আমাদের কাগজের ট্রায়াল রান চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। আজও ছাপা হয়েছে, তবে সেগুলো সাধারণ পাঠকের জন্য নয়। কাল থেকে নতুন ভারত নিয়মিত বাজারে বেরুতে থাকবে। পরম শ্রদ্ধেয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে তার প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততার মধ্যেও যে আমাদের মধ্যে পেয়েছি, সেজন্য কৃতার্থ বোধ করছি। আমাদের একান্ত অভিপ্রায় ছিল ডাঃ রায়কে পত্রিকার বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখাব। কিন্তু তার সময়াভাবের জন্য আজ তা সম্ভব হচ্ছে না। এগারোটা পনেরোয় রাইটাস!?য়ে তার মন্ত্রিসভার একটি জরুরি মিটিং আছে। তাকে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। তাই এবার আমাদের ইচ্ছা পূরণ হল না। আশা করি, ভবিষ্যতে আবার লাভ করব।
যাই হোক, ডাঃ রায়ের কাছে আমাদের বিনীত নিবেদন, আজকের অনুষ্ঠানের জন্য যে কাগজ ছাপা হয়েছে, অনুগ্রহ করে তা উদ্বোধন করে দুএকটি কথা বলুন।
বক্তব্য শেষ করে জগদীশ মাথা সামান্য হেলিয়ে তারাপদ ভৌমিককে কিছু একটা ইঙ্গিত করলেন। মঞ্চের পেছন দিকের একটা চেয়ারে লাল রিবনে বাঁধা একটি সুদৃশ্য প্যাকেট পড়ে ছিল। তারাপদ ত্বরিত পায়ে সেটা এনে ডাঃ রায়ের হাতে দিলেন। ডাঃ রায় রিবন খুলে প্যাকেটের ভেতর থেকে নতুন ভারত-এর একটি কপি বার করে দর্শকদের দিকে তুলে ধরলেন।
ফের প্যাণ্ডেল জুড়ে হাততালির আওয়াজ। কাগজটা টেবলে রেখে উঠে দাঁড়ান ডাঃ রায়। এর ভেতর তারাপদ মাইকটা টেনে তার সামনে নিয়ে এসেছেন।
ডাঃ রায় বলতে শুরু করলেন, নতুন একখানা কাগজ বেরুচ্ছে। খুব ভাল কথা। কিছু ছেলের চাকরি বাকরি হয়েছে। কাগজ চললে আরও অনেকের কাজের সুযোগ হবে।
জগদীশ জানিয়েছে প্রকৃত সত্য ছাপাবে। সেটাই বাঞ্ছনীয়।
সকলেরই জানা আছে, পশ্চিমবঙ্গ মহা সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। এখনকার জ্বলন্ত সমস্যা হল–উদ্বাস্তু। পূর্ব পাকিস্তান থেকে রোজই শরণার্থীরা এপারে চলে আসছে। তাদের পুনর্বাসন, রুজিরোজগারের ব্যবস্থা করা–এই নিয়ে সরকার ব্যতিব্যস্ত। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।
একটা কথা মনে রাখা দরকার, খবরের কাগজের বিরাট দায়িত্ব। এমন কিছু যেন ছাপা না হয় যাতে সীমান্তের এপারে ওপারে উত্তেজনার সৃষ্টি হতে পারে। তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রতিটি কাগজের নিজস্ব মতামত থাকে। থাকাই স্বাভাবিক। সরকারি কাজকর্মের যদি কিছু ত্রুটি হয়, সমালোচনা নিশ্চয়ই করতে হবে, কিন্তু তা যেন অতি অবশ্যই গঠনমূলক হয়।
আশা করি, নতুন ভারত নিষ্ঠার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব পালন করবে। নমস্কার
সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষ করে আর বসলেন না ডাঃ রায়। মঞ্চ থেকে নেমে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন।
জগদীশ গুহঠাকুরতা টেবল থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে চললেন। পেছনে বাকি সবাই।
নিচে এসে ডাঃ রায়কে গাড়িতে তুলে দিয়ে ফুলের তোড়াটা তার একান্ত সচিবের হাতে দিলেন জগদীশ।
ডাঃ রায়কে নিয়ে তার গাড়ি কংক্রিটে মোড়া সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ ধরে মসৃণ গতিতে ছুটে যায়। সেদিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়। মহাবৃক্ষের মতো বিশাল একটি মানুষ তার মনে গভীর ছাপ ফেলে যান।
৫১-৫৫. আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিরা
৫১.
রাস্তা থেকে ফের সবাই অফিসে ফিরে এসেছিল। বিধানবাবু চলে গেছেন। আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিরাও একে একে বিদায় নিয়েছেন।
নতুন ভারত-এর সব কর্মীকে অনুষ্ঠান উপলক্ষে সকাল থেকে হাজির থাকতে বলা হয়েছিল। মর্নিং শিফটে যাদের ডিউটি নেই, অনুষ্ঠানের শেষে তারাও কিন্তু চলে যায়নি। এমনকি জগদীশ গুহঠাকুরতার মেয়ে এবং স্ত্রীও থেকে গেছেন। তারা আছেন জগদীশের কামরায়। কিশোরী ছাত্রীর দঙ্গলটাও আছে। তারা নিউজ ডিপার্টমেন্টের এক ধারে কেউ বসে, কেউ বা দাঁড়িয়ে কল কল করে চলেছে। কথার ফাঁকে হিহি হাসি। সানাইওলা আর তার বাজনাদারেরা চলে তো যায়ইনি, বাজিয়েই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দম নেবার জন্য একটু থামে। তারপর আবার শুরু হয়ে যায়। এইভাবেই চলছে। সারাদিনই হয়তো চলবে।
এমপ্লয়ীরা যে যার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে বসেছে। কালই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর কেউ যেন চলে না যায়। পত্রিকার তরফ থেকে কর্মীদের সকলের জন্য মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার রেশ এখনও থেকে গেছে। বিধানচন্দ্র রায়, তাঁর ভাষণ, তার অপরিমাণ ব্যক্তিত্ব–এ-সব নিয়ে আলোচনা চলছে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে, প্রতি সেকশানে। বিনয়দের রিপোর্টিং সেকশানও বাদ নেই। অন্য দিন তারা নিজের নিজের নির্দিষ্ট টেবলে গিয়ে বসে। আজ বসেছে প্রসাদ লাহিড়িকে ঘিরে। নানা কথার ফাঁকে একসময় উদ্বাস্তুদের প্রসঙ্গ উঠল।
সুধেন্দু বলছিল, বিধানবাবু ইস্ট পাকিস্তানের রিফিউজিদের প্রবলেম সলভ করতে অনেস্টলি চেষ্টা করছেন। শুনি দিনে চোদ্দ পনেরো ঘন্টা কাজ করেন। কিন্তু দিনের পর দিন ওপার থেকে হাজার হাজার মানুষ চলে আসছে। এত বড় সমস্যার সুরাহা কী করে হবে, কে জানে।
মণিলাল বলল, পাঞ্জাবের মতো টোটাল এক্সচেঞ্জ অফ পপুলেশন যদি হতো, কাজ অনেক সহজ হয়ে যেত। ওয়েস্ট বেঙ্গল এতটুকু স্টেট। লাখ লাখ রিফিউজির যে রিহ্যাবিলিটেশন হবে, তার জন্য ল্যাণ্ড কোথায়?
