বিনয় উত্তর দেয় না। আস্তে মাথা নাড়ে শুধু। পারমিতা থামেনি।–ইস্ট বেঙ্গলটা দেখে আসার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এ-জীবনে সেখানে আর যাওয়া হবে না। মাঝে মাঝে এসে আপনার কাছে দেশের কথা শুনে যাব, কেমন?
বিনয় বলল, নিশ্চয়ই।
অনেকটা সময় আপনাদের নষ্ট করে দিলাম। এবার উঠি পারমিতা সোজা সাব-এডিটরদের টেবলগুলোর দিকে চলে গেল।
বিনয়ও উঠে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল রমেনের ওপর। হিংসেয় লোকটার মুখ কালীবর্ণ হয়ে গেছে। বিনয়ের লেখা পাঠকের ভাল লেগেছে। কাগজের মালিক জগদীশ গুহঠাকুরতা, তার স্ত্রী এবং চিফ রিপোর্টার তারিফ করেছেন। আর পারমিতা তো সামনে বসে প্রশংসার ঢল নামিয়ে দিয়েছে। এসব সহ্য করতে পারছিল না রমেন। এই গুণকীর্তন তারই প্রাপ্য ছিল। জোর করে অন্যায়ভাবে যেন সেটা ছিনিয়ে নিয়েছে বিনয়।
কয়েক পলক রমেনের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়। দেখতে দেখতে সমস্ত অনুভূতি তিক্ততায় ভরে যায়। পরক্ষণে ভাবে, মন খারাপ করার মানে হয় না। পৃথিবীর সব মানুষই কি দেবদূত? আশেপাশে এদের নিয়েই তো থাকতে হবে। আগেও একদিন এমনটি ভেবেছিল সে। রমেনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রসাদকে খেয়ে আসি বলে হল-ঘরের দূর প্রান্তে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় সে। ।
রিকশায় করে সুকিয়া স্ট্রিটের দিকে যেতে যেতে আজকের দিনটার কথাই বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেই ভোর থেকে ঘটনার পর ঘটনা। সকালে খবরের কাগজে ছাপার হরফে নিজের নাম এবং দুদুটো লেখা দেখে মনে হচ্ছিল এক অলৌকিক স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছে গেছে। তারপর মদন বড়াল লেনে গিয়ে যখন শোনা গেল রামরতনের স্ত্রী মেয়েদের নিয়ে চলে গেছেন, কেউ যেন তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল অতল খাদে। আত্মগ্লানিতে নুয়ে পড়েছিল সে। পরে অফিসে এসে যখন জানা । গেল তার লেখার সুখ্যাতিতে ভরে গেছে দশ দিগন্ত, এমনকি পারমিতার মতো এক পরমাশ্চর্য তরুণী তার সামনে বসে মুগ্ধ হয়ে অঢেল প্রশংসা করছিল, বিনয়ের মনে হচ্ছিল, তার মতো সুখী মানুষ পৃথিবী নামে গ্রহটিতে আর একজনও নেই। কিন্তু তারই মধ্যে রমেনের মুখ দেখে মনে হয়েছে, লোকটা নিঃশব্দে তার গায়ে হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। একটা কথা না বলেও কীভাবে বিষ ঢালা যায়, রমেনকে না দেখলে সে জানতে পারত না।
একই দিনে কত রকমের ঘটনা, কত রকমের যে অনুভূতি।
.
কাগজ বেরুবার পর দিন দশেক কেটে গেল। এর মধ্যে বিনয়ের কলাম দুটো নিয়মিত ছাপ হচ্ছে। শরণার্থীদের ত্রাণশিবিরে এবং জবরদখল কলোনিতে রোজ প্রথম পাতায়, আর দেশভাগ: নানা ঘটনা, নানা মানুষ সপ্তাহে দুদিন–ভেতরে, ছয়ের পাতায়।
লেখা দুটো রীতিমতো সাড়া জাগিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষদের সমস্যা আর কোনও কাগজ এমন ব্যাপকভাবে তুলে ধরেনি। নতুন ভারত-এর প্রচার হু হু করে বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে উদ্বাস্তুদের মধ্যে।
বিনয়ের লেখাগুলো পড়ে পাঠকরা, যাদের বেশির ভাগই শরণার্থী, প্রচুর চিঠি লিখছে। দিনে দশ পনেরোটা করে। তাদের অপরিসীম দুঃখ, অফুরান দুর্দশার চিত্রটি দেশের মানুষের সামনে ফুটিয়ে তোলার জন্য এই ধ্বস্ত, দিশেহারা মানুষগুলোর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। খবরের কাগজে জায়গা কম, তবু সবিনয় নিবেদন নামে পাঠক-পাঠিকাদের চিঠিপত্রের যে বিভাগটি রয়েছে সেখানে প্রায় রোজই এইসব চিঠির দু-তিনটে করে ছাপা হয়।
আজকাল নাওয়া খাওয়ার সময় নেই বিনয়ের। এতদিন কলকাতার কাছাকাছি রিলিফ ক্যাম্প আর কলোনিগুলোতে যেত সে। এখন তিরিশ চল্লিশ মাইল দূরে দূরে চলে যাচ্ছে। কোথাও ট্রেনে, কোথাও বাসে। এমন অনেক দুর্গম এলাকায় কলোনি বসেছে সেখানে পৌঁছতে হলে ট্রেন বা বাস থেকে নেমে তিন-চার মাইল হাঁটতে হয়। সুধাদের বাড়ি থেকে ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে কলোনি টলোনি ঘুরে অফিসে যেতে যেতে কোনও কোনওদিন সন্ধে হয়ে যায়। তারপর দুদুটো লেখা তৈরি করে প্রসাদের কাছে জমা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাঝরাত।
আশ্চর্য, এত যে ঘোরাঘুরি, প্রতিদিন দিগ্বিদিকে অবিরাম ছোটাছুটি, তবু একটুও ক্লান্তি বোধ করে না বিনয়। অজস্র পাঠকের সুখ্যাতি তাকে উদ্দীপনায় ভরে রাখে। বিনয়ের মনে হয়, খবরের কাগজের কাজটা নিছক একটা চাকরি নয়। অন্য অফিসে কাজ করলেও মাসের শেষে কিছু টাকা মেলে। এখানেও পাওয়া যাবে। কিন্তু এটা পুরোপুরি আলাদা ধরনের কাজ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা সামাজিক দয়। যে মানুষগুলোর লেশমাত্র অপরাধ ছিল না, দেশটা দুটুকরো করে আচমকা একদিন তাদের সাতপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উপড়ে এনে ছুঁড়ে ফেলা হল চরম দুর্গতির মধ্যে। কলোনিতে, রিলিফ ক্যাম্পে, শিয়ালদা স্টেশনে, ত্রস্ত, বিহ্বল, ক্ষুধাকাতর পশুর মতো কোনওরকমে তারা টিকে আছে। ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাদের সম্বন্ধে কাগজে বিনয় যে লিখে চলেছে তা যেন বিরাট এক কর্তব্য পালন।
পূর্ব পাকিস্তান থেকেই শুধু নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ আর পাঞ্জাব থেকেও লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু সীমান্তের এপারে চলে এসেছে। তাদের ত্রাণ এবং পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে, খবরের কাগজ এবং সরকারি প্রেস নোট ঘেঁটে তার অনেক তথ্য টুকে রেখেছিল সে। আর পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্য কী করা হচ্ছে তা তো নিজের চোখেই দেখছে। পূর্ব এবং পশ্চিম, দেশের দুই প্রান্তের শরণার্থীদের পুনর্বাসন নিয়ে তুলনামূলক একটা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল বিনয়। নিয়মিত দুটো ফিচারের সঙ্গে সেটাও ছাপা হয়েছে। সেই লেখাটা এইরকমঃ
