বিনয় তাকে ডেকে বলল, ম্যানেজারবাবু, আমি হারুদের সঙ্গে একটু ঘুরে আসছি।
মুখ তুলে চশমার ওপর দিয়ে তাকায় মতিলাল।-বিনয়বাবু সিজন চেঞ্জের সময় বাতাসে চোরা ঠাণ্ডা আছে। দেখবেন জ্বর জারি যেন না হয়।
প্রসাদ ম্যানেজারকে তার ওপর নজর রাখতে বলেছিলেন। সে গার্জেনগিরি ফলাতে শুরু করেছে। তাকে নাবালক ভাবছে নাকি? যাই ভাবুক, খুব একটা খারাপ লাগল না বিনয়ের। বরং একটু মজাই পায়। বলল, না না, বেশিক্ষণ বাইরে থাকব না।
আমাদের মেসে রাতের খাওয়া কিন্তু দশটার ভেতর ঢুকিয়ে ফেলা হয়।
তার অনেক আগেই ফিরে আসব।
দুপা এগিয়ে থমকে দাঁড়ায় বিনয়। আজকের দিনটা তো মোটামুটি আলস্যের মধ্যে কেটে গেল। একেবারেই ব্যস্ততাহীন। কিন্তু কাল থেকে ফের পুরোনো রুটিনে ফিরে যেতে হবে। সেই জবরদখল কলোনি বা ত্রাণশিবিরগুলোতে ছোটাছুটি। সে বলে, কাল সকালে আমি চান করে বেরিয়ে যাব। গরম জল পাওয়া যাবে?
নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কখন দরকার?
সাড়ে সাতটায় পেলে ভাল হয়।
পাবেন। সুবল আপনাদের তেতলার বাথরুমে দিয়ে আসবে। কিন্তু
কী?
অত সকালে তো ভাত দেওয়া যাবে না। রান্না নামতে সেই নটা
আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না। দুপুরেও ফিরব না। বাইরে কোথাও খেয়ে নেব।
রাস্তায় এসে হারুদের বকবকানি চলতে লাগল। একটু এগুতেই ডান পাশে একটা লম্বা ব্যারাক টাইপের বাড়ি। পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথনি, মাথায় টিনের চাল, লাইন দিয়ে অগুনতি ঘর। সেটা দেখিয়ে দুলাল বলল, এই বাড়িতে আমরা থাকি।
আগের দিনই প্রসাদ বিনয়কে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। সে কিছু বলল না।
দুলাল সামনের বাঁকের মাথায় পাশাপাশি একটা লঞ্জি আর একটা কবিরাজখানার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দেয়।রাইতে আমি লন্ড্রিতে শুই, আর হারু শোয় কবিরাজের গদিতে।
বিনয় লক্ষ করল, লটার নাম দি গ্রেট বেঙ্গল ডাইং অ্যাণ্ড ক্লিনিং হাউস। কবিরাজখানাটার, নাম বেশ আধুনিক-আরোগ্যধাম। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, বাড়ি থাকতে ওখানে গিয়ে শোও কেন?
আমাগো দুই ফেমিলির একখান কইরা তো ঘর। ভাই-বইন মিলাইয়া আমরা ছয়জন। হারুরা সাতজন। ঘরে জাগা কই যে শুমু! লরি মালিক হারাধনদা আর কবিরাজ মাধব স্যান (সেন) দয়া কইরা শুইতে দ্যায়। নাইলে ফুটপাথে পইড়া থাকতে হইত।
হারু বলে, যদি কুনো কারণে দরকার হয়, দিনের বেলা হইলে আমাগো বাড়ি খবর দিয়েন। রাইত দশটার পর হইলে লন্ড্রি কি কবিরাজখানায়
বিনয় উত্তর দিল না। এই উদ্বাস্তু যুবক দুটি কী কষ্ট করেই না এই পৃথিবীতে টিকে আছে। পরক্ষণে শিয়ালদা স্টেশনে গাদাগাদি করে পড়ে থাকা মানুষগুলোর সারি সারি মুখ চোখের সামনে ফুটে ওঠে। তৎক্ষণাৎ মনে হয়, সেই তুলনায় হারুরা তো স্বর্গে রয়েছে। তবু বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে।
মহেশ হালদার লেন থেকে হরিশ মুখার্জি রোডে এসে পড়ে বিনয়রা। রাস্তা পেরিয়ে ওধারে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দুলাল বলে, আপনেরে একখান কথা কমু, প্রসাদকাকায় য্যান জানতে না পারে।
কৌতূহলও হয়, সেই সঙ্গে বিস্ময়ও বোধ করে বিনয়।–কী কথা?
প্রসাদকাকার মুখে শুনছি, আপনে খবরের কাগজে কাম করেন। রিপোর্টার। কত বড় বড় লোকের লগে আপনের জানাশুনা। তাগো কইয়া আমাগো একটা চাকরি বাকরি কি জুটাইয়া দিতে পারেন?
বিনয় চমকে ওঠে, পড়াশোনা করছ। এখনই চাকরি কীসের?
আপনে কি আমাগো ফেমিলির অবস্থা জানেন?
প্রসাদদার কাছে শুনেছি।
প্রসাদকাকায় আমাগো লেইগা ম্যালা পয়সা খরচ করেন। কলেজের মাইনা দ্যান, বইপত্তর কিনা (কিনে) দ্যান, টিফিনের টাকা দ্যান। তিনি কন কম পক্ষে গ্র্যাজুয়েটটা হ। বি.এ পাশ করলে ভাল চাকরি মিলব।
ঠিকই তো বলেন।
কিন্তুক সোংসারের এমুন হাল যে মইধ্যে মইধ্যে উপাস দিয়া থাকতে হয়। গ্রাজুয়েট হইলে দশখান হাত দশখান পাও (পা) কি গজাইবা? আগে তো বাইচা থাকন দরকার। প্রসাদ কাকারে এই কথাখান বুঝাইতে পারি না।
প্রথম যেদিন বিনয় শান্তিনিবাস-এ আসে, প্রায় এ জাতীয় কথা তার সামনেই হারুরা প্রসাদকে বলেছিল। প্রসাদ যেখানে আছেন সেখানে নাক গলানো ঠিক নয়। বিমর্ষ বোধ করলেও বিনয় বলে, আমি তো সবে কাজে ঢুকেছি। কজনকেই বা চিনি। প্রসাদদাকে তোমাদের কথা বুঝিয়ে বল
হারুরা আঁতকে ওঠে।–ওরে বাবা, পড়া ছাড়নের কথা কইলে তেনি আমাগো খাইয়া ফালাইবেন–
বিনয় কী আর বলবে। চুপ করে থাকে। সে যদি হারুদের জন্য চাকরির চেষ্টা করে, প্রসাদ জানতে পারলে কি খুশি হবেন? তিনি রেগে যান এমনটা ভাবতেই পারে না বিনয়।
হরিশ পার্ক, মিত্র ইনস্টিটিউশন পেছনে ফেলে একটা গলির ভেতর দিয়ে ওরা রসা রোডে পৌঁছে যায়। তারপর পূর্ণ সিনেমার ফুটপাথ ধরে খানিকটা হেঁটে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে বিরাট এক কাঠগোলায় বিনয়কে নিয়ে এল হারু আর দুলাল।
একধারে ডাঁই হয়ে পড়ে রয়েছে বড় বড় গাছের গুঁড়ি। আর-এক কোনায় লম্বা লম্বা দাঁত-ওলা করাত দিয়ে কাঠ চেরাই হচ্ছে। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের আসবাব-খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবল ইত্যাদি। কোনওটা পুরোপুরি বানানো হয়েছে, কোনওটা আধাআধি। দুটো চেয়ার আর একটা মাঝারি টেবল পছন্দ করল বিনয়। দরদাম করে ঠিক হল একুশ টাকা। গোলাওলা পাঁচটাকা অ্যাডভান্স নিয়ে শান্তিনিবাস-এর ঠিকানা টুকে নিল। চেয়ার দুটো আর টেবলের কিছু কাজ বাকি ছিল। কাজ শেষ করে রং-পালিশ চড়িয়ে সামনের রবিবার পাঠিয়ে দেবে।
