প্রসাদের সূক্ষ্ম খোঁচাগুলো গায়ে মাখছিল না সুধা। সে বলে যায়, প্রসাদদা, বিনুর কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। ও আপনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে। ওকে একটু দেখবেন।
যেটুকু না দেখলে ও বিপদে পড়বে, ঠিক ততটুকুই দেখব। চিন্তা কোরো না।
সুবল মিষ্টি টিষ্টি নিয়ে এসেছিল।
একটা সন্দেশের কোনা ভেঙে মুখে পুরে অনিচ্ছাভরে চিবোতে চিবোতে সুধা বলল, এখানকার খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা কীরকম?
প্রসাদ এর মধ্যেই টের পেয়ে গেছেন, সুধা একটুতেই অস্থির হয়ে পড়ে, একটুতেই ব্যাকুল। বললেন, আমি কুড়ি বছর এই মেসে আছি। আমার থেকেও পুরনো বোর্ডার রয়েছে চার-পাঁচজন। এখানকার ডাল ভাত মাছের ঝোল খেয়ে দিব্যি বেঁচে আছি। আশা করি, বিনয়ও থাকবে।
খানিকক্ষণ চুপচাপ।
তারপর সুধা বলল, আমরা মাঝে মাঝে এসে বিনুকে দেখে যাব।
প্রসাদ বললেন, নিশ্চয়ই আসবে। যখন ইচ্ছে—
খুব শিগগিরই আমাদের নতুন বাড়ির গৃহপ্রবেশ হবে। দিন ঠিক হলে নেমতন্ন করে যাব। বিনুর সঙ্গে আপনি কিন্তু অবশ্যই যাবেন
যাব।
মেসের ম্যানেজার এসে ঢুকল। তাকে বসিয়ে বিনয়দের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন প্রসাদ। তার নাম মতিলাল চাকলাদার। তিন কুলে কেউ নেই। বহুকাল এখানে পড়ে আছে। এই মেসই তার ধ্যানজ্ঞান। তার জগৎসংসার।
বিনয়কে দেখিয়ে প্রসাদ বললেন, এই ছেলেটি আপনার নতুন বোর্ডার। এর কথা আগেই আমার কাছে শুনেছেন।
মতিলাল চাকলাদার ঘাড় হেলিয়ে দেয়, হা হা, অনেক বার।
জীবনে এই প্রথম বাড়ির বাইরে এসে থাকছে বিনয়। কাজের লোকেদের বলে দেবেন, যখন যা দরকার যেন ও পেয়ে যায়। আপনি নিজেও একটু লক্ষ রাখবেন, কোনওরকম অযত্ন না হয়।
মতিলালের আত্মাভিমানে খোঁচা লাগে। গলার স্বর সামান্য উঁচুতে তুলে সে বলে, প্রসাদবাবু, উনত্রিশ বছর শান্তিনিবাস-এ ম্যানেজারি করছি। একজন বোর্ডারও বলতে পারবে, এখানে তাদের অযত্ন হয়েছে? কারও অসুবিধে হচ্ছে কি না, ঘরে ঘরে গিয়ে আমি নিজে খোঁজখবর নিই–
ম্যানেজারের ক্ষোভটা উপশম করার জন্য প্রসাদ নরম গলায় বললেন, আপনি বোর্ডারদের সুখ সুবিধার জন্যে কী করেন তা এখানকার সবাই জানে। তবু কেন বললাম? বিনয়ের বোন-ভগ্নীপতি জেনে যাক, আসলে কার কাছে তাকে রেখে যাচ্ছে।
কথাগুলো বিশেষ করে সুধাকে শোনাবার জন্যেই যে বলা সেটা আন্দাজ করতে পারছিল বিনয়। চোখের কোণ দিয়ে একবার তার ছোটদিকে দেখে নিল। সুধা ভাইয়ের দেখাশোনার ভার দিতে চেয়েছিল প্রসাদকে। তিনি আবার সেটা ঠেলে দিতে চাইছেন মতিলালের দিকে। ফলে সে কতটা ভরসা পেল, বোঝা গেল না।
মতিলাল কাজের লোক। বলল, আমাকে আর কিছু বলবেন? যে হিসেবটা করছিলাম, এখনও মেলেনি। এখানে দরকার না থাকলে নিচে গিয়ে সেটা নিয়ে আবার বসব–
কথা তো হয়েই গেল। আপনি যেতে পারেন। প্রসাদ বলতে লাগলেন, আমারও অফিসে যাবার সময় হয়ে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। এক্ষুনি বেরুতে হবে। বিনয় এবেলা খেয়ে এসেছে। বিকেলে ওকে চা পাঠিয়ে দেবেন।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। একবার যখন শান্তিনিবাস-এর খাতায় নাম উঠেছে তখন বিনয়বাবুর সব চিন্তা আমার। ঘড়ির কাটার সঙ্গে মিলিয়ে সব পেয়ে যাবেন বলে মতিলাল ভারী শরীর টানতে টানতে চলে গেল।
সুধাদের দই-মিষ্টি খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তারাও আর বসল না। বিনয় নিচের রাস্তা অবধি তাদের এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল।
এর মধ্যে জামাকাপড় পালটে অফিসে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছেন প্রসাদ। বললেন, তুমি নিজের ঘরে গিয়ে মালপত্র গুছিয়ে নাও। সুবলকে বোলো সে তোমাকে হেল্প করবে।
আচ্ছা
দুজনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। প্রসাদ দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে বললেন, চল
বিনয় একটু অবাক হল। দরজায় তালা দিলেন না!
দরকার নেই। এই মেসের কাজের লোকেরা ভীষণ অনেস্ট। আমার টাকাকড়ি টেবলে পড়ে থাকে। কোনওদিন একটা পয়সাও এদিক ওদিক হয়নি। প্রসাদ বলতে লাগলেন, অফিস থেকে আমার ফিরতে ফিরতে রাত একটা দেড়টা হয়ে যাবে। তুমি অতক্ষণ জেগে বসে থেকো না। তোমার সময়মতো খেয়ে শুয়ে পোডো-
ভেতর দিকে টানা বারান্দা দিয়ে সিঁড়ির দিকে দুপা এগিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রসাদ। বললেন, আরে, তোমাকে একটা কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম–
উৎসুক সুরে বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
হরিচরণ বসুর নাম শুনেছ?
বিনয় স্মৃতির ভেতর খানিকক্ষণ হাতড়ে বেড়ায়। তারপর একটু অবাক হয়েই বলে, না। তিনি কে?
প্রসাদ বললেন, একজন খুব বড় মাপের ফ্রিডম-ফাইটার। ব্রিটিশ আমলে প্রচুর নির্যাতন ভোগ করেছেন। জেল খেটেছেন পনেরো ষোল বছর। আমাদের এই মহেশ হালদার লেনেই থাকেন।
হঠাৎ এই অদ্ভুত সময়ে, অফিসে বেরুবার মুখে, একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামীর প্রসঙ্গ কেন তুললেন প্রসাদ, বোঝা যাচ্ছে না। বিনয় তার দিকে তাকিয়েই থাকে।
প্রসাদ বলতে লাগলেন, ইনি নতুন ভারত-এ তোমার কলাম দুটো রেগুলারলি পড়ছেন। আমার কাছে খুব প্রশংসা করেছেন। আজ থেকে তুমি শান্তিনিবাস-এ থাকবে শুনে ভীষণ খুশি। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান।
তার লেখা দেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সৈনিকের ভাল লেগেছে, শুনে ভেতরে ভেতরে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে বিনয়। অবশ্য খানিকটা বিস্ময়ও বোধ করে। অত বড় একজন মানুষ আমার মতো সামান্য রিপোর্টারের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছেন কেন?
