মণিলাল তার সঙ্গে তাল দিল, যা বলেছ ভাই। হয়তো দেখা যাবে, দু-চার মাসের ভেতর কুমারী পারমিতা গুহঠাকুরতা অনেক সিনিয়রকে টপকে নতুন ভারত-এর কোনও ডিপার্টমেন্টের টপে গিয়ে বসেছে।
বিশুদ্ধ রগড়ই কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি ধরনের। প্রসাদ চাপা গলায় ধমক দিলেন, অনেক হয়েছে, স্টপ ইট। তোমরা যা বললে, জগদীশবাবুর কানে যাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
সুধেন্দু, মণিলাল-দুজনেই অপ্রস্তুত। সুধেন্দু কাঁচুমাচু মুখে বলে, এটা ফান। আমরা একটু মজা করছিলাম।
প্রসাদ বললেন, মজারও মাত্রা থাকা দরকার। কাকে নিয়ে রগড় করছ, কোথায় বসে করছ, সেটা মনে থাকা উচিত। আই ডোন্ট লাইক দিস কাইন্ড অফ ফ্রিভোলিটি।
সুধেন্দুরা আর কিছু বলে না। সকাল থেকে দিনটা একটা চমৎকার সুরে বাঁধা ছিল। হঠাৎ সেটায় সামান্য ছেদ পড়ল।
নতুন ভারত-এর কর্মীদের সংখ্যা সব মিলিয়ে আপাতত এক শ একাশি। তা ছাড়া বাইরের আরও কিছু লোকজন আছেন। যেমন সেই কিশোরীর দলটা। যেমন সানাইওলা, তার সঙ্গী বাজানা দারেরা, ইত্যাদি। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বিল্ডিংয়ের ছাদে। ছাদটা যদিও বেশ বড়, তবে তত বড় নয় যে একসঙ্গে এত লোককে বসিয়ে খাওয়ানো যায়। তাই দুটো ব্যাচে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।
সাড়ে বারোটায় খাওয়ার ডাক পড়েছিল। প্রথম ব্যাচে প্রেসের লোকন, কম্পোজিটর, সাইকেল পিওন, কিশোরীদের দলটা, সানাইওয়ালাদের গ্রুপ এবং অফিসের আরও দু-তিনটে ডিপার্টমেন্টের এমপ্লয়ীদের খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাচে বাকি সবাইকে যখন ডাকা হল তখন সোয়া একটা।
ছাদে এসে বিনয় অবাক। সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য যে চেয়ারগুলো অতিথিদের জন্য লাইন দিয়ে বসানো ছিল সেগুলো উধাও। মাইকও নেই। ডেকরেটরের লোকেরা কখন সে-সব সরিয়ে নিয়ে গেছে, নিউজ ডিপার্টমেন্টে বসে টের পাওয়া যায়নি। তবে মঞ্চটা এখনও আছে।
বিনয়ের ধারণা ছিল, লম্বা লম্বা টেবল পেতে চেয়ারে বসিয়ে খাওয়ানো হবে। তা নয়, মঞ্চের দিকটা বাদ দিয়ে বাকি তিন দিকের ছাদের দেওয়ালের গা ঘেঁষে চট ভাজ করে পেতে নিচে বসার ব্যবস্থা। মাঝখানেও রয়েছে চটের আসনের দুটো বো। আসনগুলোর সামনে সারি সারি কলাপাতা আর জল ভর্তি মাটির গেলাস। পাতের এক কোণে নুন, লেবুর টুকরো আর কাঁচা লঙ্কা।
মঞ্চের পাশে বিরাট বিরাট পেতলের হাঁড়ি, কাঠের বারকোশ আর ডেকচিতে স্তূপাকার খাদ্যবস্তু। যারা পরিবেশন করবে তারা ধুতির ওপর গামছা বেঁধে অপেক্ষা করছে। মঞ্চের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন জগদীশ, তার স্ত্রী এবং পারমিতা।
বিনয়রা উঠে আসতেই জগদীশ বয়স অনুযায়ী কারওকে তুমি কারওকে আপনি বলে সযত্নে। খেতে বসিয়ে দিয়ে পরিবেশনকারীদের খাবার দিতে বললেন।
নিখুঁত বাঙালি ভোজ। পদ অনেকগুলো। ধবধবে সরু চালের ধোঁওয়া-ওঠা গরম ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, বোঁটাসুদ্ধ বেগুন ভাজার লম্বা ফালি, আলু-ফুলকপির ডালনা, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, ততপসে মাছ ভাজা, সর্ষে-ইলিশ, বড় বড় পাবদা মাছের ঝাল, আমসত্ত্বের চাটনি, চিনিপাতা দই আর নলের গুড়ের কাঁচাগোল্লা, ক্ষীরের পানতুয়া।
বিনয় সকাল থেকে নতুন ভারত-এর অফিসে আছে। রান্নাবান্নার কোনও লক্ষণই চোখে পড়েনি। ভেবে পাচ্ছিল না, এত সব সুখাদ্য কোথায় তৈরি হল আর কীভাবেই বা ছাদে উঠে এল। তার পাশে বসে খাচ্ছিলেন প্রসাদ। তাকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল, এ-বাড়িতে অনুষ্ঠান হবে, প্রচুর লোকজন আসবে। সেই ভিড় আর হট্টগোলের মধ্যে রান্নাবান্নার অসুবিধে। তাই পাশের বাড়িতে বামুন ঠাকুর দিয়ে রাধানো হয়েছে। নতুন ভারত-এর বিল্ডিংটার ভেতর দিয়ে যেমন ছাদে ওঠার সিঁড়ি আছে, তেমনি বাইরে থেকে পেছন দিকে একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়িও রয়েছে। ভোজ্য বস্তুগুলো সেই পথেই ওপরে উঠে এসেছে।
জগদীশ গুহঠাকুরতা খুবই রাশভারী। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কিন্তু এখন তাকে যেন চেনাই যায় না। তিনি আজ জয়েন্ট ফ্যামিলির সহৃদয় গৃহকর্তার ভূমিকায়। প্রতিটি এমপ্লয়ীর কাছে গিয়ে তদারক করছেন। হাঁকডাক করে পরিবেশনকারীদের ডাকিয়ে এনে কারও পাতে দিতে বলছেন ইলিশের পেটি, কারও পাতে পাবদা। তাঁর স্ত্রী আর মেয়েও ঘুরে ঘুরে দেখাশোনা করছে।
মুখ নিচু করে খাচ্ছিল বিনয়। ভাবছিল, এই গুহঠাকুরতায় পরিবারটি তো চমৎকার। তারা মালিক। কর্মচারীদের ভোজ দিয়েছেন। তারা খেয়ে কৃতার্থ হয়ে যাবে। এমনটাই তো নিয়ম। কিন্তু গুহঠাকুরতারা সপরিবারে প্রতিটি এমপ্লয়ীর কাছে গিয়ে তত্ত্বতালাশ নিচ্ছেন। এটা বিরল ঘটনা। বিনয়ের ভীষণ ভাল লাগছিল।
আপনি তো কিছুই খাচ্ছেন না
ভারী নরম কণ্ঠস্বর শুনে চমকে মুখ তোলে বিনয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পারমিতা। এমন নয় যে আলাদা করে তার কাছে এসেছে। অন্য সবার মতো তারও খোঁজখবর নিচ্ছে সে।
বিনয় খুবই স্বল্পাহারী। এই সেদিন সে পাকিস্তান থেকে এসেছে। এখনও সুদুর নগণ্য এক শহরের লাজুক, জড়সড় যুবকটি তার ভেতরে থেকেই গেছে। একটি সপ্রতিভ, সুন্দরী তরুণী তার খাওয়া লক্ষ করছিল, ভাবতেই ভীষণ সংকোচ বোধ করে বিনয়। বিব্রতভাবে বলে, না না, ঠিক খাচ্ছি।
উঁহু–পাশ দিয়ে একটা পরিবেশনকারী যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে একরকম জোর করেই বিনয়ের পাতে দুটো কাঁচাগোল্লা দেওয়ালো পারমিতা।
