হঠাৎ চলে গেল কেন? কী হয়েছিল?
বিমল উত্তর দিল না। কাঁদছে ঠিকই, তবে এখন আর শব্দটা নেই। মুহ্যমানের মত সে বসে থাকে।
মনের এই অবস্থায়, যখন বিমল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, তাড়া দেওয়া ঠিক হবে না। পার্কে যখন টেনে নিয়ে এসেছে একসময় না একসময় সে বলবেই। বিনয় অপেক্ষা করতে থাকে।
অনেকক্ষণ পর কোঁচার খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে ধরা ধরা গলায় বিমল বলল, আমাদের ফ্যামিলি সম্বন্ধে আপনি কি কিছু শুনেছেন?
বিমল ঠিক কী বলতে চাইছে, ধরতে না পেরে বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী শুনব?
বলতে মাথা কাটা যাচ্ছে, কিন্তু আপনাকে আমাদের আত্মীয়ের মতো মনে করি। জেঠামশাইয়ের ডেড বডি যেভাবে নিয়ে এসেছিলেন, জীবনে ভুলব না। তাই
বিমলকে থামিয়ে দিয়ে বিনয় বলে, ও-সব থাক। আপনার জেঠিমাদের কথা বলুন
বিমল বলল, জেঠিমারা আমাদের কাছে থাকুন, আমার স্ত্রী দীপ্তি একেবারেই চায় না। এই নিয়ে রোজ অশান্তি আর ঝগড়া। জেঠিমা কি এ-কথা আপনাকে জানিয়েছেন?
বিনয় ভীষণ বিব্রত বোধ করে। সেদিন যখন সে মদন বড়াল লেনে আসে, বিমল বাসায় ছিল না। রেশন তুলতে বাজার করতে বেরিয়ে গিয়েছিল। স্ত্রী দীপ্তি ছেলেমেয়ে নিয়ে তার আগে থেকেই বাপের বাড়িতে। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিলেন রামরতনের স্ত্রী। কী অশেষ লাঞ্ছনা আর গ্লানির মধ্যে তাদের দিন কাটছে, সব বিশদভাবে বলেছিলেন বিনয়কে।
অন্য সময় হলে স্বীকার করত না বিনয়। যদিও অস্বস্তি হচ্ছিল, তবু মুখ নিচু করে বলল, হ্যাঁ, জানিয়েছেন।
বিমর্ষ সুরে বিমল বলল, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন, আমার স্ত্রী ঝগড়া করে ওর বাপের বাড়ি গিয়েছিল। শাসিয়েছিল, যতদিন জেঠিমারা এ-বাসায় থাকবে, সে ফিরবে না। কিন্তু হঠাৎ কাল এসে হাজির। আমি তখন অফিসে। ছুটির পর ফিরে অন্য ভাড়াটেদের মুখে শুনলাম, দীপ্তি, নোংরা ভাষায় এমন অপমান করেছিল যে জেঠিমা মেয়েদের নিয়ে তক্ষুনি বেরিয়ে গেছেন।
বিনয়ের দমবন্ধ হয়ে আসছিল। ঢাকা জেলার এক নগণ্য গ্রাম জামতলির বাইরে কখনও কোথাও যাননি রামরতনের স্ত্রী এবং তার মেয়েরা। গেলেও আশেপাশের কোনও গাঁয়ে, কিংবা চল্লিশ পঞ্চাশ মাইলের ভেতর কোনও কুটুমবাড়িতে। দেশভাগ না হলে সীমান্তের এপারে তাদের কোনও দিনই আসা হতো না। এই বিপুল, অচেনা মহানগরে এক অসহায় বৃদ্ধা তার পূর্ণ যুবতী দুই মেয়ে এবং আধবয়সী এক বিধবা মেয়েকে নিয়ে কোথায় যেতে পারেন? রুদ্ধশ্বাসে বিনয় জিজ্ঞেস করে, ওঁদের খোঁজ করেছিলেন?
বিমল জানায়, তাদের বাড়ির অন্য ভাড়াটেদের নিয়ে উত্তর কলকাতার বড় রাস্তা, অগুনতি অলিগলি, পার্ক–নানা জায়গায় সারারাত খুঁজে বেড়িয়েছে। অনন্ত হতাশায় মাথা ঝাঁকাতে আঁকাতে ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, কোথাও পাওয়া গেল না। কী যে করব, ভেবে পাচ্ছি না।
কলকাতায় আপনাদের কোনও আত্মীয়স্বজন আছেন? তাঁদের কাছে যেতে পারেন কি?
না। মাথা নাড়ে বিমল। কান্নায় তার স্বর জড়িয়ে যেতে থাকে, আমার এক দূর সম্পর্কের পিসি থাকে জলপাইগুড়িতে।-এক কাকা, আমার বাবার মাসতুতো ভাই, থাকে আসানসোলে। জেঠিমাদের পক্ষে সেখানে যাওয়া অসম্ভব। এদিকের কিছুই তো চেনেন না।
চকিতে সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। হেমন্তের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে প্রায় এইভাবেই ঝিনুক, চিরদুঃখী সেই মেয়েটা কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিল! আজ অবধি তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। যারা স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়, তাদের হদিস কি কখনও পাওয়া যায়?
বিমল জানায়, কাল সমস্ত রাত তারা উত্তর কলকাতায় খোঁজাখুঁজি করেছে, আজ ঘুরে ঘুরে দেখবে মধ্য কলকাতায়। তারপর অফিসে ছুটি নিয়ে শহরের অন্য সব এলাকায়।
বিমলের সারা মুখ চোখের জলে মাখামাখি। সে ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করে, জেঠিমাদের ঠিক পেয়ে যাব, কী বলেন? প্রশ্নটা এমনভাবে করল যাতে মনে হয়, খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে সে নিজেই যথেষ্ট সন্দিহান। বিনয় তাকে ভরসা দিক, এটাই হয়তো চাইছে।
বিনয় বলল, এত বড় সিটি। লক্ষ লক্ষ মানুষ। কদিন ছুটি নিয়ে আপনি খুঁজবেন?
নিমেষে হতাশার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায় বিমল, তাহলে কী করতে বলেন?
থানায় খবর দিন। পারলে পুলিশই পারবে। বলেই বিনয়ের খেয়াল হয়, ঝিনুক যেদিন নিখোঁজ। হয় সেই দিনই অবনীমোহন তাকে থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ওসি দিবাকর পালিত মানুষটি যথেষ্ট সহৃদয়। তাঁদের চেষ্টায় লেশমাত্র ত্রুটি হয়নি। এখনও তাঁরা খুঁজে চলেছেন। কিন্তু পাওয়া কি গেছে ঝিনুককে?
থানার চিন্তাটা বিমলের মাথায় আগে আসেনি। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, ওখানে গেলে কাজ হবে বলছেন?
জোর দিয়ে কিছু বলছি না। তবে থানায় জানিয়ে রাখা উচিত।
ঠিকই বলেছেন। আমার খেয়াল হয়নি। আপনার কি এখন একটু সময় হবে বিনয়বাবু?
কেন বলুন তো?
যদি দয়া করে আমার সঙ্গে থানায় যান। মানে- বলতে বলতে থেমে যায় বিমল।
বিমল নিরীহ, সাদাসিধে, ভালমানুষ। আচমকা মারাত্মক এক সংকটে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিমলের দিকে তাকিয়ে মায়াই হয় বিনয়ের। অফিসে তার সেকেণ্ড শিফট চলছে। দুটোয় হাজিরা। এখন এগারোটাও বাজেনি। হাতে অঢেল সময়। বলল, ঠিক আছে, চলুন–।
পার্ক থেকে বেরিয়ে ফের বড় রাস্তায়। বিমল এই এলাকার থানাটা চেনে। সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে সে বলতে থাকে, মা-বাবাকে সেই কোন ছেলেবেলায় হারিয়েছি। তারপর জেঠিমা আর জেঠামশাইই ছিলেন আমার সব। তারা না দেখলে হয় না খেয়ে মরে যেতাম নইলে উচ্ছন্নে যাবার রাস্তা খোলাই ছিল। দীপ্তিকে কত করে বুঝিয়েছি, জেঠিমা আমার কাছে মায়ের থেকেও বেশি। কিন্তু কোনও কথা কানে তোলেনি। দেশভাগ না হলে-কথাটা শেষ করতে পারে না সে। বুকের ভেতর থেকে উথলে আসা কান্নায় গলা বুজে যায়।
