তার কথা শেষ হয় না। সুধা হঠাৎ কেঁদে কেটে মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যকে খান খান করে দেয়। তার ওপর যেন হিস্ট্রিরিয়া ভর করেছে। ভাইয়ের কাঁধটা ধরাই ছিল। উন্মাদের মতো তাকে ঝুঁকি দিতে দিতে বলে, তা হলে কেন যাবি? আমরা ছাড়া তোর কে আছে এই শহরে? মরে গেলেও তোকে আমি মেসে যেতে দেব না।
বিনয় সুধাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে।আমার কথাটা শোন। কঁদিস না ছোটদি-কাঁদিস না তার গলা ভারী হয়ে আসে।
সুধা ভাইয়ের কোনও কথাই কানে তোলে না। অবুঝ বালিকার মতো সে বলে যায়, এক্সচেঞ্জ করে কত বড় বাড়ি পেয়েছি। ভেবেছি তোকে নিয়ে একসঙ্গে থাকব। কত কষ্ট পেয়েছিস। তোকে বুকের ভেতর থেকে কান্নার বলক বার বার উঠে আসতে থাকে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে জড়ানো গলায় সে বলে যায়, আমাকে দুঃখ দিস না বিনু
সুধা যে তাকে কতখানি ভালবাসে, তার প্রতি ছোটদির যে অপার মায়া, বোধবুদ্ধি হবার পর থেকেই বিনয় জেনে এসেছে। তারা পিঠোপিঠি ভাইবোন। তেরো চোদ্দ বছর বয়স অবধি সারাক্ষণ মারপিট লেগেই থাকত। এই হয়তো মহাযুদ্ধ, পরক্ষণে সন্ধি। হাজার ধুন্ধুমারের মধ্যেও একটা মুহূর্তও একজনকে ছাড়া আর-এক জনের চলত না। তলায় তলায় পরস্পরের প্রতি কী যে গভীর টান!
সুধার কান্নাটা বিনয়ের মধ্যেও চারিয়ে যাচ্ছিল। একবার ভাবল, এত ভালবাসা তুচ্ছ করার ব্যাপার নয়। ওদের কাছেই থেকে যাবে। কাল অফিসে গিয়ে প্রসাদকে জানিয়ে দেবে, সে মেসে যাচ্ছে না। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে শক্ত করে নিল। বলল, তোরা তো রইলিই। যদি দেখি মেসে থাকা যাচ্ছে না, তোদের কাছে চলে আসব।
সুধা উত্তর দিল না। বিনয়ের কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে নিয়ে দৌড়ে বাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হিরণ এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে বিষাদ মাখানো। বিনয় তাকে বলে, হিরণদা, ছোটদিকে আপনি একটু বোঝান
হিরণ বলল, কী কারণে তুমি চলে যেতে চাইছ, বুঝতে পারছি না। আমাদের দিক থেকে কি কোনও ত্রুটি হয়েছে?
বিনয় বিব্রত হয়ে পড়ে। –না না, ত্রুটির কোনও প্রশ্নই নেই। একটু আগেই তো বলছিলাম, এখানে এসে যে আদর-যত্ন পেয়েছি, বাকি জীবনে আর কি কারও কাছে তা পাব?
তাহলে?
নতমুখে বিনয় জানায়, হিরণরা যতই আপনজন হোক, এটা তার দিদির শ্বশুর বাড়ি। পাকিস্তান থেকে চলে আসার পর সে এতটাই নিরুপায় হয়ে পড়েছিল যে সুধাদের আশ্রয় ছাড়া অন্য কোথাও যাবার জায়গা ছিল না। এখন সে চাকরি পেয়েছে, রোজগার করছে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। এ ছাড়া মেসে যাবার অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।
হিরণ এভাবে ঠিক চিন্তা করেনি। সুধার মতো অতটা প্রবল না হলেও এক ধরনের আবেগ তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। রাজদিয়ায় শেষ যখন বিনয়কে দেখে এসেছে তখন কত আর তার বয়স, নেহাতই এক কিশোর। তারপর কতগুলো বছর কেটে গেছে। দেশভাগের পর এপারে চলে এলেও হিরণের মনে হতো, বিনয় বুঝি সেই ছেলেবেলাতেই থেমে আছে। তার মা নেই, বাবা যাবতীয় সাংসারিক বন্ধন ছিঁড়ে চলে গেছেন গুরুর আশ্রমে, ঝিনুকের জন্য সুনীতিদের বাড়িতে হেমনলিনীর নিষ্ঠুর আচরণে সে ভেঙে পড়েছিল। সব মিলিয়ে হিরণের মনে হয়েছে, উদভ্রান্ত বিনয়কে গভীর মমতায় ঘিরে রাখা দরকার। এই পৃব্বিীতে কত যে সংকট, কত যে সমস্যা। বিনয়কে আগলে না রাখলে সে চুরমার হয়ে যাবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে বিনয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে হঠাৎই তার সম্বন্ধে যেন সচেতন হয়ে উঠে হিরণ। বিনয় আর রাজদিয়ার সেই আদুরে, সরল কিশোরটি নেই। সে এখন এক পরিপূর্ণ যুবক। তার মধ্যে কখন যেন প্রখর আত্মসম্মানবোধ তৈরি হয়ে গেছে। সে কারও আশ্রয়ে থাকতে চায় না। স্বাধীনভাবে নিজের জীবন গড়ে তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
কী জবাব দেবে, ভেবে পেল না হিরণ।
দ্বারিক দত্ত নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতক্ষণে মুখ খুললেন। হিরু, আমার একটা কথা বলার আছে।
হিরণ তার ঠাকুরদার দিকে তাকায়।
দ্বারিক দত্ত বলতে লাগলেন, বিনু যখন চাইছে, ওকে স্বাবলম্বী হতে দে। আমাদের নতুন বাড়ির দরজা তো খোলা রইলই। যখন ইচ্ছে চলে আসতে পারবে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও হিরণ বলল, ঠিক আছে।
বিনয় আর হিরণদের শোবার ঘর দুটো পাশাপাশি নিজের ঘরে এসে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ সুধার ফোঁপানির আওয়াজ শুনতে পেল বিনয়। টের পেল, তার নিজেরও দুচোখ বাষ্পে ভরে গেছে।
.
দুদিন কেটে গেল।
আজ বিনয় শান্তিনিবাস-এ চলে যাবে। হিরণ তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। তাই অফিসে ছুটি নিয়েছে। বিনয় আজ তার অ্যাসাইনমেন্ট অনুযায়ী কলোনি বা ত্রাণশিবিরে যাবে না। সেও ছুটি নিয়েছে।
মাঝখানের দুটো দিন সুধা ভাল করে খায়নি, ঘুমোয়নি। সেদিন রাতের মতো উতরোল কান্নাটা হয়তো নেই। তবে সারাক্ষণ যেন বিষাদপ্রতিমা। কাজের মেয়ে উমারও মন খারাপ। দ্বারিক দত্ত যদিও বলেছেন, বিনয় স্বাবলম্বী হোক, ভেতরে ভেতরে তিনিও কষ্ট পাচ্ছেন। জবুথবু, অথর্ব সরস্বতী, পৃথিবীর সমস্ত ব্যাপারে যিনি সম্পূর্ণ উদাসীন, নিজের রোগভোগ নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত, তিনিও ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়েছেন। বিনয়কে কাছে ডেকে তার দুটি হাত জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বলেছেন, যাস না বিনু। তুই চলে গেলে আমরা বড় কষ্ট পাব। বিনয় উত্তর দিতে পারেনি।
এই দুটো দিন মুহ্যমানের মতো কাটালেও সব দিকে সুধার নজর। পাকিস্তান থেকে আসার পর আনন্দ কটা ধুতি, শার্ট আর চাদর কিনে দিয়েছিল। যাকে রোজ বেরুতে হয়, ওই সামান্য পোশাকে কি চলে? তাই নিজে উমাকে সঙ্গে নিয়ে লেক মার্কেট থেকে নতুন কটা ধুতি, গরম কাপড়ের শার্ট, গেঞ্জি, চাদর, সোয়েটার কিনে নিয়ে এসেছে। শুধু তাই না, নতুন জায়গায় ভাই যাতে আরামে থাকতে পারে, তাই তোষক, বালিশ, বিছানার চাদর, লেপ এবং হোল্ড-অলও কিনেছে। তাছাড়া কিনেছে কটা কাপ প্লেট, কাঁচের গেলাস, বাথরুমের জন্য মগ, ঘরে পরার চটি, দাঁতের মাজন, জিভছোলা, ইত্যাদি।
