কিন্তু এইসব খবর তো আজকের অন্য কাগজগুলোতেও থাকবে। তাহলে প্রসাদের সারপ্রাইজটা কোথায়? অবশ্য নতুন ভারত আট পাতার কাগজ। চমকটা অন্য পৃষ্ঠাতেও থাকতে পারে।
বিনয় পাতা ওলটাতে যাবে, আচমকা নিচের দিকে নজর আটকে গেল। তিন কলম জুড়ে ইঞ্চি খানেক চওড়া রিভার্সে একটা লেখা সেখানে ছাপা হয়েছে। প্রথমে কালোর ওপর সাদা হরফে শিরোনাম : শরণার্থীদের ত্রাণশিবিরে এবং জবরদখল কলোনিতে। শিরোনামের তলায় চোদ্দ পয়েন্ট টাইপে লেখকের নাম : বিনয় কুমার বসু। তার নিচে ইটালিক হরফে কয়েক লাইনের ছোট্ট সম্পাদকীয় ভূমিকা।
[দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান হইতে প্রতিদিন শত শত শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া আসিতেছে। কবে ওই জনপ্রবাহ বন্ধ হইবে, কে জানে। ইতিমধ্যে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা আনুমানিক বিশ লক্ষ ছাড়াইয়া গিয়াছে। সরকারি ত্রাণশিবিরে ইহাদের নগণ্য একটি অংশকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হইয়াছে। বেশির ভাগই পড়িয়া আছে শিয়ালদা এবং অন্যান্য স্টেশনের প্লাটফর্মে কিংবা মহানগরীর ফুটপাথে, মুক্ত আকাশের নিচে। বাকি একটা অংশ সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থার ওপর ভরসা না রাখিয়া নিতান্ত মরিয়া হইয়াই ফাঁকা পতিত বা জলা জায়গা কিংবা ঝোপজঙ্গল দখল করিয়া কলোনি বসাইয়া বাঁচিবার চেষ্টা করিতেছে। আমাদের প্রতিবেদক কলোনি এবং ত্রাণশিবিরগুলিতে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ছিন্নমূল মানুষদের অবর্ণনীয় দুর্দশার তথ্য সংগ্রহ করিতেছেন। উপরের শিরোনামে প্রতিদিন একটি করিয়া শিবির বা কলোনির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হইবে। আজকের বিষয় : গড়িয়ার নিকটস্থ সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি। সম্পাদক : নতুন ভারত।]
বিনয় লক্ষ করল, ভূমিকার পর থেকেই তার লেখাটা শুরু হয়েছে। একটানা, ঠাসা লেখা। চোখের পক্ষে আরামদায়ক নয়। তাই সেটার মাঝখানে আটিস্টকে দিয়ে উদ্বাস্তুদের ধ্বস্ত, ভাঙাচোরা চেহারার স্কেচ আঁকিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম পাতায় পুরো লেখাটা ধরানো যায়নি। শেষাংশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে ছয়ের পাতায়। ঝড়ের গতিতে পাতা উলটে উলটে সেখানে পৌঁছে গেল বিনয়। আরও একটা সারপ্রাইজ তার জন্য অপেক্ষা করছিল। আগের লেখার শেষটুকু তো আছেই, তার অন্য একটা ফিচারও এখানে ছাপা হয়েছে। রিভার্সে শিরোনাম : দেশ ভাগ : নানা ঘটনা, নানা মানুষ। তবে এই লেখাটায় তার একটা ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছে-দর্শক। এটার সঙ্গেও সংক্ষিপ্ত ভূমিকা রয়েছে। সেই ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় থেকে যে গণহত্যা, ধর্ষণ, আগুন লাগিয়ে গাঁয়ের পর গাঁ, শহরে মহল্লার পর মহল্লা ছারখার করা শুরু হয়েছিল, তার জের চলছেই। মাসের পর মাস কেটে যায়। হননক্রিয়া থামে না। ধর্ষণ থামে না। আগুন লাগানো বন্ধ হয় না। বিষবাষ্পে ভরে গেছে দশ দিগন্ত। এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনও কোনও মানুষ প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশভাগ : নানা ঘটনা, নানা মানুষ-এ এইসব বিস্ময়কর মানুষ বা ঘটনার বর্ণনা থাকবে। সমস্ত উপমহাদেশ জুড়ে যে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে, এগুলো তার মধ্যে টুকরো টুকরো আলোর বিন্দু। সম্পাদক জানিয়ে দিয়েছেন, এই ফিচারটা সপ্তাহে দুদিন বেরুবে। রবিবার আর বৃহস্পতিবার।
বিনয়ের আজকের লেখাটার বিষয়: মামুদপুর গ্রামের আফজল হোসেন। লোকটা নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে এক কুয়াশাবিলীন রাত্তিরে রাজাকার আর মুসলিম লিগের ঘাতকবাহিনীর হাত থেকে তাকে আর ঝিনুককে আগলে আগলে নদী পার করে তারপাশা স্টিমারঘাটায় পৌঁছে দিয়েছিল।
চকিতে স্মৃতির গোপন কুঠুরি থেকে বেরিয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় আফজল হোসেন। মধ্যবয়সী মানুষটি ধীর, স্থির, বিচক্ষণ। চরম বিপদের মুখেও বিচলিত হয় না। একদিন সকাল থেকে পরের দিন সকাল অবধি, মাত্র চব্বিশটা ঘন্টা তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে। এইটুকু সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে বিনয় অনুভব করেছে, মানুষটার বুকের ভেতরটা অপার মায়ায়, অফুরান করুণায় পরিপূর্ণ। সে নতুন করে তাদের জীবনদান করেছে। তাকে পাশে পাওয়া না গেলে কোনওভাবেই ইণ্ডিয়ায় আসা সম্ভব হতো না। হননকারীর দল তাদের শেষ করে দিত।
আফজল হোসেন বার বার বলে দিয়েছিল, কলকাতায় এসেই যেন বিনয় তাকে চিঠি লিখে পৌঁছনোর-সংবাদটা জানিয়ে দেয়। কিন্তু সে এমনই অকৃতজ্ঞ আর অমানুষ যে চিঠি লেখা হয়নি। নিজেকে হাজার বার ধিক্কার দেয় সে, নিজের গালে ঠাস ঠাস চড় কষাতে ইচ্ছা করে। মনে মনে বিনয় ভেবে নিল, নিত্য দাস তো প্রায়ই সুধাদের বাড়িতে আসে। সে চিঠিটা লিখে রাখবে। নিত্য এলেই তার হাতে সেটা দিয়ে অনুরোধ করবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন আফজলের কাছে পৌঁছে দেয়। ঠিকানাটাও পরিষ্কার মনে আছে। গ্রাম : মামুদপুর, বিক্রমপুর, জিলা ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান।
আফজল হোসেন যেমন চকিতে দেখা দিয়েছিল, চোখের সামনে থেকে তেমনি লহমায় মিলিয়ে গেল।
একবার, দুবার, তিনবার-বার বার নিজের লেখা দুটো পড়ল বিনয়। ছাপার অক্ষরে একি তারই লেখা? বিনয় কুমার বসু আর দর্শক, এই নাম দুটো কি তারই? না কি অন্য কেউ? সব যেন অবিশ্বাস্য, অলীক স্বপ্নের মতো।
প্রসাদ তাকে দিয়ে বেশ কটা প্রতিবেদন লিখিয়ে নিয়েছিলেন। কবে সেগুলো ছাপা হবে তার বিন্দুমাত্র আভাস দেননি।
