একটু নীরবতা।
তারপর আচমকা উঠে দাঁড়ায় সুবল। চকিতে কিছু যেন মনে পড়ে গেছে।
বিনয় অবাক। আসলে একা একা বসে থাকতে ইচ্ছা করছিল না। মেস-বাড়ি এখনও নিঝুম। কাজকর্ম সেরে কেউ ফিরে আসেনি। তাছাড়া বোর্ডারদের কারও সঙ্গে আলাপ-টালাপ হয়নি। চেনাজানার মধ্যে এক ম্যানেজার মতিলাল চাকলাদার। কিন্তু সে ব্যস্ত মানুষ, আড্ডা দেবার মতো ফুরসত তার নেই। কিন্তু বিনয়ের হাতে এই বিজন সন্ধেয় আজ অঢেল সময়। ভেবেছিল সুবলের সঙ্গে খানিক্ষণ গল্প করে কাটিয়ে দেবে। জিজ্ঞেস করল, কী হল, উঠে পড়লে যে? তোমাদের বাড়ির খবর তো কিছুই জানা হল না।
সুবল কুণ্ঠিতভাবে বলল, অহন আর বইতে পারুম না। ম্যানেজারবাবু আপনেরে চা দিয়াই চইলা যাইতে কইছিল। তলে (নিচে) কী জারারি কাম আছে। আর দেরি করলে চেইতা (রেগে) যাইব। আপনে তো ম্যাসেই (মেসেই) থাকবেন। পরে আমাগো কথা শুইনেন।
সুবল চলে গেল।
পড়ার মতো এমন কিঁছুই সঙ্গে নেই যে সন্ধেটা কাটিয়ে দেওয়া যায়। তার বইপত্র সব সুধাদের বাড়িতে পড়ে আছে। মনে করে যদি নিয়ে আসত। এখন কী আর করা!
কিন্তু না, ভূতের মতো হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হল না। চা খাওয়া যখন শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল হারু আর দুলাল। দুজনের শরীরেই অপুষ্টির ছাপ। ভরপেট খেতে যে পায় না–গর্তে বসা চোখ, গায়ের ফ্যাকাসে চামড়া, ভাঙা গাল দেখলেই টের পাওয়া যায়। পরনে ময়লা পাজামা আর শার্টের ওপর জেলজেলে সোয়েটার।
প্রথম যেদিন শান্তিনিবাস-এ প্রসাদের কাছে আসে সেদিনই হারু আর দুলালকে দেখেছিল বিনয়। ওদের সঙ্গে আলাপ হয়নি, তবে দুজনের সম্বন্ধে অনেক কথাই প্রসাদের মুখে শুনেছে। ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জের কাছাকাছি নগণ্য এক শহর কমলাপুরে ওদের ছিল আদি বাড়ি। রীতিমতো সচ্ছল অবস্থা।
দেশভাগের পর সমস্ত কিছু পলকে ওলটপালট হয়ে গেল। পাকিস্তান হবার পর ঘাতকবাহিনী হারু আর দুলালদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নিরুপায়, আতঙ্কগ্রস্ত দুলালরা অগত্যা সর্বস্ব খুইয়ে এক জামা-কাপড়ে কলকাতায় চলে আসে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুই বাবা ওদের কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত মাইনে দিতে পারত না। ফলে ওরা কলেজে যেত না। নাম কাটা গিয়েছিল।
বিনয়ের মনে আছে, সেদিন এই নিয়ে প্রসাদ দুলালদের যথেষ্ট বকাঝকা করেছেন। তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কলেজের বকেয়া মাইনে মিটিয়ে ফের ক্লাস করতে বলেছিলেন। এতটুকুই শুধু ওদের সম্বন্ধে জানা আছে বিনয়ের।
পায়ে পায়ে অভাব। আধপেটা খেয়ে থাকা। জীবনযুদ্ধ বলে একটা শব্দ দিবারাত্রি তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তবু মুখে হাসি লেগেই থাকে হারুদের। ঘরে ঢুকেই তারা কলবলানি শুরু করে দেয়।
হারু বলে, প্রসাদকাকার মুখে আপনের কথা ম্যালা শুনছি। হেই দিন আপনেরে দেখছিও। কিন্তুক আলাপ পরিচয় হয় নাই। এই ম্যাসে আইয়া থাকবেন শুইনা কী ভাল যে লাগছে। ঠিক কইরাই রাখছিলাম আপনে যেই দিন আইবেন, দেখা করুম।
বিনয় হাসে, তাই বুঝি?
দুলালও তড়বড় করে তার উচ্ছ্বাস জানায়।
আত্মীয়-পরিজন নয়। দীর্ঘকালের পরিচিত হলে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেরকমও কিছু নয়। আগে একবারই মাত্র তাদের দেখেছে। অথচ দুই যুবক তার জন্য ব্যগ্র হয়ে রয়েছে। হারুদের দেখতে দেখতে মন ভরে যাচ্ছিল বিনয়ের। বলল, সেদিন শুনে গিয়েছিলাম, তোমরা আবার কলেজে যাবে। তোমাদের নাইট ক্লাস, না?
হ।
তাহলে সন্ধেবেলায় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমার কাছে এসেছ যে? প্রসাদদা জানতে পারলে কিন্তু ভীষণ রাগ করবেন।
আইজ কলেজের ফাউন্ডেশন ডে। হের লেইগা কলেজ ছুটি।
আরও কিছুক্ষণ এলোমেলো গল্প চলল। তারপর হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। তোমাদের এখানে ফার্নিচারের দোকান আছে?
হারু জিজ্ঞেস করল, আছে। ক্যান কন তো?
ঘরের অবস্থা তো দেখছ। কেউ এলে বসতে দেবার কিছু নেই। দুটো চেয়ার আর একটা টেবল কিনব।
আমরা আপনেরে লইয়া যামু। কবে যাইতে চান?
আজ হাতে কোনও কাজ নেই। এখন গেলে দোকান খোলা পাওয়া যাবে?
ছয়টাও বাজে নাই। কলকাতায় রাইত আটটা সাড়ে-আটটা তরি (পর্যন্ত) দোকানপাট খুলা থাকে। লন যাই
তার জন্য কিছু করতে পারবে, তাই ছেলে দুটো উৎসাহে যেন টগবগ করছে। বিনয় জামাকাপড় পালটে, গোটাকয়েক টাকা পকেটে পুরে হারুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
সারাদিন ঝিমিয়ে থাকার পর শান্তিনিবাস এই সন্ধেবেলায় সরগরম হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বিনয়ের চোখে পড়ল, ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। অফিস-টফিস করে কিংবা অন্য কাজকর্ম চুকিয়ে বেশ কজন বোর্ডার ফিরে এসেছে। আগের দিন যে এসেছিল তখন এদের সঙ্গে দেখা হয়নি বিনয়ের। ওরাও তাকে দেখেনি। পরস্পর সম্পূর্ণ অচেনা। তাই কথাবার্তা নয়, একটু চোখাচোখি হল শুধু। শান্তিনিবাস-এ যখন থাকছে তখন পরে সবার সঙ্গেই আলাপ হবে।
একতলায় আসতেই দেখা গেল, চাতালের বাঁ দিকের বারান্দায় দুটো লোক পাহাড় প্রমাণ আনাজ কাটতে বসেছে। পাশের রান্নাঘরের উনুনে আঁচ পড়েছে। খোলা জানালা দিয়ে গল গল করে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে আসছিল। চোখ জ্বালা করতে লাগল বিনয়দের।
চাতাল বাঁয়ে রেখে প্যাসেজে এসে ম্যানেজারের ঘরের সামনে একটু দাঁড়াল বিনয়। আগে যেমন দেখেছে, এখনও মতিলালকে অবিকল সেই ভঙ্গিতেই দেখা গেল। হাতে কলম, টেবলে পেল্লায় জাবদা খাতা, তার ওপর হুমড়ি খেয়ে আছে লোকটা।
