সবাই মুখ-চেনা। অনেকের নামও জেনেছে বিনয়। ওরা কেউ কেউ হাত তুলে কিছু বলল, কেউ হেসে হেসে মাথা নাড়ল। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। বোকাটে একটু হেসে সে এগিয়ে গেল।
রিপোর্টিং সেকশানে প্রসাদ তার চেয়ারে বসে ছিলেন। টেবলের এধারে মণিলাল আর রমেন। সুধেন্দুকে দেখা যাচ্ছে না। খুব সম্ভব, এখনও অফিসে আসেনি।
প্রসাদ হাসিমুখে বললেন, আরে এস এস, বোসো। আজ এত তাড়াতাড়ি?
অন্য দিন কলোনি টলোনিতে ঘুরে অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে তিনটে চারটে বেজে যায়। মুখোমুখি বসতে বসতে বিনয় জানায়, আজ কোনও ত্রাণশিবির বা কলোনিতে যাওয়া হয়নি। তাই দুটোর ভেতরেই আসতে পেরেছে।
প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের কাগজ সম্বন্ধে কোথাও কিছু শুনেছ?
না। জরুরি কাজে সকালবেলা বেরিয়ে গিয়েছিলাম। বাইরের কারও মতামত শুনিনি। তবে দিদি জামাইবাবু আর দিদির দাদাশ্বশুরের ভাল লেগেছে।
কাল সারপ্রাইজের কথা বলেছিলাম। কাগজ খুলে সেটা আশা করি, দেখেছ
লাজুক মুখে বিনয় বলল, দেখেছি।
প্রসাদ বললেন, তোমার একটা লেখায় ছদ্মনাম দিয়েছি-দর্শক। একই দিনে একই রিপোর্টারের নাম দুজায়গায় ছাপা হবে, সেটা দৃষ্টিকটু। তোমার লেখা পড়ে দিদিরা কী বললেন?
বাড়ির লোকেরা প্রশংসা তো করবেই। বাইরের রিডার কী বলল সেটাই আসল।
শোন, কাগজের রেসপন্স খুব ভাল। তোমার দুটো লেখাই পাঠকদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এর মধ্যে কটা ফোনও এসেছে। তারা চাইছে কলম দুটো কোনওভাবেই যেন বন্ধ না হয়। রোজ মিনিমাম দুটো করে লেখা জমা দেবে।
প্রসাদ একটু চাপা ধরনের মানুষ। অন্তর্মুখী। আজ তাঁকে দস্তুরমতো উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছে।
সুধেন্দুও উদারভাবে বিনয়ের লেখার তারিফ করল। রমেন কিছু বলল না, ঠোঁট টিপে বসে রইল।
হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন প্রসাদ, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। পারমিতা তোমার খোঁজ করছিল।
বিনয় অবাক।–কোন পারমিতা?
আরে, নতুন ভারত-এর মালিক-কাম-এডিটরের মেয়ে। নামটা এর মধ্যে ভুলে গেছ!
বিনয়ের স্নায়ুমণ্ডলীতে মৃদু ঝংকারের মতো কিছু বয়ে গেল।
.
৫৩.
কাল ছিল নতুন ভারত পত্রিকার উদ্বোধনের অনুষ্ঠান। কালই প্রথম পারমিতাকে দেখেছিল বিনয়। মা-বাবার সঙ্গে বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে এসে যখন সে পত্রিকা অফিসের সামনে গাড়ি থেকে নেমেছে, সুধেন্দু তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। যথেষ্ট সুন্দরী। পোশাক, চলাফেরা, তাকানোর ভঙ্গি–তার সমস্ত কিছু থেকে স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের দ্যুতি যেন ছড়িয়ে পড়ছিল।
কাল আরও বারকয়েক পারমিতাকে দেখেছে বিনয়। দুপুরে খাওয়া দাওয়া মিটলে নিউজ-এডিটর তারপদ ভৌমিক তাকে সঙ্গে করে সারা অফিস ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। রিপোর্টিং সেকশানেও এসেছিল সে। কথায়বার্তায় চমৎকার। খুবই ভদ্র। . এক শ একাশি জন কর্মচারীর মধ্যে বিনয় একজন নগণ্য রিপোর্টার। পারমিতার সঙ্গে ভদ্রতাসূচক সামান্য দু-একটি কথা, নমস্কার প্রতি-নমস্কারের বেশি কিছু হয়নি। এত মানুষের ভিড়ে তাকে মনে করে রাখার কারণ নেই। অথচ নতুন ভারত-এর কর্ণধার এবং সম্পাদক জগদীশ গুহঠাকুরতার মেয়ে কিনা তারই খোঁজ করছে!
বিনয় প্রসাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। চমকটা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। তারপর জিজ্ঞেস করল, পারমিতা দেবী আমার খোঁজ করছেন কেন?
প্রসাদ বললেন, আমাকে কিছু বলেনি।
বিনয় লক্ষ করল, চিফ রিপোর্টারের ঠোঁটের খাঁজে চিকন একটি হাসির রেখা ফুটে উঠেই চকিতে মিলিয়ে গেল। মনে হল, প্রসাদ ব্যাপারটা জানেন কিন্তু নিজে জানাবেন না।
বিনয় বুঝতে পারছিল, উৎকণ্ঠার কারণ নেই। তবু কেমন যেন অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল। জিজ্ঞেস করল, আমার সঙ্গে তো তেমন আলাপ হয়নি। জাস্ট একটু পরিচয়। তবু আমার কথা শেষ না করে সে থেমে যায়।
প্রসাদ উত্তর দিলেন না। একটু আগে ঠোঁটে অতি মিহি হাসি দেখা দিয়েছিল। এবার তার চোখে কৌতুক চিকচিক করছে।
বিনয় বলে, আমি কি ওঁর সঙ্গে দেখা করব? সে ঘাড় ফিরিয়ে নিউজ ডিপার্টমেন্টের দিকে তাকাতে থাকে। আগেই শুনেছিল, আজ থেকে পারমিতা সাব-এডিটরদের সঙ্গে বসে কাজ শিখবে। কিন্তু বিশাল হল-ঘরের কোথাও তাকে দেখা গেল না।
বিনয়ের ছটফটানিটা আঁচ করতে পারছিলেন প্রসাদ। হালকা গলায় বললেন, এত নার্ভাস হচ্ছ কেন? পারমিতা এখন নিউজ-এডিটরের ঘরে আছে। আমাকে বলে গেছে, পরে এসে তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
একটু চুপচাপ।
তারপর প্রসাদ বললেন, এবার কাজের কথায় আসা যাক। আজ তো বললে কোনও রিফিউজি কলোনি কি রিলিফ ক্যাম্পে যেতে পারনি। কেন?
ভেতরে ভেতরে থমকে যায় বিনয়। ক্যাম্প ট্যাম্পে • যাওয়ার জন্য প্রসাদ কি অসন্তুষ্ট হয়েছেন? তাই কি ফের এই প্রসঙ্গ তুললেন? রামরতনের স্ত্রী এ মেয়েদের কথা একটু আগে জানানো সম্ভব হয়নি। এখনও বলা গেল না। অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট ফেলে অনাত্মীয়, অল্প-চেনা, অসহায় চার রমণীর জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠায় অফিসের কাজ ফেলে সকালে উঠে সে শ্যামবাজারে ছুটে গিয়েছিল, এ-সব শুনলে নিশ্চয়ই খুশি হবেন না প্রসাদ। বিনয় কাঁচুমাচু মুখে বলল, আপনাকে তো বলেছি, একটা পারিবারিক কাজ, মানে–
পারিবারিক সমস্যা-টমস্যা থাকতেই পারে– হাত তুলে বিনয়কে থামিয়ে দিতে দিতে প্রসাদ বললেন, কিন্তু এদিকটাও তো ভীষণ আর্জেন্ট। তোমার দুটো ফিচার ছাপা শুরু হয়েছে। প্রথম দিনই বহু রিডারের নজরে পড়ে গেছ। তার মানে তুমি বাঘের পিঠে চড়ে বসলে। আমার কথা কিছু বুঝলে?
