সানাইওলা নিচু গতে এতক্ষণ বাজাচ্ছিল। হঠাৎ সুরটা এক ঝটকায় অনেক উঁচুতে তুলে ফেলল। লাল-পাড় শাড়ি পরা সেই কিশোরীদের একটা দল শাঁখে ফুঁ দিতে লাগল মুহূর্মুহু। অন্য দলটা ডাঃ রায়ের দিকে ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে থাকে।
ডাক্তার রায় যে গাড়িটায় এসেছেন সেটার ফ্রন্ট সিট থেকে নেমে মাঝবয়সী একটি লোক ছুটতে ছুটতে তার কাছে চলে এলেন। খুব সম্ভব তার একান্ত সচিব।
জগদীশ গুহঠাকুরতা বিধান রায়কে অফিসের ভেতরে নিয়ে যান। তাদের পেছন পেছন বাকি সবাই সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওপরে উঠতে থাকে। অনেকটা শোভাযাত্রার ধরনে। ছাদে প্যাণ্ডেলের একটা চেয়ারও ফাঁকা নেই। ডাঃ রায় সেখানে যাবার সঙ্গে সঙ্গে অতিথিরা সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন।
জগদীশ গুহঠাকুরতা তার স্ত্রী, মেয়ে এবং নতুন ভারত-এর অন্য সব কর্মকর্তারা ডাঃ রায়কে উঁচু মঞ্চে নিয়ে যান। বিশাল মঞ্চটার মাঝামাঝি ভেলভেটে মোড়া সিংহাসনের মতো একটা বড় চেয়ার। সামনে টেবল। মঞ্চের পেছন দিকে আরও কয়েকটা চেয়ার, সাধারণ গদিওলা। এক ধারে আরও একটা ছোট টেবল। সেটার সামনে মাইক।
জগদীশরা ডাঃ রায়কে বড় চেয়ারটায় নিয়ে বসান। তিনি বসলে অতিথিরাও ধীরে ধীরে বসতে শুরু করেন।
মঞ্চে জগদীশ, তার স্ত্রী, মেয়ে, তারাপদ ভৌমিক, প্রসাদ লাহিড়ি, আদিনাথ চক্রবর্তী এবং নতুন ভারত-এর বিভিন্ন বিভাগের সম্পাদক, নানা ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার যাঁরা উঠে গিয়েছিলেন তারা কিন্তু বসেন না। মেরুদণ্ড টান করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
জগদীশ এবার ছোট টেবলের সামনে গিয়ে মাইকে বলতে লাগলেন, অনুষ্ঠান শুরু করার আগে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার পরম শ্রদ্ধেয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে পুষ্পস্তবক দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হবে। স্তবকটি দেবে আমাদের প্রেস বিভাগের কর্মী দেবেন্দ্রনাথ মল্লিকের কন্যা কুমারী সুরমা মল্লিক। আমি সুরমাকে মঞ্চে ডাকছি।
অপার বিস্ময়ে প্যাণ্ডেলের এক ধারে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ করছিল বিনয়। কোনওদিন কি সে কল্পনা করতে পেরেছিল, এমন একটা ঘটনা তার জীবনে ঘটবে? এত সব বিখ্যাত মানুষের কাছাকাছি সে আসতে পারবে? একবার মনে হচ্ছে, কেউ যেন অলীক স্বপ্নের ভেতর তাকে ফেলে দিয়ে গেছে। পরক্ষণে মনে হয়, সে এই বিশাল অনুষ্ঠানেরই অংশ। কত রকমের অনুভূতি যে তার হচ্ছে! শিহরন। উত্তেজনা। আনন্দ। খুব ভাল লাগছে জগদীশের ঘোষণাটি শুনে। নিজের মেয়ে বা স্ত্রীকে দিয়ে ফুলের স্তবক ডাঃ রায়কে দেওয়াতে পারতেন। দেননি। তাদের বাদ দিয়ে সামান্য এক প্রেস কর্মীর মেয়েকে ডেকেছেন। ভদ্রলোকের হৃদয়টা সত্যি বেশ বড় মাপের।
লাল-পাড় শাড়ির জটলা থেকে একটি মেয়ে বিশাল ফুলের তোড়া হাতে মঞ্চে উঠে আসে। কুমারী সুরমা মল্লিক। সুন্দরী, জড়তাহীন। চোখে মুখে নিষ্পাপ সারল্য। ডাঃ রায়কে তোড়া দিয়ে সুরমা তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে। হাসিমুখে সস্নেহে তিনি তার সঙ্গে দুএকটি কথা বলেন। সুরমা তারপর আর দাঁড়ায় না, মঞ্চ থেকে নেমে আসে। এদিকে সারা প্যাণ্ডেল হাততালিতে ফেটে পড়ে।
মাইকের সামনে থেকে জগদীশ ততক্ষণে সরে গেছেন। তারাপদ ভৌমিক এগিয়ে এসেছেন। কে একজন ব্যস্তভাবে একটা হারমোনিয়াম ছোট টেবলের ওপর সযত্নে রেখে দিয়ে যায়। তারাপদ মাইকের কাছে মুখ এনে বলেন, এবার উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইবে কুমারী পারমিতা গুহঠাকুরতা। বলেই পেছনে চলে যান।
মঞ্চের অন্য প্রান্ত থেকে হারমোনিয়ামের কাছে চলে আসে জগদীশ গুহঠাকুরতার মেয়ে। নিজের মেয়ে গাইবে, সেটা বলতে হয়তো সংকোচ হয়েছে জগদীশের। তাই তারাপদকে দিয়ে ঘোষণাটা করিয়েছেন।
মনে মনে ধাক্কা খায় বিনয়। পরিবারের কেউ ডাঃ রায়ের নজর কাড়ার জন্য কিছু একটা করবে না, তাই কখনও হয়? তাছাড়া অতিথিদের মধ্যে বিশিষ্ট নামকরা সব মানুষরা রয়েছেন। শেষ অবধি তাদের সামনে নিজেদের তুলে ধরার এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি জগদীশ। পৃথিবীতে কে আর এক শ ভাগ উদার বা মহৎ? আত্মপ্রচার বা পরিজনদের প্রচার কে না চায়? এটাই হয়তো নিয়ম।
কিন্তু হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল চালিয়ে পারমিতা গান-ধরতেই মুহূর্তে বিনয়ের মনের খিচটা উধাও হয়ে যায়। চিরকালের সেই মৃত্যুঞ্জয় সঙ্গীত-বন্দে মাতরম্।
ডাঃ রায় উঠে দাঁড়িয়েছেন। তার দেখাদেখি মণ্ডপের প্রতিটি মানুষও।
পারমিতা মগ্ন হয়ে গাইছিল
বন্দেমাতরম
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম্।
শুভ্র জ্যোৎস্না পুলকিত যামিনীং..
আশ্চর্য সতেজ, সুরেলা কণ্ঠ পারমিতার। এমন গলাতেই এই গান মানায়। শুদ্ধ মন্ত্রের মতো প্যাণ্ডেলের সীমানা ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
ছাদেও সুধেন্দু বিনয়ের পাশে। সে কানে কানে বলল, এই গানটা বিধানবাবুর ভীষণ প্রিয়।
গান শেষ হলে সবাই বসে পড়ল। ফের জগদীশ মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মাননীয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, উপস্থিত বিশিষ্ট সুধীজনেরা, আপনারা আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আজ যে এখানে এসেছেন সেজন্য নতুন ভারত-এর তরফ থেকে সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
আপনারা সবাই জানেন, আমরা একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করতে চলেছি। প্রশ্ন উঠতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত এবং জনপ্রিয় কাগজ রয়েছে, তবু কেন আরও একটি নতুন পত্রিকার কী প্রয়োজন? এই প্রসঙ্গে সবিনয়ে জানাই, স্বাধীনতার পর মানুষের পড়ার অভ্যাস দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে নানা বিষয়ে আগ্রহ। রাজনীতি, ধর্ম, খেলাধুলো, বিজ্ঞান, সিনেমা, থিয়েটার, সারা বিশ্বের নানা ঘটনা প্রবাহ-সব ব্যাপারেই তাদের অত্যন্ত কৌতূহল। তাছাড়া দেশভাগের কারণে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলো পাঠকের কাছে যথাযথ তুলে ধরা দরকার। অন্যান্য পত্রিকাগুলো যে তা করেছে না তা নয়। তাদের প্রতিযোগী হিসেবে নয়, সহযোগী হিসেবে একত্রে এই কাজ চালাতে চাই। খবরের নামে অর্ধসত্য বা বানানো গল্প নয়, প্রকৃত সত্যকেই আমরা প্রকাশ করব।
