে।
যেজন্য বেরুনো সেই চেয়ার টেবলের অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। অকারণে ঘোরাঘুরি করার মানে হয় না। বিনয় বলল, চল, ফেরা যাক—
পূর্ণ সিনেমার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কোনাকুনি উলটো দিকের ফুটপাথে নজর চলে যায় বিনয়ের। সেই মেয়েটা অর্থাৎ আরতি চট বিছিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। খাতা, কলম, ধূপকাঠি, আদর্শলিপি, পেন্সিল ইত্যাদি রকমারি জিনিস। আশ্চর্য, আরতির কথা সে ভুলেই গিয়েছিল।
কিন্তু আরতি তো সকালের দিকে নটা অবধি দোকানদারি করে। তারপর তার বাবা চেতলার এক গুদামে কাজ সেরে এসে বসে। তখন মেয়েটা স্কুলে চলে যায়। বিকেলের দিকে আর আসে না। আজ কী এমন হল যে তাকে সন্ধেবেলাতেও পসরা নিয়ে বসতে হয়েছে!
হারুদের নিয়ে রাস্তার ওপারে চলে যায় বিনয়। আগে খেয়াল করেনি, এবার দেখা গেল, আরতির পাশে একটা আধবুড়ো লোক বসে আছে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কেমন আছ?
কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে আরতি। ধীরে ধীরে তার মুখে হাসি ফোটে। ও, আপনে! হেই আইছিলেন। হেরপর তো আমাগো দোকানে আর আহেন নাই।
এবার থেকে আসব। কাছেই একটা মেসে চলে এসেছি। তা সন্ধেবেলায় তো তুমি এখানে বসো না—
না। আমার অ্যানুয়াল পরীক্ষা হইয়া গ্যাছে, রেজাল্টও বাইর হইছে। পরের ক্লাস শুরু হইতে কয় দিন দেরি। ঘরে আজিরা (বেকার) বইসা কী করুম। চইলা আইলাম।
আধবুড়ো লোকটা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আরতিকে জিজ্ঞেস করল, তুই বাবুরে চিনস নিকি?
আরতি বলল, চিনুম না? আমাগো দোকান থিকা কত জিনিস হেই দিন কিনা (কিনে) লইয়া গ্যালেন– বলে প্রৌঢ়টির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তার বাবা রাধানাথ পাল।
বিনয় রাধানাথকে বলে, আপনার কথা আরতির কাছে শুনেছি। খুব কষ্ট করে ওকে আর ওর ভাইবোনদের পড়াচ্ছেন।
নিজের কষ্টের ব্যাপারটা কানেই তুলল না রাধানাথ –বাবু, আমার এই মাইয়াটা হীরার টুকরা। ফুটপাথে দোকান চালাইতে চালাইতে এইখানে বইসাই পইড়া পইড়া সিক্স কেলাস থিকা ফাস্ট অইয়া সেভেনে উঠছে। ভাল কইরা খাইতে দিতে পারি না, ভাল একখান জামা দিতে পারি না। কয় বিএ এম এ পাস করব। যদ্র চায় তদূর পড়ামু। বাবু, আশীৰ্বাদ করেন অর মনের ইচ্ছাখান য্যান পূন্ন (পূর্ণ) হয়।
বিনয় বলল, নিশ্চয়ই পূর্ণ হবে।
কিছু খাতা-পেন্সিল কিনে রাস্তার ওধারে চলে যায় বিনয়। হারুরা পাশাপাশি হাঁটছে।
বিনয় বলল, বাপ মেয়ে, দুজনের ডিটারমিনেশন দেখলে? এত অভাব, কিন্তু পড়া ছাড়ার কথা ভাবে না।
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। কিন্তু হারুরা নীরব। ওরা কতটা উদ্দীপ্ত হয়েছে, বোঝা গেল না।
মহেশ হালদার লেনে এসে পরে দেখা করবে বলে হারুরা ওদের বাড়ি চলে গেল।
আর-একটু এগিয়ে শান্তিনিবাস-এর সামনে আসতেই বিনয়ের চোখে পড়ল, সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সুবল অস্থিরভাবে এধারে ওধারে তাকাচ্ছে। তাকে দেখতে পেয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তরাতরি চলেন। হেই বাবু আপনের লেইগা কতক্ষণ বইয়া রইছে।
বিনয় অবাক। জিজ্ঞেস করে, কোন বাবু?
হেই যেনি দ্যাশের লেইগা জেল খাটছেন। স্বদেশীবাবু
তার মানে স্বাধীনতা-সংগ্রামী হরিচরণ বসু।
.
৫৭.
বোর্ডাররা ফিরে এসেছিল। শান্তিনিবাস এখন রীতিমতো সরগরম।
কোনওদিকে তাকায় না বিনয়। সুবলের সঙ্গে তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে থাকে। প্রসাদ বলেছিলেন, হরিচরণ তার সঙ্গে আলাপ করতে উৎসুক। আজ যে কোনও সময় মেসে চলে আসতে পারেন। কিন্তু রাত্তিরে সত্যি সত্যিই যে আসবেন, ভাবতে পারেনি বিনয়।
তেতলায় এসে দেখা গেল, প্রসাদের ঘরে বেশ ভিড় জমেছে।
এতগুলো মানুষের মধ্যে প্রথমেই যাঁর দিকে নজর চলে যায় তাঁর বয়স সত্তরের কাছাকাছি। প্রসাদের ইজি চেয়ারটায় তিনি বসে আছেন। চুল ধবধবে সাদা। এই বয়সেও স্বাস্থ্য বেশ মজবুত। চওড়া কপাল। গাল ভেঙে খানিকটা বসে গেছে। খাড়া নাক। ধারালো চিবুক। শিরদাঁড়া কিন্তু টান টান। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। পরনে ধুতি এবং পাঞ্জাবির ওপর খদ্দরের মোটা চাদর। বয়স্ক মানুষটিকে ঘিরে রয়েছে আশ্চর্য এক ব্যক্তিত্বের দ্যুতি। বিনয় আন্দাজ করে নিল, ইনিই হরিচরণ বসু।
হরিচরণের ডান পাশে কাঠের চেয়ারে বসে রয়েছেন একজন প্রৌঢ়। তাঁর চেহারায় হরিচরণের আদলটি আবছাভাবে বসানো। ওঁর ছেলে? নাকি খুব ঘনিষ্ঠ কেউ যার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে?
সামনের দিকে একটা মোড়ায় বসেছে মেস-ম্যানেজার মতিলাল চাকলাদার। তাছাড়া আরও কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। খুব সম্ভব তারা শান্তিনিবাস-এর বোর্ডার। সবাই সসম্ভ্রমে হরিচরণের সঙ্গে কথা বলছে। মতিলালই প্রথম বিনয়কে দেখতে পেয়েছিল। ব্যস্তভাবে সে উঠে দাঁড়ায়। আসুন, আসুন বিনয়বাবু। মেসোমশাই সেই কখন থেকে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। বলে বয়স্ক মানুষটি অর্থাৎ হরিচরণের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়।
বিনয় হরিচরণকে প্রণাম করল। তিনি সস্নেহে তার হাত ধরে সামনের একটা খালি মোড়ায় বসিয়ে দিতে দিতে বললেন, তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, আর তুমিই নেই! কোথায় গিয়েছিলে?
