দুপুরে খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে বেরিয়ে পড়বে বিনয়। তাই সকালে উঠেই চাটা খেয়ে তার জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলল সুধা। জামাকাপড়, তোষক, বালিশ টালিশ-সমস্ত কিছু একটা সুটকেস আর হোল্ড-অলে ধরে গেল।
খাওয়া চুকতে ঢুকতে দুপুর পেরিয়ে গেল। এখন প্রায় দেড়টা।
হিরণ ট্যাক্সি ডেকে এনেছিল। শিখ ড্রাইভারকে সঙ্গে করে ওপরে এনে সে বিনয়ের মালপত্র নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এদিকে সুধা বিনয়কে ঠাকুর-ঘরে নিয়ে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে প্রণাম করিয়েছে। তারপর সরস্বতী এবং দ্বারিক দত্তকে প্রণাম সেরে উমার মাথায় হাত বুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল । বিনয়। জাফর শা রোডের বাড়িটার আবহাওয়া দুটো দিন কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। সেটা আরও বিষাদময়, আরও থমথমে হয়ে গেল।
আগে আগে নামছিল হিরণ। তারপর বিনয়। পেছনে সুধা, উমা, দ্বারিক দত্ত। এমনকি সরস্বতীও ঘরে বসে থাকতে পারেননি। জরাজীর্ণ শরীর টানতে টানতে তিনিও সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন।
বাইরে এসে প্রথমে ট্যাক্সিতে উঠল হিরণ। বিনয় সুধার মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না। অন্য দিকে চোখ রেখে বলল, চলি ছোটদি-
ঠিক ছিল, হিরণ তাকে শান্তিনিবাস-এ পৌঁছে দিয়ে আসবে কিন্তু সে ট্যাক্সিতে ওঠার আগেই আচমকা কী যেন হয়ে যায় সুধার। আমিও যাব– বলেই ট্যাক্সিতে উঠে পড়ে সে। আসলে ভাই কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে থাকবে, সেখানে কতটা আরাম, কতটুকু স্বাচ্ছ প্য–নিজের চোখে না দেখা অবধি স্বস্তিবোধ করছিল না।
হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আস্তে আস্তে বিনয় উঠে সুধার পাশে বসে।
সুধার পরনে আধময়লা শাড়ি, ঘরোয়া ধরনে পরা। হিরণ হকচকিয়ে গিয়েছিল। বলল, এ কি, এ কি! যাবেই যখন, শাড়িটা পালটে এস।
সুধা বলল, দরকার নেই।
হিরণ জানে, সুধা ভীষণ জেদি। একবার যখন উঠে বসেছে, নামানো যাবে না। সে ড্রাইভারকে। বলল, চলিয়ে–।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করে। বাইরে অজস্র মানুষ। বিপুল কলরোল। ধাবমান যানবাহনের বিরামহীন আওয়াজ। কিন্তু গাড়ির ভেতরটা আশ্চর্য রকমের নিঝুম। কেউ একটা কথাও বলছিল না।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিনয়। রাজদিয়া থেকে আসার পর প্রথমে সুনীতিদের বাড়ি উঠেছিল সে। সেখান থেকে সুধাদের কাছে। তারপর প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে তাদের সেই পুরানো বাড়ি হয়ে ফের জাফর শা রোডে। ক্রমাগত বাড়ি বদল। একের পর এক।
এবার শান্তিনিবাস। বিনয়ের মনে হল, জীবনের নতুন একটা পর্বে পা রাখতে চলেছে সে।
.
৫৫.
শীত ফুরিয়ে এসেছে। এই দুপুরবেলায় মহেশ হালদার লেনের মেস-বাড়ি অর্থাৎ শান্তিনিবাস-এ পৌঁছতে আধঘণ্টাও লাগল না।
ট্যাক্সি থামিয়ে প্রথমে নামল বিনয়। তারপর একে একে হিরণ এবং সুধা।
ওপর থেকে একটা গলা ভেসে এল, যাক, এসে গেছ। তোমার জন্যে ওয়েট করছিলাম।
বিনয় মুখ তুলে তাকায়। তেতলার রাস্তার দিকের টানা বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন প্রসাদ। কাল অফিসে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যতক্ষণ না সে শান্তিনিবাস-এ পৌঁছচ্ছে, তিনি মেসেই থাকবেন। নতুন জায়গা। মেসের প্রায় কারওকেই চেনে না বিনয়। তিনি না থাকলে ওর অসুবিধা হবে। বলেছিলেন, মেসে তার সব ব্যবস্থা করে দিয়ে আজ তিনি অফিসে যাবেন। কিন্তু প্রসাদ যে তেতলার বারান্দায় পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, ভাবা যায়নি।
চোখাচোখি হতেই হাত তুলে প্রসাদ বললেন, দাঁড়াও, আমি আসছি।
একটু পরেই প্রসাদ নিচে নেমে এলেন। সঙ্গে সেই ছেলেটি। সুবল। আগে একবারই এখানে এসেছে বিনয়। সেদিন সুবলকে দেখে গিয়েছিল। ষোল সতেরো বছর বয়স। এই মেসেই কাজ করে।
বিনয়ের সঙ্গে হিরণ আর সুধাকে দেখে বেশ অবাক হলেন প্রসাদ।–এরা?
আমার ছোটদি আর ছোট জামাইবাবু প্রসাদের সঙ্গে হিরণদের পরিচয় করিয়ে দিল বিনয়।
ও, আচ্ছা আচ্ছা—
প্রসাদ বয়সে অনেক বড়। সুধা আর হিরণ তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে।
ওদিকে ট্যাক্সিওলা বিনয়ের হোল্ড-অল ব্যাগট্যাগ নামিয়ে ফেলেছিল। প্রসাদ সুবলকে বললেন, মালপত্র আমার ঘরের পাশের ঘরটায় নিয়ে যা
বলমাত্র জিনিসগুলো কাঁধে চাপিয়ে, হাতে ঝুলিয়ে চলে গেল সুবল।
হিরণ ট্যাক্সিভাড়া চুকিয়ে দিল। তারপর সবাইকে সঙ্গে করে শান্তিনিবাস-এ ঢুকলেন প্রসাদ। ভেতরে এসে একবার একতলার প্যাসেজের ডান পাশের ঘরটায় মুখ বাড়ালেন।
বিনয় লক্ষ করল, ঘরের মাঝখানে টেবলে একটা ঢাউস খাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে সেই টাকমাথা, মাঝবয়সী, ভারী চেহারার লোকটা খুব মন দিয়ে কী সব লেখালেখি করছে। আগের দিনও তাকে। হুবহু একই ভঙ্গিমায় লিখতে দেখেছে সে।
প্রসাদ লোকটিকে বললেন, ম্যানেজারবাবু, আপনার নতুন বোর্ডার এসে গেছে। হিসেবপত্তর বন্ধ করে একটু ওপরে আসবেন?
লোকটা অর্থাৎ ম্যানেজারবাবু মাথা তোলে। নিকেলের গোল চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে শশব্যস্তে বলে, হাতের কাজটা হয়ে এল। বাকিটুকু সেরেই যাচ্ছি প্রসাদকে সে যে যথেষ্ট সমীহ করে সেটা তার বলার ধরনে টের পাওয়া যায়।
প্রসাদ দাঁড়ালেন না। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা শেষ করেই এগিয়ে চললেন।
আর-একটু ভেতর দিকে শ্যাওলা-ধরা মস্ত চাতালে বুকসমান উঁচু দুটো চৌবাচ্চা, গঙ্গাজল আর কর্পোরেশনের জলের কল, উঁই-করা এঁটো বাসনকোসন, ঝুলকালিমাখা রান্নাঘর, চারদিকের দেওয়াল থেকে জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসার ফলে ঘায়ের মতো অজস্র দাগ-এ-সব দেখতে দেখতে মুষড়ে পড়ছিল সুধা।
