দেশভাগের পর হইতে উদ্বাস্তু সমস্যা সারা ভারতবর্ষকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়াছে। প্রথমে পশ্চিম প্রান্তের, বিশেষ করিয়া খণ্ডিত পাঞ্জাবের পশ্চিম অঞ্চল হইতে যাহারা আসিয়াছে তাহাদের কথা বলা যাক। কেন্দ্রীয় সরকার দরাজভাবে ইহাদের জন্য খরচ করিতেছে।
পশ্চিম পাকিস্তানের হিন্দু এবং শিখ শরণার্থীদের জন্য ব্যাপক পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হইয়াছে। তাহাদের জমিজমা দিয়া বসানো হইতেছে লুধিয়ানা, মোগা, সাহাবাদ, কার্নাল, পানিপথ, রোটক, ভিয়োয়ান্দি, গুরগাঁও ইত্যাদি স্থানে। বহু সংখ্যক পরিবারকে পাঠানো হইয়াছে বিহার, যুক্তরাজ্য, মহারাষ্ট্র, সেন্ট্রাল প্রভিন্স প্রভৃতি অঞ্চলে। কুরুক্ষেত্র হইতে ভিসাপুর, গোয়ালিয়র, রেওয়া, ইন্দোর–যেখানেই ফাঁকা জায়গা পাওয়া গিয়াছে সেখানেই সরকারি সহায়তায় গড়িয়া উঠিতেছে নূতন নূতন জনপদ।
শুধু আশ্রয়ের জন্য বাড়িঘর বানাইয়া দেওয়াই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ যাহাতে সুরক্ষিত হয়, নিজেদের পায়ে তাহারা যাহাতে দাঁড়াইতে পারে, সেজন্য বিপুল আয়োজন করা হইয়াছে। যেখানে যেখানে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন হইয়াছে সেই সব অঞ্চলের কাছাকাছি বসানো হইয়াছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। হাতে-কলমে কাজ শিখিয়া এইসব কেন্দ্রগুলি হইতে বাহির হইলেই কলকারখানায় চাকরি বাঁধা। ইহা ছাড়া মেয়ে এবং ছেলেদের জন্য নানারকম বৃত্তিমূলক কাজ শেখানোর ব্যবস্থাও করা হইয়াছে। দিল্লি, রোটক, লুধিয়ানা, পানিপথ, কার্নাল ইত্যাদি স্থান এই ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং জাতীয় ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে ভরিয়া গিয়াছে।
নূতন নূতন বাজার তো বসানো হইয়াছেই, পূর্ব পাঞ্জাবের মুসলমানদের ফেলিয়া যাওয়া বাজারগুলিতে দীর্ঘমেয়াদি লিজে প্রায় বিনামূল্যে ওপার হইতে আসা শরণার্থীদের দেওয়া হইতেছে। ছোটখাটো হিন্দু এবং শিখ ব্যবসাদারদের দোকান করিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা হইতেছে। অজস্র নূতন প্রাইমারি ও হাইস্কুল বসানো হইয়াছে। শরণার্থী শিক্ষকেরা সেগুলিতে চাকরি পাইতেছে। ওপারের উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার-কেহই বসিয়া নাই। সবার জন্য কাজের অবাধ সুযোগ।
ইহা ছাড়াও কেন্দ্রীয় ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রক পশ্চিম পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের জন্য সম্প্রতি তিন কোটি টাকা বরাদ্দ করিয়াছে।
পাঞ্জাবের শরণার্থীদের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের অদৃষ্ট খুবই খারাপ। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণের কিছু ব্যবস্থা হইয়াছে ঠিকই। কলিকাতার আশেপাশে দু-একটি ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারও বসানো হইয়াছে কিন্তু সুষ্ঠু, সুপরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এখনও হয় নাই। কিছু উদ্বাস্তু মরিয়া হইয়া জবরদখল কলোনি বসাইয়াছে, কিন্তু বাকিরা?
ইতিমধ্যেই আনুমানিক কুড়ি লক্ষ মানুষ ওপার হইতে ইণ্ডিয়ায় চলিয়া আসিয়াছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেয় নাই। তাহাদের ধারণা, বাঙালি শরণার্থীরা আসার ফলে বিরাট কোনও সমস্যার উদ্ভব হয় নাই। আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের ফাঁকা জায়গাগুলিতে তাহাদের পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত হইয়া যাইবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আসামের অবস্থা অগ্নিগর্ভ। সেখানকার মানুষ চায় না, বাঙালি উদ্বাস্তুতে ওই প্রদেশটি ভরিয়া যাক। বহু শরণার্থী যাহারা আসামে আসিয়াছিল, তাড়া খাইয়া দ্বিতীয়বার উদ্বাস্তু হইয়া পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া আসিতেছে।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ কী, আদৌ তাহাদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত হইবে কি না, ভাবিলে আতঙ্কিত হইতে হয়। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত অন্য কোনও উপায় নাই।..
এই লেখাটা বেরুবার পর নানা মহলে তীব্র আলোড়ন শুরু হয়ে যায়।
.
৫৪.
নতুন ভারত-এ বিনয়ের একমাস পূর্ণ হল। অফিসে এসে মাইনেও পেয়ে গেছে। আগেই ভেবে রেখেছিল, প্রথম মাসের মাইনে হাতে এলে শান্তিনিবাস-এ চলে যাবে। প্রসাদ তার জন্য একটা ঘরও ঠিক করে রেখেছেন।
আর দেরি নয়, আজই বাড়ি ফিরে মেসে যাবার কথাটা সুধাদের জানিয়ে দিতে হবে।
রোজ রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকলে বাইরের ঘরে বসে সুধা হিরণ আর বিনয় খানিকক্ষণ গল্প করে। সেই সকালবেলা বেরিয়ে বিনয় কোন কোন ত্রাণশিবির বা জবরদখল কলোনিতে গেছে, সেই সব জায়গায় কাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কী অবস্থায় তারা আছে, কিংবা কলোনি টলোনি ঘুরে নতুন ভারত অফিসে ফেরার পর কী কী ঘটেছে-খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত জানতে না পারলে সুধা আর হিরণের পেটের ভাত হজম হয় না।
দ্বারিক দত্তরও অনন্ত কৌতূহল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে ছিন্নমূল মানুষেরা সীমান্তের এপারে চলে এসে কী নিদারুণ পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছে সে সম্পর্কে তিনিও জানতে চান। কিন্তু যথেষ্ট বয়স হয়েছে। কবেই সত্তর পেরিয়েছেন। ইদানীং শরীর একদিন ভাল থাকে ত পরের দিন খারাপ। বেশির ভাগ দিনই সন্ধের পর দুখানা সুজির রুটি, এক বাটি দুধ আর দু-একটা মিষ্টি খেয়ে শুয়ে পড়েন।
যেদিন শরীর ভাল থাকে, রাত্তিরে বিনয়দের সঙ্গে গল্প করতে বসে যান দ্বারিক দত্ত। আজ নিজেকে বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে। তাই গায়ে ঘন করে গরম শাল জড়িয়ে বাইরের ঘরের আসরে এসে বসেছেন।
