নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক, চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি আর জেনারেল ম্যানেজার আদিনাথ চক্রবর্তী কোথাও যাতে বিশৃঙ্খলা না ঘটে সেদিকে নজর রাখছিলেন। হাঁকডাক করে অফিসের কর্মীদের এটা সেটা ফরমাশ করছেন।
বিনয়কে দেখতে পেয়ে তারাপদ ভৌমিক কাছে ডেকে বললেন, ঠিক সময়েই এসে গেছ। জগদীশবাবু তার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে ডাক্তার রায়কে আনতে গেছেন। দশটায় ওঁরা এসে যাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে গেস্টরা আসতে শুরু করবেন। তোমরা রিপোর্টিং সেকশানের-মণিলাল রমেন সুধেন্দু আর তুমি অতিথিদের ওপরে এনে বসাবে। ওই যে ওরা দাঁড়িয়ে আছে– মঞ্চের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন তারাপদ। সেখানে মণিলালদের দেখা গেল। তাদেরও ডেকে একই কথা তো বললেনই, পাখিপড়ার মতো বুঝিয়ে দিলেন, আমন্ত্রিতরা সমাজের বিশিষ্ট সব মানুষ–বিজনেসম্যান, শিল্পপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অ্যাড এজেন্সির হর্তাকর্তা, পুরানো স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসেবী ইত্যাদি–তাদের সসম্মানে, অত্যন্ত বিনীতভাবে যেন অভ্যর্থনা জানানো হয়।
বিনয়রা নিচে নেমে তোরণের পাশে এসে অপেক্ষা করতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসছেন। তাই পুলিশের একটা জিপে একজন অফিসার আর চারজন কনস্টেবল কখন যেন এসে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিনয় যখন ছাদে, খুব সম্ভব সেই সময় পুলিশের এই ছোট্ট বাহিনীটি এসে পজিশন নিয়েছিল।
সাড়ে নটা থেকে অতিথিরা আসতে শুরু করলেন। সুধেন্দু আর মণিলাল অনেক বছর কলকাতার খবরের কাগজে কাজ করছে। এই শহরের বহু বিখ্যাত মানুষকে চেনে। তারা বলছিল, ইনি ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, ইনি ওমুক কাগজের সম্পাদক, ইনি মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়ে ইংরেজ রাজত্বে পনেরো বছর জেল খেটেছেন, ইনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির নামকরা অধ্যাপক, ইত্যাদি। এঁদের অনেকের নাম বিনয়ের জানা, এই প্রথম তাদের স্বচক্ষে দেখল।
মণিলাল আর সুধেন্দু কখনও নিজেরাই অতিথিদের সঙ্গে করে সসমে ছাদে নিয়ে গিয়ে বসাচ্ছে, কখনও রমেন আর বিনয়কে দিয়ে ওপরে পাঠাচ্ছে।
দশটা যখন বাজতে চলেছে সেই সময় তারাপদ ভৌমিক, প্রসাদ লাহিড়ি আর আদিনাথ চক্রবর্তী ছাদ থেকে নিচে নেমে এলেন। সঙ্গে সেই কিশোরী ছাত্রীদের দঙ্গলটা। তারাপদ তোরণের দুধারে মেয়েদের লাইন দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পঁড় করিয়ে দিলেন।
ডাঃ রায় নতুন ভারত-এর অফিসে আসছেন, খবরটা হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তাকে দেখার জন্য চারদিক থেকে ঝাঁকে ঝাকে মানুষ এসে জড়ো হতে শুরু করেছে। রাস্তায়, ফুটপাথে রীতিমতো ভিড় জমে গেছে। তবে পুলিশ কারওকে তোরণের কাছাকাছি ঘেঁষতে দিচ্ছে না। লাঠি উঁচিয়ে হাঁকাহাঁকি করে জনতাকে তফাতে থাকতে বলছে।
কাঁটায় কাঁটায় দশটায় দুটো ফোর্ড গাড়ি তোরণের সামনে এসে থামে। একটা গাড়ি থেকে শশব্যস্তে নেমে আসেন জগদীশ গুহঠাকুরতা, ধবধবে ফর্সা মধ্যবয়সিনী একজন মহিলা এবং খুব সুশ্রী একটি তরুণী।
মহিলাটির সাজসজ্জায় এতটুকু বাড়াবাড়ি নেই। পরনে বুটিদার টাঙ্গাইল শাড়ি। দুহাতে শাখা পলা এবং সোনার কঙ্কণ। গলায় তেঁতুলপাতা হার। কপালে মস্ত বড় সিঁদুরের টিপ। শরীরে সামান্য মেদ জমেছে। ঘন কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে দুচারটে রূপোলি তার। মুখখানা ভারী কোমল। গৃহলক্ষ্মী বলতে চোখের সামনে যে স্নিগ্ধ ইমেজটা ফুঠে ওঠে, অবিকল তাই। তরুণীটির চোখেমুখে মহিলার আদল পুরোপুরি বসানো। তার চেহারা ছিপছিপে, মেদহীন। পরনে সিল্কের শাড়ি। চুল একবেণী করে পিঠের ওপর ফেলে রাখা। বাঁ হাতে সোনার ব্যাণ্ডে ঘড়ি আর গলায় সরু চেন ছাড়া বাড়তি গয়না টয়না নেই। দুই ভুরুর মধ্যিখানে ছোট মেরুন রঙের টিপ। দেখামাত্র আন্দাজ করা যায়–মা আর মেয়ে।
বিনয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল সুধেন্দু। কানে মুখ ঠেকিয়ে ফিস ফিস করে, জগদীশবাবুর স্ত্রী আর মেয়ে।
এমনটাই ভেবেছিল বিনয়। সে আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল।
এদিকে জগদীশ গুহঠাকুরতা দ্রুত অন্য গাড়িটার পেছনের দরজা খুলে দিয়ে হাতজোড় করে। বলেন, আসুন স্যার
গাড়ির ভেতর থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন তার ছবি খবরের কাগজের পয়লা পাতায় প্রায় রোজই থাকে। হয় কোনও অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন, বা প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন, কিংবা এয়ারপোর্টে বিদেশি কোনও রাষ্ট্রনায়ককে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। খুবই পরিচিত মুখ। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে সামনাসামনি এই প্রথম দেখল বিনয়। সতেজ, সটান, দীর্ঘ চেহারা। চুল বিরল হয়ে এসেছে। চওড়া কপাল। পরনে ধুতি, ফুলশার্টের ওপর কোট, পায়ে পাম্প শু।
ম্যাট্রিকুলেশনে বাংলা পাঠ্য বইতে কার একটা লেখায় শালপ্রাংশু মহাভুজ এই ওজনদার শব্দদুটো ছিল। হঠাৎ তা মনে পড়ে গেল বিনয়ের।
বিধান রায় সম্পর্কে রাজদিয়ায় থাকতে কত বিচিত্র কাহিনি শুনেছে সে। সেগুলো প্রায় রূপকথা। তার মতো ধন্বন্তরি ভূভারতে দ্বিতীয়টি নেই। যে রোগীকে সবাই খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে, বিন্দুমাত্র আশা ভরসা নেই, কোনওরকমে ধরে করে ডাঃ রায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারলে সে খাড়া হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলা, শুধু পূর্ব বাংলাই বা কেন, সারা ভারতবর্ষ থেকে মর মর রোগীদের নিয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনেরা তাঁর বাড়ির সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত। বেঁচে থাকতে থাকতেই তাকে নিয়ে কত লিজেণ্ড। সেই বিধানচন্দ্র শক্ত হাতে হাজার সমস্যায় ভেঙে-পড়া, ধ্বস্ত, বিপন্ন পশ্চিমবাংলার হাল ধরেছেন। পলকহীন তার দিকে তাকিয়ে আছে বিনয়। তার তাকানো, দাঁড়ানো, গম্ভীর মৃদু হাসি–সব কিছুর মধ্যে রয়েছে প্রখর ব্যক্তিত্ব।
