শান্তিনিবাস মেসে চলে যাবার সিদ্ধান্তটা অনেক আগেই নিয়েছিল সে। তার ব্যবস্থাও কাল হয়ে গেছে। প্রসাদ কথা দিয়েছেন, একটা আলাদা রুম তাকে জোগাড় করে দেবেন। সে যে সুধাদের কাছে থাকবে না সেটা এখনও ওদের জানানো হয়নি। খান মঞ্জিল-এ পুরোদমে কাজ চলছে। সারাই টারাই প্রায় শেষ। রংটং বাকি। সেটা হয়ে গেলে শুভদিন দেখে গৃহপ্রবেশ করা হবে। ওই বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব ভোলা একটা বড় ঘর তার জন্য ঠিক করে রেখেছে সুধারা। ওরা সেটা মনের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে দেবে।
মেসের ব্যাপারটা আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। দুএক দিনের ভেতর এই নিয়ে সুধাদের সঙ্গে কথা বলবে বিনয়। সে জানে হিরণরা ভীষণ কষ্ট পাবে, কিছুতেই তাকে ছাড়তে চাইবে না। সুধা তো কেঁদেকেটে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভাসিয়ে দেবে। তবু না জানালেই নয়। কাল রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে যতবার কথাগুলো ভেবেছে, নিজেরই ভীষণ খারাপ লেগেছে। নিদারুণ অস্বস্তি তাকে তোলপাড় করে দিচ্ছিল।
এ তো গেল একটা দিক। আর-এক দিকে রয়েছে সেই সারপ্রাইজের ব্যাপারটা। কাল সকালে প্রথম দিনের নতুন ভারত-এ তার জন্য কী ধরনের চমক অপেক্ষা করে আছে? প্রসাদ লাহিড়ির কথার তলকূল খুঁজে পাচ্ছিল না সে।
.
শীতের সকাল হয় ধীর চালে। অন্ধকার আর কুয়াশা কেটে দিনের আলো ফুটতে ফুটতে বেশ সময় লাগে।
ভোর হতে না হতেই আষ্টেপৃষ্ঠে চাদর জড়িয়ে, মাথা ঢেকে পশ্চিম দিকের ঝুল-বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল বিনয়। এখনও বাড়ির কেউ ওঠেনি।
অন্ধকার অবশ্য নেই। কুয়াশা আছে, তবে তেমন ঘন নয়। দূরে বড় রাস্তায় অল্প কিছু লোকজন আর গাড়িটাড়ি দেখা যাচ্ছে। দু-চারটে চায়ের আর খাবারের দোকান এর মধ্যেই খুলে গেছে। বাকি দোকানপাট খুলবে বেলা বাড়লে, শীতঋতুর রোদ উঠার পর যখন তপ্ত হতে শুরু করবে সেই সময়।
সুধারা দুখানা কাগজ রাখে। একটা ইংরেজি, একটা বাংলা। দ্য স্টেটসম্যান এবং যুগান্তর। ওদের কাগজওলা কারওকে না জানিয়ে বারোমাস কাগজ দুটো এই ঝুল-বারান্দায় ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায়।
কোনও দিনই এত ভোরে বিনয় বা বাড়ির অন্য কেউ এখানে এসে দাঁড়ায় না। বিশেষ করে এই শীতকালে। এই সময়টা তারা থাকে লেপের ভেতর, দুই হাঁটু বুকে গুঁজে গুটিসুটি মেরে।
আজ যুগান্তর বা স্টেটসম্যান-এর জন্য আসেনি বিনয়। কখন নতুন ভারত আসবে সেই আশায় অপেক্ষা করে আছে সে। রুদ্ধশ্বাসে।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। পাতলা কুয়াশা ভেদ করে সুধাদের কাগজওলা সাইকেলে চেপে চলে এল। বাহনটি পুরোপুরি থামাল না, গতি কমিয়ে ওপর দিকে তাকালো। বিনয়কে দেখে একটু অবাক হল, এ-সময় কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, হয়তো ভাবতে পারেনি। কোনও প্রশ্ন না করে সিটে বসেই অভ্যস্ত হতে পাটের সুতোয় বাঁধা দুটো কাগজ পটাপট ঝুল-বারান্দায় ছুঁড়ে দিয়ে সাইকেলের স্পিড বাড়িয়ে ডান পাশের বাড়িঘরের আড়ালে অদৃশ্য হল।
কাগজ দুটো পড়েই আছে। বাঁধন খুলে দেখার মতো গরজ এই মুহূর্তে নেই বিনয়ের। পরে দেখে নিলেই চলবে, ভাবখানা এইরকম। সে দূরের রাস্তায় চোখ রেখে তাকিয়েই থাকে।
মিনিট পনেরো কুড়ি বাদে আর-একটি কাগজওলা এসে হাজির। তার সাইকেলের সামনের হ্যাঁণ্ডেলে লাগানো সাদা রং-করা টিনের ফলকে লাল হরফে লেখা : নতুন ভারত।
কাল রাত থেকেই উত্তেজনার মধ্যে ছিল বিনয়। সেটা এখন শতগুণ হয়ে সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলীতে চারিয়ে গেছে।
সাইকেল পিওনটা অবাঙালি। খুব সম্ভব বিহারি কিংবা ইউ পির লোক। মাঝবয়সী। এধারে ওধারে তাকাচ্ছিল। বিনয়ের তর সইছিল না। সে ঝুল-বারান্দার রেলিংয়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বিনয় কুমার বসুকে খুঁজছেন?
পিওনটা ওপর দিকে তাকিয়ে বলল, হাঁ, বাবুজি
আমিই বিনয় বসু।
নমস্তে-পিওনের মুখে মুশকিল আসান হাসি। খুব সম্ভব তাকে বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হয়নি। যার জন্য আসা তাকে তাড়াতাড়িই পেয়ে গেছে। হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে সে বলল, আপকা পেপার লিয়ে এসেছি। এই লিন বলে সুতো-বাঁধা কাগজ ছুঁড়ে দিল।
কলকাতার কাগজওলাদের টিপ অব্যর্থ। বিনয় আগেও লক্ষ করেছে, সাইকেল চালাতে চালাতেই একান্ত অবলীলায় তারা দোতলা, তেতলা, এমনকি চারতলা পাঁচতলাতেও কাগজ ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলে যায়। কারও নিশানাই ফসকায় না। অবশ্য এসব নিয়ে এই মুহূর্তে কিছুই ভাবছিল না সে। নিচু হয়ে ঝুল-বারান্দার মেঝে থেকে নতুন ভারত-এর কপিটা তুলে নিল।
রাস্তা থেকে সাইকেল পিওনের গলা ভেসে আসে, অব চলতা হ্যায় বাবুজি। ফির কাল আসবে। নমস্তে সে চলে যায়।
পিওনটার কথা বুঝি বা শুনতেই পেল না বিনয়। সুতোর গিট খুলে কাগজটা বার করে ফেলে সে। নামকরা একজন আর্টিস্টকে দিয়ে কাগজের নামটা লিখিয়ে নিয়েছিলেন জগদীশ গুহঠাকুরতা। চোখে লেগে থাকার মতো ক্যালিগ্রাফি। সেটাই প্রথম পাতার মাথায় দেখা যাচ্ছে। আর সব ছাপাও চমৎকার। প্রথমত সাদা নিউজপ্রিন্ট, তাছাড়া নতুন লাইনো টাইপ, মেক-আপে যত্নের ছাপ। সব মিলিয়ে ঝকঝক করছে।
বিনয়ের চোখ পাতাটার ওপর ছোটাছুটি করছিল। ওপরের দিকে প্রথমেই কালকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের চার কলম জোড়া প্রতিবেদন। সেখানে বিধানচন্দ্র রায়ের বড় ছবি। তিনি ভাষণ দিচ্ছেন। এ-ছাড়া দেশি-বিদেশি নানা খবরের ছড়াছড়ি। কাশ্মিরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলা অব্যাহত। কয়েকটি দেশীয় রাজ্যের ভারতভূক্তিতে চাপা অসন্তোষ। রুশ-মার্কিন ঠাণ্ডা লড়াই, ইত্যাদি।
