সুধেন্দু ঝাঁঝের গলায় বলে, নেহরু গভর্নমেন্ট ওয়েস্ট পাকিস্তানের রিফিউজিদের জন্যে দশ হাতে ঢেলে দিচ্ছে। আর ইস্ট বেঙ্গলের রিফিউজিদের বেলায় একটু আধটু ভিক্ষে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে পয়সাই গলতে চায় না।
বিনয় চুপচাপ ওদের কথা শুনে যাচ্ছিল। এদের মধ্যে সে সবচেয়ে জুনিয়র। আনকোরা। অনভিজ্ঞ। সিনিয়ররা যখন কোনও গভীর বিষয়ে কথা বলেন তখন যে কোনও মন্তব্য করতে নেই, এটুকু কাণ্ডজ্ঞান তার আছে। কদিন আগেই কোনও একটা কাগজে কার যেন লেখা পড়েছিল। নামটা এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। লেখাটায় প্রচুর তথ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে কী বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের দেওয়া হয়েছে। তাদের নিজের পায়ে স্বয়ম্ভর হবার জন্য নেওয়া হয়েছে কী কী পদক্ষেপ। লেখাটা পুরোপুরি টুকে রেখেছে বিনয়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে রিফিউজিদের জন্য কী করা হয়েছে বা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া কীভাবে এগুচ্ছে, সে সম্বন্ধে এখনও পরিষ্কার ধারণা নেই তার। ওয়েস্ট বেঙ্গল রিফিউজি অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশনের দপ্তরে একবার গিয়েছিল সে। আরও বারকয়েক গিয়ে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে তুলনামূলক একটা প্রতিবেদন তাকে তৈরি করতেই হবে। ওধারে রমেনও তার মতোই নীরবে বসে ছিল। সে সবে ঢাকা থেকে এসেছে। এখানকার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হালচাল এবং উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে সরকারি পলিসি পুরোপুরি না জেনে খুব সম্ভব মুখ খুলতে চায় না। হিসেবি লোক।
সুধেন্দুর স্বর ক্রমশ চড়ছিল, দেশের জন্যে সবচেয়ে বেশি স্যাক্রিফাইস করেছে বাঙালি। সবচেয়ে বেশি জেল খেটেছে, ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছে। তবেই না আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।
প্রসাদ বললেন, অন্য প্রভিন্সের ফ্রিডম ফাইটাররাও কম নির্যাতন ভোগ করেনি। তারাও জেলে পচে মরেছে, গুলিতে ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছে।
সুধেন্দু বলল, বাঙালিদের মতো নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরও সবচেয়ে বেশি সর্বনাশ হয়েছে বাঙালির। লক্ষ লক্ষ মানুষ উৎখাত হয়ে এপারে চলে আসছে। দিল্লি থেকে শুকনো সহানুভূতি শোনা যায়। তারা বলে, স্বাধীনতার জন্য পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তুদের অবদানের কথা, তাদের চরম কষ্ট ভোগের কথা, তাদের আত্মত্যাগের কথা দেশ কোনওদিন ভুলবে না। এইসব ভাল ভাল ফাঁকা বুলি কতকাল ধরে শুনে আসছি। কিন্তু এই লোকগুলোর জন্যে কাজের কাজ কী হয়েছে? কতটুকু হয়েছে? কোপটা যদি বেঙ্গলের ওপর না পড়ে পড়ত বোম্বে কি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ওপর, পড়ত যুক্তপ্রদেশ কি বিহারের ওপর, দেখতেন সারা ভারতবর্ষ তোলাপাড় হয়ে যেত।
সুধেন্দুর দিকে অবাক তাকিয়ে আছে বিনয়। বাঙালি উদ্বাস্তুদের প্রতি বৈষম্যের জন্য তার ভেতরে এতটা তীব্র ক্ষোভ যে জমা হয়ে আছে আর সেটা এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিনে এভাবে ফেটে পড়বে, ভাবা যায়নি।
আরও উগ্র, আরও উত্তপ্ত কিছু অভিযোগ উগরে দিত সুধেন্দু, এই সময় নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক এলেন। সঙ্গে জগদীশ গুহঠাকুরতার মেয়ে পারমিতা। তারাপদ কখনও সখনও রিপোর্টিং সেকশানে আসেন। কিন্তু নতুন ভারত-এর মালিক এবং সম্পাদকের মেয়ে আসবে, সেটা প্রায় অকল্পনীয়।
প্রথমটা সবাই হকচকিয়ে যায়। তারপর দ্রুত উঠে দাঁড়ায়।
তারাপদ বলেন, জগদীশবাবু পারমিতাকে নতুন ভারত-এর সব এমপ্লয়ীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে পাঠিয়েছেন। প্রথমে রিপোর্টিং সেকশনে নিয়ে এলাম। তারপর একে একে অন্যদের কাছে নিয়ে যাব।
পারমিতা হাতজোড় করে মৃদু গলায় বলে, নমস্কার। তার হাসি এবং কণ্ঠস্বর দুই-ই মিষ্টি।
রিপোর্টিংয়ের সবাই হাতজোড় করে। প্রসাদ বলেন, আপনি এসেছেন, আমরা খুব খুশি। এখনও কি পড়াশোনা করছেন?
পারমিতা বলে, না। লাস্ট ইয়ারে হিস্ট্রি নিয়ে এমএ পাস করেছি।
বিনয় একদৃষ্টে পারমিতাকে লক্ষ করছিল। মেয়েটি নম্র, বিনয়ী। মালিকের মেয়ে বলে লেশমাত্র অহমিকা নেই।
তারপদ বললেন, ভাল রেজাল্ট করেছে পারমিতা। ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড। একটা কলেজে লেকচারশিপও পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওর ইচ্ছে সাংবাদিক হয়। জগদীশবাবু আপত্তি করেননি। পারমিতা কাল থেকে নতুন ভারত-এ জয়েন করছে। আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।
বিনয় তাকিয়েই আছে। কলকাতায় বাঙালি মেয়েরা অনেকেই গার্লস স্কুল বা কলেজে পড়ায়। দেশভাগের পর নানা অফিসেও কেউ কেউ চাকরি বাকরি করছে। কিন্তু খবরের কাগজে সাংবাদিকতা করে, এমন মেয়ের কথা জানা নেই। নতুন ভারত-এও কোনও মহিলা রিক্রুট করা হয়নি। প্রেস থেকে এডিটোরিয়াল, এই কাগজ আগাপাশতলা পুরুষদেরই রাজ্য। তাদের পাশাপাশি বসে একা একটি মেয়ে কাজ করবে, ভাবতে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল বিনয়ের। সেটা যে কী, ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবে না সে।
পারমিতা বিনয়ী হলেও বেশ সপ্রতিভ। জড়তাহীন। বলল, আমি বেসিক থেকে শুরু করতে চাই। আপনারা আমাকে শিখিয়ে টিখিয়ে নেবেন।
তারাপদ তোয়াজের সুরে বললেন, তুমি হাইলি-এডুকেটেড, ইনটেলিজেন্ট মেয়ে। মাসখানেকের ভেতর সব শিখে যাবে। এরপর বিনয়দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে পারমিতাকে নিয়ে ওধারে সাব-এডিটরদের টেবলগুলোর দিকে চলে গেলেন।
বিনয়রা ফের বসে পড়ে।
পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের প্রতি বৈষম্য এবং উদাসীনতা নিয়ে যে উত্তপ্ত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল, সুধেন্দু তার জের আর টানল না। পুরোপুরি আলাদা প্রসঙ্গে চলে গেল। মজার গলায় সে বলে, দিনকাল জোর কদমে পালটে যাচ্ছে। বাঙালি মেয়েরা পুরনো গৃহলক্ষ্মী-মার্কা ইমেজ নিয়ে আর সংসার টংসার আগলে ঘরে বসে থাকতে চায় না। পটাপট ডিফারেন্ট প্রফেশনে ঢুকে পড়ছে। বাংলা সাংবাদিকতাটা পুরুষদের হানড্রেড পারসেন্ট মনোপলি ছিল। সেখানে আজ এক রমণীর আবির্ভাব ঘটল। শিগগিরই দেখবে এ-লাইনে ঝাঁকে ঝাঁকে নারীবাহিনী চলে আসছে। ভুরু নাচিয়ে, গলার স্বর উঠিয়ে নামিয়ে এমন ভঙ্গিতে কথাগুলো সুধেন্দু বলল যাতে সবাই প্রাণ খুলে হেসে ওঠে।
