পাশাপাশি চলতে চলতে তার ছোটদিটির দিকে নজর রাখছিল বিনয়। সুধার মুখচোখ দেখে টের পাচ্ছিল, এরকম একটা নোংরা, মলিন পরিবেশে ভাই থাকবে বলে তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে।
প্রকাণ্ড মেস বাড়িটা এখন সুনসান। নিঃশব্দ। বোর্ডাররা যে যার কাজে বেরিয়ে গেছে। ওধারে রান্নাঘরের সামনের খোলা বারান্দায় মেসের কটা কাজের লোক তাস খেলছিল। ওরা ছাড়া আর কারওকে দেখা যাচ্ছে না।
চাতালটা ডান পাশে রেখে কয়েক পা এগুলেই ওপরে ওঠার সিঁড়ি। প্রসাদের সঙ্গে হিরণরা সিঁড়ি ভাঙতে লাগল।
তেতলায় নিজের ঘরের লাগোয়া যে ঘরটা প্রসাদ বিনয়ের জন্য ঠিক করে রেখেছিলেন, প্রথমে সবাইকে নিয়ে সেখানে গেলেন তিনি। দক্ষিণ দিকটা পুরোপুরি খোলা। রাস্তার ওধারে ঢ্যাঙা বাড়ি একটাও নেই। যা আছে তার বেশির ভাগই সেকেলে একতলা দালান। ক্কচিৎ দু-চারটে দোতলা। আর রয়েছে বেশ কিছু টিনের চালের চাপ-বাঁধা বস্তি। ফলে এত উঁচুতে বিনয়ের ঘরে আলো-হাওয়ার অভাব কখনও হবে না।
ঘরটা সবে চুনকাম করা হয়েছে। টাটকা চুনের ঝাঝালো গন্ধ নাকে আসছিল। আসবাব সামান্যই। একটা মান্ধাতার আমলের ন্যাড়া তক্তপোশ, একটা বেঁটে কাঠের আলমারি, দেওয়ালে ঝোলানো তাকওলা বড় একটা আয়না।
লটবহর মেঝেতে নামিয়ে রেখে একধারে অপেক্ষা করছিল সুবল।
প্রসাদ বললেন, অবিনাশ পাঁজা বলে এক ভদ্রলোক পঁয়ত্রিশ বছর এখানে ছিলেন। গেল সপ্তাহে রিটায়ার করে বর্ধমানে ওঁদের দেশের বাড়িতে চলে গেছেন। এখন থেকে এই ঘরটা বিনয়ের কথা বলছিলেন ঠিকই, তার চোখ কিন্তু ঘুরে ঘুরে সুধার দিকে চলে যাচ্ছিল। ওরা কেন বিনয়ের সঙ্গে শান্তিনিবাস-এ এসেছে আগেই সেটা মোটামুটি আঁচ করে নিয়েছিলেন। এবার বললেন, বয়েসে অনেক ছোট। তুমি করে বলছি কিন্তু
সুধা বলল, তাই তো বলবেন।
প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, ভাইয়ের ঘর পছন্দ হয়েছে?
সুধা প্রশ্নটার জবাব না দিয়ে বলল, দেখুন, আমরা ইস্ট পাকিস্তানের সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ করে টালিগঞ্জে বিরাট তেতলা বাড়ি পেয়েছি। সেখানে বিনুর জন্যে একটা বড় ঘর ঠিক করে রাখা আছে। কিন্তু ছেলে জেদ ধরে মেসে চলে এল– তার কণ্ঠস্বর থেকে দুঃখ, অভিমান, ক্ষোভ বেরিয়ে আসছিল। সরাসরি না বললেও মেসের ঘর যে পছন্দ নয়, সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল সে।
বিনয়ের কাছে সবই শুনেছেন প্রসাদ। মৃদু হেসে বললেন, ভাইকে আগলে না রেখে একটু সাবালক হতে দাও না
পাশে দাঁড়িয়ে বিনয়ের মনে পড়ল, দ্বারিক দত্ত বিনয়ের স্বাবলম্বী হবার কথা বলেছিলেন। প্রসাদ বলছেন সাবালক হতে। একই ব্যাপার।
সুধা কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রসাদ বললেন, চল, আমার ঘরে গিয়ে বসা যাক- সুবলকে ডেকে পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে দিতে বললেন, যা, চট করে গৌরাঙ্গ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে নলেন গুড়ের সন্দেশ আর মিষ্টি দই নিয়ে আয়
তাদের আপ্যায়নের জন্যই যে সুবলকে পাঠানো হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না সুধা আর হিরণের। তারা হইচই বাধিয়ে দেয়, না না, এখন কিছু আনাবেন না। আমাদের চান-খাওয়া হয়নি। বাড়িতে সব রান্না করা আছে। এখন খেলে ফিরে গিয়ে কী করে খাব?
প্রসাদ কোনও কথাই কানে তুললেন না। হাত নেড়ে সুবলকে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা বিনয়ের বোন-ভগ্নীপতি। প্রথম দিন এসেছ। একটু কিছু মুখে না দিলে আমার ভীষণ খারাপ লাগবে। বাড়িতে গিয়ে দুটি ভাত না হয় কমই খাবে।
প্রসাদের আচরণে এবং কথাবার্তায় এমন একটা আন্তরিকতা মাখানো যে সুধারা আর আপত্তি করে না।
বিনয় বলল, ছোটদিরা খেয়ে আসেনি। আমাকে কিন্তু খাইয়ে এনেছে। এখন আর আমি কিছু খেতে পারব না।
প্রসাদ হেসে হেসে মজার গলায় বললেন, দিদি-জামাইবাবুকে সঙ্গ দেবার জন্যে দু-একটা সন্দেশ খেও। নইলে কি ভাল দেখায়? চল আমার ঘরে
সুধা ব্যস্তভাবে বলল, আমি বিনুর বিছানাটা পেতে, জামাকাপড়গুলো আলমারিতে গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।
সে হোল্ড-অল আর সুটকেস টুটকেসগুলোর দিকে পা বাড়িয়েছিল কিন্তু যাওয়া হল না। প্রসাদ খুব শান্ত গলায় বললেন, না, তোমাকে কিছু করতে হবে না। যা করার বিনয়ই করবে। এস
প্রসাদকে বেশ ভাল লাগছিল সুধার। অমায়িক। স্নেহপ্রবণ। মানুষকে নিমেষে আপন করে নেবার দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই প্রথম টের পাওয়া গেল, প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারীও। তিনি কিছু বললে অমান্য করা যায় না।
নিজের ঘরে এনে সবাইকে বসালেন প্রসাদ।
ভাইয়ের চিন্তাটা অবিরল মাথায় ঘুরছিল সুধার। সে বলল, এতদিন পাকিস্তানে দাদু দিদাদের কাছে থাকত বিনু। ইন্ডিয়ায় আসার পর আমার কাছে ছিল। ও কিছুই পারে না
প্রসাদ বললেন, এখন থেকে পারবে।
ভীষণ অন্যমনস্ক। খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হয়।
আর মনে করাতে হবে না। তেমন খিদে পেলে ঠিক খেয়ে নেবে।
ভাইয়ের সম্পর্কে সুধার উদ্বেগটা আমলই দিচ্ছেন না প্রসাদ। তবু সুধা বিনু এটা পারে না, সেটা পারে নার লম্বা তালিকা আওড়ে যায়।
প্রসাদের বোধহয় মজাই লাগে। বলেন, ভাইকে তুলোর বাক্সে পুরে রেখেছিলে দেখছি। বাইরের আঁচ একেবারে গায়ে লাগতে দাওনি। তুমি যা যা বললে, এবার থেকে সেগুলো সব পারবে বিনয়। পুরুষ মানুষকে ভোলা বাতাসে ছেড়ে দিতে হয়। নইলে অপদার্থ হয়ে যায়।
