বিনয় কল্পনাও করেনি, নতুন ভারত-এর প্রথম দিনের এডিশনে তার দুদুটো লেখা বেরিয়ে যাবে। সারপ্রাইজ, সত্যিই সারপ্রাইজ।
এমন একটা পরমাশ্চর্য দিন কি তার জীবনে কখনও এসেছিল? কলকাতায় আসার পর তো নয়ই। রাজদিয়ায় এলেও আসতে পারে। মনে পড়ল না।
হঠাৎ বিনয়ের মনে হল, তার দুই কাঁধে কেউ যেন দুটো ডানা জুড়ে দিয়েছে আর পৃথিবী থেকে, অনেক উঁচুতে কোনও অলৌকিক বায়ুস্তরে সে ভেসে বেড়াচ্ছে।
একসময় খেয়াল হল, কুয়াশা পুরোপুরি কেটে গেছে। শীতের ঠাণ্ডা, নিস্তেজ রোদ ঝরে পড়ছে মহানগরীর ওপর। কিচেনের দিক থেকে ঠুং ঠাং আওয়াজ আসছে। হিরণ, সুধা আর দ্বারিক দত্তর গলা শোনা যাচ্ছে। নতুন ভারত এবং নিজের দুটো লেখা নিয়ে বিনয় এমনই মগ্ন ছিল, কখন সবার ঘুম ভেঙেছে, টের পায়নি। গলার স্বর অনেক উঁচুতে তুলে প্রায় চিৎকার করতে করতে ভেতর দিকে ছুটল সে, ছোটদি, হিরণদা, দ্বারিক দাদু।
রোজই সকালে বাইরের ঘরে প্রভাতী চায়ের আসর বসে। সোজা সেখানে চলে এল বিনয়।
সুধা জিজ্ঞেস করল, কি রে, চেঁচাচ্ছিস কেন?
বিনয় বলে, এই দ্যাখ, আমাদের কাগজ বেরিয়ে গেছে। অফিসের পিওন কিছুক্ষণ আগে দিয়ে গেল।
নতুন ভারত যে আজই বাজারে ছাড়া হবে, এ-বাড়ির সবাই তা জানে। সুধারা অনন্ত আগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়ন, দেখি, দেখি
সুধা কাগজটা ছোঁওয়ার আগেই ছোঁ মেরে সেটা টেনে নিল হিরণ। সুধা আর দ্বারিক দত্ত তার দুপাশ থেকে ঝুঁকে দেখতে লাগলেন। তিনজনই টুকরো টুকরো মন্তব্য করতে থাকে।
ছাপা টাপা ভারী সুন্দর
বেশ দেখনদার কাগজ হয়েছে।
বেশির ভাগ পত্রিকায় বিড়া ধাবড়া সব ছবি বেরোয়। কে জওহরলাল, কে সুচেতা কৃপালনী, কে শ্যামাপ্রসাদ আর কে শেখ আবদুল্লা, বুঝবার জো নেই। সব কালিতে ল্যাবড়ানো। নতুন ভারত-এ সবাইকে আলাদা আলাদা চেনা যাচ্ছে।
কাগজের চেহারা দেখে সকলেরই পছন্দ হয়েছে। বিনয় একধারে দাঁড়িয়ে ছিল। লাজুক মুখে বলল, আজ আমার দুটো লেখা বেরিয়েছে–
সুধা প্রায় লাফিয়ে ওঠে, কোথায় রে, কোথায়?
হিরণ প্রচণ্ড উৎসাহে বলে, আগে বলবে তো
বিনয় লেখা দুটো দেখিয়ে দেয়। কে প্রথমে পড়বে, তাই নিয়ে সুধা আর হিরণের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। দ্বারিক দত্তর চিরকালই নাত-বউয়ের প্রতি পক্ষপাত। বললেন, সুধা জোরে জোরে পড়ুক। আমরা শুনি।
পড়া শেষ হলে শতমুখে প্রশংসা করলেন দ্বারিক দত্ত, এমন লেখাই এখন চাই। ইস্ট বেঙ্গলের রিফিউজিরা কী দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, দেশের লোকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো দরকার। বিনু, এইরকম লিখতে পারলে তুই খুব নাম করবি।
হিরণও দ্বারিক দত্তর সঙ্গে একমত। সুধা রীতিমতো উচ্ছ্বসিত।
খুব ভাল লাগছিল বিনয়ের। অন্যের মুখে সুখ্যাতি শুনলে কে না খুশি হয়। কিন্তু হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, আজ সকালে সোদপুরে একটা নতুন জবরদখল কলোনিতে যাবার কথা। সে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এখনও তার মুখ ধোওয়া হয়নি, চান করা হয়নি। সুধাকে বলে, ছোটদি, আমি বাথরুমে যাচ্ছি। আটটায় বেরুব।
আজকাল সকাল হলেই চানটান সেরে বেরিয়ে পড়ে বিনয়। কলকাতার আশেপাশের কোও উদ্বাস্তু কলোনি বা ত্রাণশিবিরে চলে যায়। এক-এক দিন এক-এক জায়গায়। দুপুরে বাড়ি আসে না। ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে নটা দশটা। এত খাটুনি। দুপুরে হোটেলে কী ছাতমাথা খায়, সে-ই জানে। তাই ভোর ভোর উঠে উমাকে দিয়ে, কখনও বা নিজের হাতে ভাইয়ের জন্য প্রচুর জলখাবার তৈরি করে সুধা। ঠিকমতো না খেলে খাটবে কী করে? দুদিনেই স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে।
সুধা বলল, উমা লুচি ভাজছে। তুই চান করে নে।
বিনয় আর দাঁড়াল না। চানঘরের দিকে চলে গেল। চান সেরে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে কাঠের আলমারি থেকে ইস্তিরি-করা জামাকাপড় বার করতে করতে একটা লম্বা ব্রাউন রঙের খামের ওপর নজর পড়ল তার।
ভবানীপুরের বাড়ি বিক্রি করে অবনীমোহনের ঋণশোধ হয়েও যা বেঁচেছিল তার একটা অংশ পেয়েছিল বিনয়। সে ঠিকই করে রেখেছে টাকাটা রামরতনের স্ত্রীকে ও তার মেয়েদের দিয়ে আসবে। একবারে নয়, ভাগে ভাগে। সেই মতো দিনকয়েক আগে হিরণকে দিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে তিন হাজার তুলিয়ে নিয়েছিল। ব্রাউন খামে সেই টাকাটা আছে।
টাকাটা তোলার সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে আসা উচিত ছিল। কিন্তু উদ্বাস্তুদের ত্রাণশিবির আর জবরদখল কলোনিতে ছোটাছুটি, ঝিনুকের খোঁজ, নতুন ভারত প্রকাশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বিধানচন্দ্র রায়-সব মিলিয়ে এমন তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে সকাল থেকে মাঝরাত অবধি কেটে গেছে যে এতটুকু সময় বার করা যায়নি। অথচ চারটি রমণী তার ওপর ভরসা করে আছে। টাকাটা না দিয়ে আসায় মারাত্মক অন্যায় হয়ে গেছে। প্রচণ্ড অপরাধবোধে নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যায় বিনয়। সে মনস্থির করে ফেলে, আজ আর সোদপুরের কলোনিতে যাবে না। সোজা শ্যামবাজারে গিয়ে রামরতনের স্ত্রীর হাতে টাকাটা দিয়ে আসবে।
বিনয়ের জীবনে আজকের দিনটা এক অলৌকিক উপহারের মতো। নতুন ভারত বাজারে বেরিয়েছে। সে তো জানাই ছিল। কিন্তু তার দুদুটো লেখা প্রথম দিনই ছাপা হয়েছে। এটা ভাবা যায়নি। কোনও আশ্চর্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায় পৃথিবীর চেহারাটাই যেন বদলে গেছে।
ভালই হল, রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আজকের দিনটা বেছে নিয়েছে সে। টাকাটা হাতে পেলে ওদের চোখেমুখে কী ফুটে উঠবে? স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা, না অন্য কিছু? যা-ই ফুটুক, চারটি রমণীকে দুঃসহ গ্লানি থেকে মুক্ত করতে পারলে ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখার চেয়ে আনন্দ কি এক তিলও কম হবে?
