ঘটনাটি এমন কিছুই নয়। খুবই তুচ্ছ। তবু বিনয়ের বুকের ভেতর হালকা শিহরনের মতো কী যেন খেলে যায়।
.
খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে ফের নিউজ ডিপার্টমেন্টে। বিধানবাবু চলে যাবার পর সারা অফিস জুড়ে ছিল ঢিলেঢালা ভাব। সর্বত্র আড্ডার মেজাজ। কিন্তু কাল প্রথম কাগজ বাজারে বেরুবে। এখন চারদিকের চেহারা পালটে গেছে। কোথাও এতটুকু শৈথিল্য নেই। টান টান ব্যস্ততায় নিউজ ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু হয়ে গেছে।
বিনয় তার টেবলে বসে ছিল। তাকে যে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে তাতে চরকির মতো বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়। কিন্তু শীতের এই পড়ন্ত বেলায় কোনও জবরদখল কলোনি বা ত্রাণশিবিরে যাবার প্রশ্নই নেই। কখন সেখানে পৌঁছবে আর কখনই বা বাড়ি ফিরবে? তাছাড়া, সাত-আটটা কলোনি আর রিলিফ ক্যাম্পের ওপর লেখা তৈরি করে প্রসাদের কাছে জমা দেওয়া আছে। পাকিস্তান থেকে আসার সময় যে-সব হাড় হিম-করা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল কিংবা বিস্ময়কর যে মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেই সব বিবরণও কিছু কিছু লিখে দিয়েছে। শুধু তাই না, বম্বে এবং দিল্লির পুরানো কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করেও বেশ কটা লেখা লিখেছে।
বিনয় একবার ভাবল, লাইব্রেরিতে গিয়ে কলকাতার বাইরের কাগজগুলোর ফাইল নিয়ে বসে। কিন্তু কেমন যেন আলস্য লাগল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বেহালার একটা জবরদখল কলোনির নাম মনে পড়ে গেল মহাত্মা গান্ধী কলোনি। কদিন আগে সেখানে গিয়েছিল সে। বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে প্রচুর নোটও নিয়ে এসেছে। সেটা বরং লিখে ফেলা যায়।
টেবলের ড্রয়ার থেকে নিউজ প্রিন্টের প্যাড বার করে কলমের ক্যাপ খুলে ফেলল বিনয়।
তাড়াহুড়ো করে নয়, ধীরেসুস্থে সে যখন লেখাটা শেষ করল শীতের দিন ফুরিয়ে এসেছে। বাইরের রাস্তাটাস্তা এর মধ্যেই ঝাপসা হয়ে গেছে। কখন কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল, টের পাওয়া যায়নি।
নিউজ ডিপার্টমেন্টের সুবিশাল হল-ঘরটায় কিন্তু অজস্র আলো। চারদিকের জানালা-টানালা বন্ধ থাকায় কুয়াশা ঢুকতে পারেনি। তাই আলোর তেজটা এখানে অনেক বেশি।
বিনয় তার লেখাটা নিয়ে প্রসাদ লাহিড়ির টেবলে চলে এল। হাত বাড়িয়ে সেটা নিতে নিতে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, আজ কী নিয়ে লিখলে? কলোনি, না রিলিফ ক্যাম্প?
বিনয় বলল, বেহালার একটা জবরদখল কলোনি-
ঠিক আছে–লেখাটা টেবলের ড্রয়ারে রাখতে রাখতে প্রসাদ বলেন, সেই সকালে এসেছ। প্রচুর ধকল গেছে। লেখাও জমা দিলে। এখন বাড়ি যাও– এই হৃদয়বান মানুষটি প্রথম দিন থেকে অসীম মমতায় কাছে টেনে নিয়েছেন। নতুন চাকরি, কঠিন একটা অ্যাসাইনমেন্টও তাকে দেওয়া হয়েছে। যাতে শারীরিক ধকলে খুব কষ্ট না হয়, সেজন্য কাজ শেষ হলেই ছুটি দিয়ে দেন। বিনয় বলল, আপনারাও তো সেই সকালে এসেছেন। ফিরবেন মাঝরাত্তির পার করে আসলে কাল নতুন ভারত বাজারে বেরুবে। উত্তেজনায় সমস্ত অফিস ফুটছে। আরও কিছুক্ষণ বিনয়ের থাকার ইচ্ছা ছিল।
প্রসাদ বললেন, আরে বাবা, আমরা পুরোনো রিপোর্টাররা হলাম রাতজাগা প্রাণী। সন্ধেবেলায় মেসে ফিরলে বদহজম হবে। কিছুদিন যাক, হ্যাবিটটা পাকা হোক, তখন তুমিও আমাদের মতো হয়ে যাবে। এখন যাও
আর কিছু বলতে সাহস হল না। হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। কদিন ধরেই বলব বলব করছিল। কিন্তু অধর ছুঁইমালীর কাছে ঝিনুকের খবর পেয়ে এমনই উতলা হয়ে চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করে যে অন্য কিছুই খেয়াল ছিল না। সে বলল, প্রসাদদা, আমার একটা উপকার করতে হবে
প্রসাদ অবাক। জিজ্ঞেস করেন, কী উপকার?
আপনাদের মেসে আমার একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আলাদা রুম হলে ভাল হয়। ছোট হলেও চলবে।
কিছুক্ষণ থ হয়ে থাকেন প্রসাদ। তারপর বলেন, তুমি তো তোমার দিদির কাছে থাকো!
হ্যাঁ।
কিছু মনে কোরো না। সেখানে কি কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে?
না না জোরে জোরে মাথা ঝাঁকায় বিনয়, একেবারেই না। দিদি, জামাইবাবু, জামাইবাবুর ঠাকুরদা, জেঠাইমা-সবাই আমাকে খুব পছন্দ করেন, ভীষণ ভালবাসেন। কী যত্ন যে করেন, ভাবা যায় না।
তা হলে?
দিদির শ্বশুরবাড়ি তো। সেখানে
ইঙ্গিতটা ধরে ফেলেন প্রসাদ, বুঝেছি। প্রশ্নটা আত্মসম্মানের–তাই না?
বিনয় বলে, বুঝতেই পারছেন, চিরকাল ওখানে থাকা ঠিক নয়।
একটু নীরবতা।
এবার প্রসাদ বলেন, ঠিক আছে, আমাদের মেসে অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়ে যাবে। কবে আসতে চাও, দুদিন আগে আমাকে জানিয়ে দিও।
বিনয় চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে, প্রসাদ হঠাৎ বলে ওঠেন, অফিসে তোমার দিদির বাড়ির অ্যাড্রেস দেওয়া আছে?
চাকরির দরখাস্তে জাফর শা রোডের ঠিকানা লিখে দিয়েছিল আনন্দ। বিনয় বলল, আছে।
কাল থেকে রোজ সকালে অফিসের সাইকেল পিওন নতুন ভারত-এর কপি তোমাকে দেবে। কাল সকালে কাগজটা পেলেই খুলে দেখো, তোমার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে।
বিস্ময়ের সুরে বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী সারপ্রাইজ?
প্রসাদের মুখে রহস্যময় মৃদু হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায়, সেটা কালকেই দেখতে পাবে।
.
৫২.
কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি। মস্তিষ্কে চিন্তা অনবরত হুল ফোঁটালে কিংবা স্নায়ুতে উত্তেজনা থাকলে ঘুমোনো যায় না। খানিকটা সময় কেটেছে আধো তন্দ্রায়, বেশির ভাগটাই জেগে জেগে। এই শীতের রাতেও বার বার উঠে জল খেয়েছে বিনয়! কতবার যে বাথরুমে গেছে!
