একটা তথ্য আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল বিনয়ের। একদা অখণ্ড বাংলার তিনভাগের এক ভাগ পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। আগে থেকেই জনসংখ্যার বিপুল চাপ ছিল। তার ওপর দেশভাগের পর পর এর মধ্যেই কুড়ি বাইশ লক্ষ মানুষ এসে পড়েছে। আসার বিরাম নেই। রিফিউজি স্পেশাল বোঝাই হয়ে বোজই আসছে। খুলনা আর যশোর থেকে পায়ে হেঁটে সড়ক ধরেও অনেকে আসছে দলে দলে। পশ্চিমবঙ্গের দিকে এই জনস্রোত কোনওদিন থামবে বলে মনে হয় না।
খণ্ডিত বাংলার এই অংশে এত মানুষের পাকাপাকি বাসস্থান কীভাবে হবে, ভেবে ভেবে তলকূল পায় না বিনয়। সেদিন শিয়ালদা সাউথ থেকে বেরিয়ে আসা মিছিলগুলোর ছবি তার মাথায় স্থির হয়ে আটকে আছে। যে-সব স্লোগান তারা দিচ্ছিল তা ভুলে যায়নি। বরং তাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। উদ্বাস্তুদের আশঙ্কা, তাদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানো হবে। একদিন এই নিয়ে প্রসাদ লাহিড়িকে প্রশ্নও করেছে। প্রসাদ বলেছিলেন, আসাম, ত্রিপুরা এবং বিহারের নানা জেলা ছিন্নমূল মানুষে ভরে গেছে। সব জায়গায় এর মধ্যেই গোলমাল শুরু হয়েছে। সানস অফ দা সয়েল অর্থাৎ স্থানীয় বাসিন্দারা চায় না আরও রিফিউজি সেখানে গিয়ে জুড়ে বসুক। প্রচণ্ড অসন্তোষ ওই তিন রাজ্যে দানা বাঁধছে। অবশ্য সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট ওড়িশা সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছে। ওড়িশায় যে নেটিভ স্টেটগুলো ভারতের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে এদেশের সঙ্গে মিশে গেছে, তারা কিছু উদ্বাস্তুকে জমি দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দিতে রাজি। তবে কবে শরণার্থীদের পাঠানো হবে তা এখনও ঠিক হয়নি। শুধু কথাবার্তার স্তরেই তা আটকে আছে।
বিনয় কখনও কখনও নিজের মনে ভেবেছে, ভারতবর্ষ তো বিশাল, দেশ। কত বড় বড় প্রদেশ এখানে। সেন্ট্রাল প্রভিন্স, বোম্বে প্রেসিডেন্সি, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি, কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি। এই প্রভিন্সগুলো খানিকটা খানিকটা উদ্ধৃত্ত জমি যদি বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য দিত, সমস্যার হয়তো একটা সুরাহা হয়ে যেত। প্রসাদকে এ-সব বলা হয়নি।
মিশন রোতে পুলিশের সঙ্গে উদ্বাস্তুদের সংঘাতের দৃশ্যই কদিন বারে বারেই বিনয়ের চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। এই সর্বস্ব খোয়ানো মানুষগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, ক্রোধ এবং প্রচণ্ড রোষের যে বাষ্প জমা হয়েছে সেদিন তার সামান্য একটু নমুনা দেখা গিয়েছিল। প্রসাদের অনুমানশক্তি প্রখর। তার ধারণা, উদ্বাস্তুদের ঠিকমতো পুনর্বাসন না হলে একদিন বিস্ফোরণ ঘটে যাবে। সেদিন তাদের যে হিংস্র চেহারা বিনয় দেখেছিল তাতে তার মনে হয়েছে, প্রসাদ ভবিষ্যতের ছবিটা নির্ভুল দেখতে পেয়েছেন।
.
৫০.
আজ পশ্চিমবঙ্গের প্রিমিয়ার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় নতুন ভারত পত্রিকার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। কর্তৃপক্ষ আগেই সার্কুলার জারি করেছিলেন, প্রতিটি কর্মী যেন সকাল নটার ভেতর অফিসে হাজির হয়।
ঘুম থেকে উঠে চান টান সেরে চা জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ল বিনয়।
সকালের দিকে অফিস টাইম শুরু হবার আগে অবধি কলকাতার রাস্তাটাস্তা মোটামুটি ফাঁকা থাকে। নটার একটু আগে আগেই তাদের অফিসে পৌঁছে গেল বিনয়।
শীতের শহরের ঘুম ভাঙে বেশ দেরি করে। তারপরও খানিকক্ষণ আলস্যে কেটে যায়। সেই সব পর্বের পর সবেমাত্র কিছু কিছু ব্যস্ততা শুরু হয়েছে।
নতুন ভারত-এর অফিসটাকে আজ আর চেনা যায় না। প্রথম যেদিন বিনয় আনন্দর সঙ্গে চাকরিতে জয়েন করতে এসেছিল তখন গোটা ছাদ জুড়ে বাঁশের ফ্রেম বাঁধার কাজ চলছে। এখন সেখানে ত্রিপল দিয়ে ঘিরে পুরোদস্তুর মস্ত একখানা প্যাণ্ডেল তৈরি হয়ে গেছে।
গোটা অফিস বিল্ডিংটা ঝেড়ে মুছে তকতকে ঝকঝকে করে তোলা হয়েছে। একতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত প্রতিটি সিঁড়ির দুধারে ফুলের টব। রাস্তায় গেটের সামনে ফুল আর পাতা দিয়ে তৈরি উঁচু তোরণ। কাল রাতে বিনয় যখন বাড়ি যায় এ-সব চোখে পড়েনি। সে আঁচ করে নিল, বাকি রাত এই সব সাজানো গোছানোর কাজ চলেছে। বাইরে তোরণের পাশে একটা উঁচু অস্থায়ী নহবতখানা বসানো হয়েছে। এক সানাইওলা তার অন্য বাজনদারদের নিয়ে একটানা বাজিয়ে চলেছে। হালকা নিচু সুরে।
সব মিলিয়ে পুরো অফিস জুড়ে তুমুল চাঞ্চল্য। উৎসব উৎসব ভাব। ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বিনয়ের চোখে পড়ল, কম্পোজিটর থেকে শুরু করে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের কর্মী, মেশিনম্যান, সাংবাদিক, কেউ বাকি নেই। সবাই তটস্থ ভঙ্গিতে থোকায় থোকায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ খুব নিচু গলায় কথা বলছে।
অফিসে জয়েন করার পর ছাদে কখনও আসেনি বিনয়। আজই প্রথম উঠল।
প্যাণ্ডেলের খুঁটিগুলো লাল নীল কাপড়ে মোড়া। সেগুলোর গায়ে ফুলের স্তবক আটকানো। একেবারে শেষ প্রান্তে উঁচু মঞ্চ। সেটার মাথায় সাটিনের চাদোয়া। পুরো মঞ্চটা প্রচুর ফুল লতাপাতা দিয়ে সাজানো। মঞ্চের সামনের দিকে সারি সারি চেয়ার পাতা। বোঝাই যায় সেগুলো বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট।
প্যাণ্ডেলের একধারে লাল-পাড় ধবধবে শাড়ি পরা পনেরো কুড়িটি কিশোরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। মনে হয় এই এলাকার কোনও স্কুলের ছাত্রী। তাদের কারও হাতে পেতলের রেকাবিতে প্রচুর ঝুরো ফুল। কারও হাতে শাঁখ। এই মেয়েরা কী করবে, এখানে তাদের ভূমিকাটা কীসের, সঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
