বিমলের জন্য ভীষণ কষ্ট হয় বিনয়ের। একদিকে চরম স্বার্থপর রণচণ্ডী স্ত্রী, আর-এক দিকে জেঠিমা আর জেঠতুতো বোনেদের প্রতি কর্তব্যপালন–দুইয়ের মাঝখানে পড়ে শান্ত, নির্বিরোধ মানুষটা একেবারে চুরমার হয়ে গেছে।
হঠাৎ অন্য একটা চিন্তা মাথায় ঢুকে যায় বিনয়ের। তার ধারণা, রামরতনের স্ত্রী এবং তার মেয়েদের সন্ধান পাওয়া যাবে না। তবু ধরা যাক, পাওয়া গেল। নিজের কাছে ফের যদি বিমল তাঁদের নিয়ে তোলে, এবার কি সংসারে সুখ শান্তির ঢেউ খেলতে থাকবে? রাতারাতি হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটে যাবে দীপ্তির? কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে এবার জেঠশাশুড়ি আর তার মেয়েদের মাথায় করে রাখবে?
একসময় দুজনে থানায় পৌঁছে যায়।
কলকাতার অন্য সব থানার মতো এটারও অবিকল একই চেহারা। থমথমে, ভীতিকর। ব্রিটিশ আমলে তৈরি লাল রঙের ইমারত, চওড়া চওড়া দেওয়াল, চারদিকে উর্দি-পরা কনস্টেবলদের ছড়াছড়ি।
ওসির সঙ্গে দেখা করে বিনয়রা রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের ঘটনাটা জানালো। একজন রাইটার-জমাদারকে ডাকিয়ে পুরো কেসটা লিখিয়ে নিলেন ওসি। দিবাকর পালিতের মতোই ভরসা দিয়ে বললেন, পুলিশের তরফ থেকে চেষ্টার ত্রুটি হবে না। বিমল যেন মাঝে মাঝে এসে খোঁজ নিয়ে যায়। বৃদ্ধা এবং তার মেয়েদের খবর পাওয়া গেলে থানা থেকেও তার বাসায় যোগাযোগ করা হবে।
থানা থেকে যখন ওরা বেরুল, সূর্য খাড়া মাথার ওপর উঠে এসেছে। রোদের তেজ আরও একটু বেড়েছে। অনেকটা হেঁটে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে এসে পড়ে দুজনে।
বিমল বলল, বিনয়বাবু, আপনি আমার দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলেছিলেন, আপনার দিদির কাছে থাকেন। সেখানকার ঠিকানা জানি না। হঠাৎ দরকার হলে যে চলে যাব তার উপায় নেই। ঠিকানাটা যদি দেন।
বিনয় বলে, বেশিদিন দিদির বাড়িতে থাকছি না। একটা মেস ঠিক করেছি। যত তাড়াতাড়ি পারি সেখানে গিয়ে উঠব। কিছুদিন হল আমি একটা নতুন চাকরিতে ঢুকেছি। সেখানকার ঠিকানাটা রাখুন–কাঁধের ঝোলা থেকে প্যাড আর কলম বার করে নতুন ভারত-এর ঠিকানা লিখে দিল।
কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বুলোতে বুলোতে সামান্য উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে বিমল, আপনি খবরের কাগজে কাজ পেয়েছেন!
চাকরির কথাটা জেঠিমার কাছে শুনেছিলাম। আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়। হ্যাঁ, মাসীমাকে বলেছি।
বিমল বলতে লাগল, নিউজপেপারের তো অনেক ক্ষমতা। দেখবেন সেদিক থেকে জেঠিমাদের ব্যাপারে যদি কিছু করা যায়–
দেখব।
একটু নীরবতা।
তারপর বিমল বলল, রিপোর্টারির কাজে আপনাকে তো নানা জায়গায় ঘুরতে হয়। একটু লক্ষ রাখবেন। যদি ছায়া-মায়াদের দেখতে পান, সোজা আমার বাসায় নিয়ে আসবেন।
এতদিন ছিল ঝিনুক। এবার অনুসন্ধানের তালিকায় আরও চার রমণীর নাম যোগ হল। বিনয় বলল, আসব।
মদন বড়াল লেনের মুখে এসে বিমল বিদায় নিয়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ে।
এই ভরদুপুরে শহর গমগম করছে। অফিস টাইমের মতো না হলেও বাস ট্রামে এখনও বেশ ভিড়। কোনও গাড়িতেই সিট ফাঁকা নেই। তবু দাঁড়াবার মতো জায়গা আছে। বিনয় কিন্তু বাস ট্রামে ওঠার আগ্রহ বোধ করল না। ফুটপাথ ধরে সোজা হাঁটতে লাগল।
আজ মদন বড়াল লেনে এসে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের খবরটা শুনে বিনয় এমনই হতচকিত হয়ে গিয়েছিল যে অন্য কোনও দিকে খেয়াল ছিল না। প্রবল ধাক্কাটা এখন খানিকটা সামলে নিয়েছে। সে। হাঁটতে হাঁটতে তার খেয়াল হল, পকেটে তিন হাজার টাকার সেই খামটা রয়েছে। সেই বিমলদের বাসায় এল। দুটো দিন আগে, এমনকি কাল সকালেও যদি আসত, এমন মারাত্মক একটা বিপর্যয় ঘটত না। চারটি মানুষের একটু ভদ্রভাবে, সসম্মানে বেঁচে থাকার দায় সে তো স্বেচ্ছায় নিজের হাতেই তুলে নিয়েছিল। আগেই মদন বড়াল লেনে আসাটা কত জরুরি যে ছিল! আসা হয়নি, সেটা তারই ত্রুটি। তারই অন্যায়। আত্মগ্লানি বিনয়কে পিষতে থাকে।
মনটা ভীষণ উতলা। লক্ষ্যহীনের মতো হেঁটেই চলল বিনয়। সকালবেলায় প্রচুর লুচি টুচি খাইয়ে দিয়েছিল সুধা। এতক্ষণে সেগুলো হজম হয়ে যাবার কথা। কিন্তু খিদেতেষ্টার বোধটাই যেন নেই। বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিংয়ে এসে ডান দিকে ঘুরে তার অফিসে যাবার কথা। আনমনা হাঁটতে হাঁটতে কখন ক্রসিংটা পেরিয়ে কলেজ স্ট্রিটে চলে এসেছিল, খেয়াল ছিল না।
হাতঘড়িটা দেখে নিল বিনয়। সেকেণ্ড শিফট শুরু হতে এখনও দেরি আছে। অবশ্য তার হাজিরা নিয়ে কড়াকড়ি নেই। কিন্তু আজ যখন কলোনি বা ত্রাণশিবিরে যাওয়া হয়নি তখন দুটোর মধ্যেই অফিসে যাবে।
অনেকখানি হাঁটাহাঁটি হয়েছে। ক্লান্তি লাগছিল। রাস্তা পেরিয়ে ওধারে গিয়ে ট্রাম ধরল বিনয়। ওটা শ্যামবাজার রুটের।
.
অফিসে পৌঁছে দেখা গেল, গোটা তিনতলা বাড়িটা সরগরম। আজই নতুন ভারত প্রথম বাজারে বেরিয়েছে। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে টুকরো টুকরো কথা কানে আসছিল বিনয়ের। নানা ডিপার্টমেন্টের এমপ্লয়ীরা আজকের কাগজ নিয়ে কথা বলছে। সবাই বেশ খুশি। প্রথম দিনই নাকি নতুন ভারত সাধারণ পাঠকের নজরে পড়েছে।
উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি নিউজ ডিপার্টমেন্টে। রীতিমতো হইচই চলছে।
সাব-এডিটর প্রুফ-রিডারদের টেবলের ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে রিপোর্টিং সেকশানে যেতে হয়। অন্য দিনের মতো আজও যাচ্ছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল সাব-এডিটররা উৎসুক চোখে তাকে লক্ষ করছে। সবার মধ্যে কেমন একটা সমীহ ভাব। তিন সপ্তাহ সে অফিসে যাচ্ছে, আসছে। পূর্ব পাকিস্তানের এক নগণ্য শহরের আকাট গেঁয়োমার্কা একটা যুবককে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি। এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছে তারা। চাউনিতে কেমন যেন অবজ্ঞার ভাব মেশানো থাকত। তাদের চোখমুখের চেহারা আজ পুরোপুরি পালটে গেছে।
