.
জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিল বিনয়। বেলা আর-একটু বেড়েছে, বোদ আর-একটু তপ্ত হয়েছে। কিন্তু এখনও ট্রাম বাসে অফিস টাইমের ভিড় শুরু হয়নি। কটা আর বাজে? বড় জোর সাড়ে আটটা।
ট্রামে জানালার ধারে বসে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের কথা ভাবছিল বিনয়। টাকা দিলেই চলবে না, ওদের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভদ্রপাড়ায় একটা বাসাও ঠিক করে দিতে হবে। অবশ্য মুকুন্দপুর কলোনিতে খানিকটা জমির ব্যবস্থা করে রেখেছে সে। যুগলদের ওখানে গেলে নিরাপদে থাকতে পারবে ওরা। এখন দেখা যাক, কোথায় থাকতে চায়-কলকাতাতেই, না মুকুন্দপুরে?
ধর্মতলায় ট্রাম পালটে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মদন বড়াল লেনে বিমল গাঙ্গুলিদের ভাড়াটে বাড়ির সামনে চলে এল বিনয়। এক হিসেবে ভালই হয়েছে। এই সময়টা বিমল নিশ্চয়ই বাড়িতে নেই, অফিসে চলে গেছে। তার স্ত্রী দীপ্তি ধনুর্ভাঙা পণ করেছে, যতদিন রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েরা এ-বাসায় থাকবে, সে বাপের বাড়ি থেকে ফিরবে না। বিমল বা দীপ্তি বাড়িতে থাকলে তাদের সামনে রামরতনের স্ত্রীকে টাকাটা দিতে অসুবিধা হতো। তারা খুশি হয়ে এটা মেনে নিত না।
সদর দরজাটা হাট করে খোলা। ভিতরের মস্ত চাতালে গঙ্গাজল আর খাবার জলের কলের সামনে গিন্নিবান্নি জাতীয় মেয়েমানুষের ভিড়।
বিমল বাড়িতে নেই আন্দাজ করেও তাকেই ডাকতে লাগল বিনয়, বিমলবাবু, বিমলবাবু
কিন্তু বিনয়ের অঙ্কে গোলমাল হয়ে গেল। ছায়া মায়া বা বাসন্তী নয়, বিমল নিজেই সদর দরজায় এসে দাঁড়াল। তার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে বিনয়। শুকনো, শীর্ণ মুখ, চোখের কোলে কালি, গালে খাড়া খাড়া দাড়ি, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ দুটো রক্তের ডেলা। বোঝা যায়, সারারাত ঘুমোয়নি। রুদ্ধস্বরে বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে?
ভাঙা গলায় বিমল বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে বিনয়বাবু।
এই কদিনে কী এমন অঘটন ঘটতে পারে, ভেবে পেল না বিনয়। বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকে সে। বিমল রাস্তায় বেরিয়ে আসে। বলে, চলুন, কোথাও গিয়ে বসি। তারপর সব শুনবেন।
এর আগে মাত্র দুবার বিমলকে দেখেছে বিনয়। একবার শিয়ালদা স্টেশনে, যখন সীমান্তের ওপার থেকে রামরতন গাঙ্গুলির মৃতদেহ এবং তাঁর অসহায় পরিবারটিকে নিয়ে এসেছিল। পরের বার দেখা এই ভাড়া বাড়িতে। পরিচয় খুবই সামান্য। তবু অনাত্মীয়, প্রায়-অচেনা বিনয়কে পারিবারিক বন্ধুই ভাবে বিমল।
বিনয় জানে, অভাব অশান্তি চারদিক থেকে ঠেসে ধরেছে বিমলকে। তবু সেদিন সে মদন বড়াল লেনে আসায় খুশি হয়েছিল বিমল। কথায় বার্তায় যথেষ্ট বিনয়ী। অমায়িক ব্যবহার। কিন্তু সেই বিমল আজ তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিল না। বিনয় যতটা অপমানিত বোধ করল, অবাক হল তার শতগুণ। বিমলকে সে যতটুকু দেখেছে বা বুঝেছে তাতে এই ধরনের আচরণ খুবই অস্বাভাবিক। বিমলের ভাঙাচোরা, বিধ্বস্ত চেহারা দেখে শুধু এটাই মনে হচ্ছে, তার ওপর দিয়ে তুমুল ঝড় বয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই তীব্র উৎকণ্ঠায় বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠতে থাকে বিনয়ের।
মদন বড়াল লেনের ভিড়, কলরোল, রিকশা, ঠেলা, সাইকেল, সেকেলে দুচারটে মোটর, এ-সবের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে বিনয়কে নিয়ে একসময় বিমল ট্রাম রাস্তায় চলে এল। তারপর রাস্তা পেরিয়ে ওধারে গলিতে ঢুকে একটা মাঝারি পার্কে।
এই বেলা দশটায় পার্কটা মোটামুটি নির্জন। ভ্রমণকারীরা আসে সকালে আর বিকেলে। কটা অথর্ব বুড়ো, জীবন থেকে যারা প্রায় বাতিল, একধারে বসে রোদ থেকে শরীরে তাপ শুষে নিচ্ছে। এক পাল বেওয়ারিশ কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে আর-এক কোণে। তিন চারটে কাক ওদের ঘিরে ডিঙি মেরে মেরে টহল দিয়ে চলেছে। বিমলরা একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসল। এতটা পথ পাশাপাশি হেঁটে এসেছে, কিন্তু কেউ একটি কথাও বলেনি। বিনয় তার সঙ্গীকে লক্ষ করছিল। ভেতর থেকে সব ভেঙেচুরে, তছনছ করে কিছু একটা ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর ঠোঁট শক্ত করে টিপে রেখে সেটা ঠেকাতে চাইছে বিমল। গলার কাছের শিরাগুলো দড়ির মতো পাকিয়ে উঠেছে। চোখ যেন ফেটে পড়বে।
হতবুদ্ধি বিনয় তাকিয়েই থাকে।
শেষ অবধি আর যুঝতে পারল না বিমল। আচমকা শব্দ করে কেঁদে ওঠে সে। শেল বিধলে যেমন হয়, তেমনি অসহ্য কষ্টে, তীব্র যন্ত্রণায় তার মুখ দুমড়ে মুচড়ে বেঁকেচুরে যেতে লাগল। রক্তবর্ণ চোখ থেকে জল ঝরে পড়ছে অঝোরে।
বিহ্বল ভাবটা খানিক কাটিয়ে নিয়ে বিমলের কাঁধে একটা হাত রাখে বিনয়। আর্দ্র, নরম গলায় বলে, কাঁদবেন না বিমলবাবু, কাঁদবেন না। শান্ত হোন
কান্না থামে না। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে অবুঝ বালকের মতো কেঁদেই চলে বিমল, কেঁদেই চলে। সে যে কী নিদারুণ আকুলতা। বিকৃত, জড়ানো গলায় বলতে থাকে, জেঠিমারা নেই।
ব্যাপারটা প্রথমে মাথায় ঢোকে না বিনয়ের। জটিল ধাঁধার মতো দুর্বোধ্য ঠেকে। ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, কী বলছেন?
কাল জেঠিমা বাসন্তীদিদি ছায়া মায়া, সবাই আমাদের বাসা থেকে চলে গেছে
অদ্ভুত একটা কাঁপুনি বিনয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আমূল ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। হৃৎপিণ্ডের উত্থান পতন থমকে গেছে। ব্যাকুলভাবে সে জিজ্ঞেস করে, কোথায় গেছে?
জানি না, জানি না, জানি না বিমলের কান্না আরও উতরোল হয়ে ওঠে।
