পার্টিশান নিয়ে কী সব আলোচনা করবেন।
বিনয় উত্তর দিল না।
প্রসাদ বললেন, উনি মাঝে মাঝে আমাদের মেসে চলে আসেন। খানিকক্ষণ গল্প টল্প করে যান। আজও তোমার জন্যে চলে আসতে পারেন।
বিনয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।–উনি কষ্ট করে আসবেন কেন? ঠিকানাটা দিন। আমি নিজেই গিয়ে দেখা করব।
তোমার সংকোচের কারণ নেই। হরিচরণবাবু চমৎকার মানুষ। সবরকম অহমিকা থেকে মুক্ত। উনি যখন আসতে চেয়েছেন, আসুন না। পরে একদিন ওঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা করে এস–
প্রসাদ আর দাঁড়ালেন না। সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে গেলেন।
বিনয় নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। এখানেই এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল সুবল। তাকে ডেকে নিয়ে দুজনে ধরাধরি করে প্রথমে বিছানা পেতে নিল। তারপর জামাকাপড় আলমারিতে গুছিয়ে রাখল। ঘরের দেওয়ালে বেশ কটা সিমেন্টর তাক। দাঁতের মাজন, জিভছোলা, দাড়ি কামাবার ব্লেড, সাবান, নারকেল তেলের টিন–টুকিটাকি নানা জিনিস সেগুলোতে ধরে গেল।
লেখাপড়ার জন্য এ-ঘরে টেবল চেয়ার নেই। বিনয় ঠিক করে ফেলে, আজই বিকেলের দিকে একবার বেরিয়ে কাছাকাছি কোনও আসবাবের দোকান থেকে কিনে আনবে। দামি কিছু নয়, কাজ চলে গেলেই হল।
সকাল থেকে তেমন কোনও পরিশ্রম হয়নি। কিন্তু সুধাদের বাড়ির নিরানন্দ আবহাওয়া, সবার বিষণ্ণ মুখ, ওদের ছেড়ে আসার জন্য নিজের ভেতরকার চাপা কষ্ট–সব মিলিয়ে ক্লান্তি বোধ করছিল বিনয়। সুবলকে বলল, এখন আর কিছু দরকার নেই। তুমি বিশ্রাম কর গে।
সুবল চলে যাবার পর শুয়ে পড়ে বিনয়। সঙ্গে সঙ্গে তার দুচোখ জুড়ে গভীর ঘুম নেমে আসে।
৫৬-৬০. ঘুম যখন ভাঙল
৫৬.
ঘুম যখন ভাঙল, দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ঘরের জানালা-দরজা হাট করে খোলা। শোবার সময় বন্ধ করার কথা মাথায় ছিল না বিনয়ের।
মরা মরা, নিস্তেজ একটু রোদ তেরছা হয়ে ঘরের মেঝেতে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। কতক্ষণ আর? বড় জোর মিনিট পনেরো কুড়ি। তারপর ওটুকুও আর থাকবে না, ঝপ করে সন্ধে হয়ে যাবে।
দিনের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। শীতের শেষে আর উত্তরে বাতাসের দাপট নেই। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাসটা বইছে তাতে ঠাণ্ডার আমেজ মাখানো। গায়ে বেশ আরামেই লাগে।
সূর্যটা ডান পাশে আড়ালে চলে যাওয়ায় সেটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। তবে আকাশ জুড়ে উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। সারাদিন খাদ্যের খোঁজে ঘোরাঘুরির পর এখন যে যার আস্তানায় ফিরে চলেছে।
আজ আর কোনও কাজ নেই বিনয়ের। সকালের দিকে শান্তিনিবাস-এ আসার জন্য তোড়জোড় ছিল। সুধাদের বাড়ির আবহাওয়া ছিল ভারী, মন খারাপ করে দেবার মতো। এখন খানিকটা হালকা বোধ করছে বিনয়। সুধাদের জন্য ততটা ক্লেশ আর নেই।
পাতলা কম্বলের ভেতর থেকে বেরুতে ইচ্ছা করছিল না। অনন্ত আলস্য তাকে যেন ঘিরে রেখেছে।
কতক্ষণ শিয়রের দিকের খোলা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, বিনয়ের খেয়াল নেই। হঠাৎ সুবলের গলা কানে এল, বাবুর ঘুম নি ভাঙছে?
হাতে ভর দিয়ে উঠে বসল বিনয়। সুবল ততক্ষণে ভেতর দিকের টানা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে পড়েছে। সবে কৈশোর পেরিয়েছে ছেলেটা। এখনও তার চোখেমুখে আশ্চর্য সারল্য মাখানো। প্রথম যেদিন এখানে আসে, সেটা লক্ষ করেছিল বিনয়। একটু হেসে সে বলল, হ্যাঁ, ভেঙেছে। কিছু বলবে?
হ। ম্যানেজারবাবু জিগাইল, অহন নি চা খাইবেন? খাইলে আমারে দিয়া যাইতে কইল।
দেখা যাচ্ছে, মতিলাল চাকলাদার সত্যিই কাজের লোক। বোর্ডারদের সুখ-সুবিধার দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর। কাকে কখন কী পাঠাতে হবে, সমস্ত মনে থাকে। বিনয় বলল, হ্যাঁ, খাব। তুমি নিয়ে এস। আমি ততক্ষণে নিচে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসি।
সুবল জানালো, নিচে যাবার দরকার নেই। দোতলায় এবং তেতলায় একটা করে ছোট চানের ঘর আছে। সেখানে অবশ্য জলের কল নেই। তবে চৌবাচ্চা রয়েছে। মেসের কাজের লোকেরা দিনে তিন-চারবার জল ভরে দিয়ে যায়। তাতে হাতমুখ ধোয়া, চান–সবই চলে। তেতলার চানঘরটা প্রসাদের ঘর ছাড়িয়ে, ভেতর দিকের বারান্দার শেষ মাথায়, জানিয়ে দিয়ে সুবল চলে গেল।
মুখ-টুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে বিনয় দেখল, সুবল এর মধ্যে কাঁচের গেলাস ভর্তি চা আর দুখানা বড় এস বিস্কুট এনে বিছানায় কাগজ পেতে তার ওপর রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই মলিন রোদটুকু এখন আর নেই। সন্ধে নামতে শুরু করেছে। ভেতরটা ঝাপসা। বাতাসের পরাক্রম হঠাৎ করে যেন বেড়ে যেতে লাগল।
সুবল বলল, কপাট-কুপাটগুলান আউজাইয়া (ভেজিয়ে) দেই?
বিনয় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, দাও
শুধু দরজা-টরজাই বন্ধ করল না সুবল, আলোও জ্বালিয়ে দিল। হাওয়ার দাপট ঠেকানো গেছে। বিছানায় বসতে বসতে বিনয় সুবলকে বলল, বোসো
ঘরে টুল বা চেয়ার টেয়ার নেই। বসতে হলে সুবলকে বিছানাতেই বসতে হয়। সে প্রায় সিঁটিয়ে যাচ্ছিল।
একরকম ধমকে সুবলকে বিছানায় বসালো বিনয়। আমার জন্যে তো চা এনেছ। তোমারটা?
সুবল জড়সড়। বলল, আমি চা খাই না
তাহলে এই বিস্কুটগুলো খাও।
সুবল কিছুতেই নেবে না। জোর করে তার হাতে বিস্কুট গুঁজে দিল বিনয়। বড়রা কিছু দিলে না বলতে নেই। প্রসাদদাকে যেমন দাদা মনে কর, আমাকেও তেমনি তোমার দাদা ভাববে। যখন কিছু দেব, না বলবে না। মনে থাকবে?
বিনয়ের কথায় এমন আন্তরিকতা আর মায়া মাখানো যা সুবলকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। আবেগে গলার কাছটা কাঁপছে তার। কথা বলতে পারছিল না। আস্তে মাথা কাত করে জানালো-মনে থাকবে।
