আজ কিন্তু উদ্বাস্তুদের কথা উঠলই না। বিনয় সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরেছে, কেউ জানতে চাইল না।
হিরণ বলল, বিনু, রোজই তুমি সকালে উঠে কলোনি কি ক্যাম্পে চলে যাও। এই উইকে একটা দিন না গেলে হয় না?
বিনয় অবাক হল।-কেন বলুন তো?
খান মঞ্জিল সারানো হয়ে গেছে। এখন রং করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়িই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে। ভীষণ ব্যস্ত থাকে বলে এর ভেতর তোমাকে দেখে আসার কথা বলিনি।
হিরণ বলতে লাগল, কিন্তু আমাদের সবার ইচ্ছে, তুমি একবার ওখানে যাও। এখন দেখলে বাড়িটা চিনতে পারবে না।
কাগজের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে সারাদিন ছোটাছুটি, তারপর অফিসে গিয়ে ঘাড় গুঁজে দু দুটো লেখা তৈরি করে জমা দেওয়া। এটা একটা দিক। আর-এক দিকে রয়েছে পাঠকদের বিপুল প্রত্যাশা। সকাল থেকে রাত অবধি অদ্ভুত এক নেশার ঘোরে কেটে যায় বিনয়ের। তার মধ্যে খান মঞ্জিল-এর কথা একেবারেই খেয়াল ছিল না।
বিনয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আজ অফিস থেকে বেরুবার সময় ঠিক করে রেখেছিল, খাওয়া দাওয়ার পর মেসে চলে যাবার কথাটা সুধাদের জানিয়ে দেবে। চিন্তাটা আবার মাথায় ফিরে এসেছে। কিন্তু তা নিয়ে কিছু বলার আগেই হিরণ খান মঞ্জিল-এর প্রসঙ্গ তুলল। উত্তর একটা না দিলেই নয়। বিনয় বলল, কী করে যাব? যা কাজের চাপ
সুধা জোর দিয়ে বলে, তোকে যেতেই হবে। কী বাড়ি কী হয়েছে, না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবি না। তোর ঘরটা নতুন খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল দিয়ে আমি নিজের হাতে সাজিয়ে দেব।
বুকের ভেতরটা থির থির কাঁপতে থাকে বিনয়ের। সে গিট খুলে চলে যেতে চাইছে, আর সুধারা চাইছে তাকে হাজার পাকে জড়িয়ে রাখতে। সে জবাব দিল না।
হিরণ বলল, বুঝলে বিনু, একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে
বিনয় মুখ ফিরিয়ে হিরণের দিকে তাকায়।-কী সমস্যা?
ও-বাড়ির নাম তো আর খান মঞ্জিল রাখা যাবে না। নতুন নামকরণ করতে হবে। আজ অফিস থেকে ফিরে এই নিয়ে সুধা আর দাদুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। অনেকগুলো নাম আমরা ভেবেছি। কিন্তু ডিশিসান নিতে পারিনি। সবাই মিলে ঠিক করলাম, তুমি ফিরে এলে নামটা ফাইনাল করা হবে।
বিনয় কৌতূহল বোধ করে না। কিন্তু হিরণদের এত আগ্রহ যে কিছু না বলাটা অভদ্রতা। নিরুৎসুক সুরে সে জিজ্ঞেস করে, কী নাম ভেবেছেন?
হিরণ গড় গড় করে অনেকগুলো নাম আওড়ে যায়। দত্ত নিবাস, দত্ত ভিলা, আনন্দ নিকেতন, স্বপ্নের নীড়, আবাস, রাজদিয়া হাউস ইত্যাদি।
দ্বারিক দত্ত বললেন, রাজদিয়া হাউস নামটা আমিই বলেছিলাম। ইস্ট বেঙ্গলে তো আর কোনও দিন যাওয়া হবে না। রাজদিয়ার নামটা থাকলে যতদিন ওই বাড়ি আছে, দেশও এ বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে থাকবে।
এক পলক দ্বারিক দত্তকে দেখে তার মনোভাবটা আন্দাজ করে নিল বিনয়। পৃথিবীর যে ভূখণ্ড থেকে চিরকালের মতো চলে এসেছেন তার স্মৃতি বিলীন হয়ে যাক, বৃদ্ধ কোনওভাবেই তা চান না। কবছর বিয়ে হলেও সুধার ছেলেমেয়ে হয়নি। হবে নিশ্চয়ই। বাড়ির নামের সঙ্গে রাজদিয়াকে জড়িয়ে রাখার কারণ একটাই। উপ-মহাদেশের কোন প্রান্তে ছিল দত্তদের আদি নিবাস, কোন মৃত্তিকায় ছিল পূর্বপুরুষদের অস্তিত্বের মূল শিকড়, বংশধরেরা তা যেন কোনওদিন ভুলে না যায়। বাড়ির নামটা দেখলেই তাদের রাজদিয়ার কথা মনে পড়ে যাবে। ওদের কারও যদি কখনও ইচ্ছে হয়, শিকড়ের টানে বাপ-ঠাকুরদার জন্মভূমি দেখতে চলেও যেতে পারে।
নামকরণ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হইচই হল। সুধার পছন্দ আনন্দ নিকেতন, হিরণের স্বপ্নের নীড়। সবাই বিনয়ের মতামত জানতে চায়। কিন্তু যার আদৌ কোনও ঔৎসুক্য নেই, সে আর কী বলতে পারে? শুধু হুঁ হাঁ করে গেল। শেষপর্যন্ত অবশ্য ঠিক হল, দ্বারিক দত্তর সেন্টিমেন্টকে মর্যাদা দিয়ে বাড়ির নাম রাজদিয়া হাউসই রাখা হবে।
বাইরের ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে চোখ পড়তে চমকে ওঠে সুধা, ওরে বাবা, পৌনে বারোটা বেজে গেছে। এই, সবাই উঠে পড়। আর দেরি করে শুলে শরীর খারাপ হবে।
যে কুণ্ঠাটা ছিল সেটা এবার কাটিয়ে ওঠে বিনয়। মনস্থির করে ফেলেছে সে। সিদ্ধান্তটা যদিও কঠোর, তবু না জানালেই নয়।
বিনয় বলল, ছোটদি, তোরা আর-একটু বোস। আমার একটা কথা আছে
সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল। ধীরে ধীরে ফের বসে পড়ে।
সুধা জিজ্ঞেস করে, কী কথা রে?
আমি–আমি
তুই কী?
প্রথম বার বলতে গিয়েও আটকে গিয়েছিল। এবার চোখকান বুজে জানিয়ে দিল বিনয়, আমি একটা মেস ঠিক করেছি। দু-একদিনের ভেতর সেখানে চলে যেতে চাই
কথাগুলো যেন মাথায় ঢোকে না সুধার। ভাইয়ের দিকে হতবাক তাকিয়ে থাকে সে।
হিরণ কিন্তু ঠিকই ধরে ফেলেছে।-কী বললে, মেসে যাবে?
বিনয় আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
এতক্ষণে ব্যাপারটা বোধগম্য হয় সুধার। আচমকা প্রবল ধাক্কায় জগৎসংসার তোলপাড় হয়ে যায় তার। বিনয়ের কাঁধ দুই হাতে আঁকড়ে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, মেসে যাবি? কেন? কেন? কেন?
হিরণও কম হকচকিয়ে যায়নি। বলল, এখানে কি তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে?
কুণ্ঠিত বিনয় জোরে জোরে মাথা ঝাঁকায়। কী বলছেন হিরণদা! পাকিস্তান থেকে আসার পর আপনারা যদি কাছে টেনে না নিতেন, ঝিনুককে নিয়ে কী করতাম, কোথায় যেতাম, ভাবতেও ভয় হয়। আপনারা আমাকে কী যত্ন যে করছেন তা শুধু আমিই জানি। দাদু, দিদা আর মা ছাড়া অন্য কেউ
