সত্যিই বোঝেনি বিনয়। আস্তে মাথা নাড়ে সে।
ব্যাপারটা ভেরি সিম্পল। ওই লেখা এখন রেগুলার বেরুতে থাকবে। এডিটর আর নিউজ-এডিটরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। মিনিমাম ছমাস তো বটেই, রিফিউজি প্রবলেম প্রতিদিন যেভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তাতে ও দুটো এক দেড় বছরও চালাতে পারি। তুমি আমাকে যা দিয়েছ তাতে বড় জোর দিন সাত-আট চলবে। বলেছিলাম রোজ তোমাকে দুটো করে ফিচার দিতে হবে। সেটা আবার মনে করিয়ে দিলাম।
বিনয় চুপ করে থাকে।
প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, আজ কী হবে? কলোনি টলোনিতে তো যাওয়া হয়নি
বিনয় জানালো, যে লেখাগুলো প্রসাদের কাছে জমা রয়েছে তা বাদেও আরও বারো চোদ্দটা কলোনি এবং ত্রাণশিবির সম্পর্কে তার প্রচুর নোট নেওয়া আছে। আজই অফিসে বসে সেগুলো থেকে দুটো লেখা তৈরি করে ফেলতে পারবে।
প্রসাদ খুশি হলেন। ভেরি গুড়- তারপর হঠাৎ কিছু খেয়াল হতে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তখন বললে, সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছ। দুপুরে ভাতটাত খাওয়া হয়েছে?
লোকটার সব দিকে নজর। বিশেষ করে তার প্রতি কী যে বিপুল স্নেহ! পাকিস্তান থেকে চলে আসার পর একমাত্র ছোটদি ছাড়া তার খাওয়া দাওয়া সম্পর্কে এত খোঁজ টোজ অন্য কেউ নেয়নি। অভিভূত বিনয় আস্তে মাথা নাড়ে, না। পরে ক্যানটিন থেকে কিছু আনিয়ে খেয়ে নেব। আসলে রামরতনের স্ত্রী এবং তার তিন মেয়ের নিখোঁজ হয়ে যাবার খবরটা শোনার পর সে এমনই উতলা হয়ে ওঠে যে খিদে তেষ্টার বোধটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এখনও খাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই।
প্রসাদ বললেন, পরে টরে নয়। আমাদের ক্যানটিন এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। সুকিয়া স্ট্রিট চেনো?
চিনি। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
ওখানে জগন্মাতা ভোজনালয় রয়েছে। ওড়িয়াদের নাম-করা হোটেল। রান্নাবান্না খুব ভাল। এক্ষুনি একটা রিকশা করে সেখান থেকে খেয়ে এস।
প্রসাদের কথা অমান্য করা যায় না। বিনয় উঠে পড়েছিল। হঠাৎ তারাপদ ভৌমিকের কামরা থেকে বেরিয়ে সোজা রিপোর্টিং সেকশানে চলে এল পারমিতা। হাসিমুখে বলল, কিছুক্ষণ আগে প্রসাদদার কাছে আপনার খোঁজ করে গিয়েছিলাম। তখনও আপনি আসেননি। দাঁড়িয়ে কেন? বসুন
অগত্যা বসতে হল বিনয়কে। পারমিতা চেয়ার টেনে কাছাকাছি বসে পড়েছে।
ঝিনুক আর ঝুমাকে বাদ দিলে অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে মেলামেশার অভ্যাস নেই বিনয়ের। বিশেষ করে সে যদি পারমিতার মতো কোনও তরুণী হয়। মাত্র তিন-চার ফিট দুরে বসে আছে। জগদীশ গুহঠাকুরতার মেয়ে। তার নিঃশ্বাসের লঘু শব্দ কানে আসছে। ক্রমশ আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বিনয়। বুকের ভেতর ধকধকানি বেড়ে যাচ্ছে। মিনমিনে গলায় কোনওরকমে বলতে পারল, হা, প্রসাদদা আপনার কথা বলছিলেন। কিন্তু কেন তাকে পারমিতা খোঁজ করছে সেটা আর জিজ্ঞেস করে উঠতে পারল না।
পারমিতার মধ্যে বিন্দুমাত্র জড়তা নেই। আগাগোড়া সংকোচহীন। অনেকটা স্বচ্ছ ঝরনার মতো। তার চোখেমুখে, হাসিতে, কথাবার্তায় বা আচরণে এমন এক ধরনের উজ্জ্বলতা মাখানো যা চারপাশ ঝলমলে করে তোলে।
পারমিতা বলল, আমাদের কাগজে আপনার লেখা দুটো পড়েছি। ভীষণ ভাল লেগেছে। স্পেশালি দেশভাগ : নানা ঘটনা, নানা মানুষ –এই কলামে আফজল হোসেন নামে যে লোকটির কথা লিখেছেন সেটা কি সত্যি? বাস্তবে এমন কেউ কি আছে?
গুটিয়ে-থাকা ভাবটা কেটে যায় বিনয়ের। অদ্ভুত এক উদ্দীপনা তাকে যেন ধাক্কা মেরে জাগিয়ে তোলে। রীতিমতো জোর দিয়ে সে বলে, লোকটার নাম, ঠিকানা থেকে শুরু করে তার সম্বন্ধে যা যা বেরিয়েছে তার সবটাই সত্যি। একটা শব্দও বানানো নয়। খবরের কাগজে জায়গা কম। আমার লেখা অনেকটাই বাদ দিয়েছেন প্রসাদদা। পুরোটা ছাপা হলে বোঝা যেত মানুষটা কত বড় মাপের। একটু থেমে গম্ভীর গলায় বলতে লাগল, ওই মানুষটা রক্ষা না করলে আমাদের ইন্ডিয়ায় আসা হতো না। পথেই খুন হয়ে যেতাম।
বিনয়ের আবেগ খুব সম্ভব পারমিতার মধ্যেও চারিয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, হি ইজ আ গ্রেট সোল। এই ধরনের মানুষ যে পাকিস্তানে আছে, জানতাম না।
বিনয় বলল, আরও অনেক আফজল হোসেন আছে। লক্ষ লক্ষ রিফিউজি ইন্ডিয়ায় চলে এসেছে। রোজ দলে দলে কত যে আসছে। তবু এখনও প্রায় টোয়েন্টি পারসেন্টের মতো হিন্দু ওখানে থেকে গেছে। আফজল হোসেনরা পাশে না দাঁড়ালে অসংখ্য মানুষ খুন হতো, একজন হিন্দুও ওখানে থাকতে পারত না। ইস্ট পাকিস্তান টোটালি হিন্দুশূন্য হয়ে যেত।
পারমিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে। একটু চুপ করে থেকে বলে, মা-বাবাও আপনার লেখার প্রশংসা করছিলেন।
বিনয় লক্ষ করল, দ্বিতীয়বার তার লেখা সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত হল পারমিতা। সে জানায়, এ-ব্যাপারে তার এতটুকু কৃতিত্ব নেই। আফজল হোসেন এমন এক মহান চরিত্র, যেমন তেমন করে লিখলেই পাঠক মুগ্ধ হবে। তার মনে হবে, অবিশ্বাস্য কোনও কল্প-কাহিনি পড়ছে।
পারমিতা বলল, এই ধরনের মানুষের কথা আরও বেশি করে লিখুন–
প্রসাদদাও তাই বলেছেন।
একটু চুপ করে থেকে পারমিতা বলল, আপনার লেখাটা পড়ে জানতে পারলাম, আপনাদের বাড়ি ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে
হ্যাঁ।
আমাদের দেশও ইস্ট বেঙ্গলে। বরিশাল ডিস্ট্রিক্টে। গ্রামের নাম গাভা। আমার অ্যানসেস্টররা সেখানে থাকতেন। ফার্স্ট গ্রেট ওয়ারের পর নাইনটিন ফোরটিন কি ফিফটিনে বাবা আর মা কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তারপর আর কখনও গাভায় যাননি। ওঁদের মুখে ইডিলিক ইস্ট বেঙ্গলের কথা অনেক শুনেছি। সেটা নাকি স্বপ্নের দেশ। .
