বিনয় যা বলেছে তার বেশিটাই সত্যি। বাকিটা আধা-সত্যি। সত্যি-মিথ্যে নিপুণভাবে মেশানো হয়েছে। আগরপাড়ায় মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কলোনি এবং অন্য একটা নামকরণ না-হওয়া কলোনিতে যে গিয়েছিল তা পুরোপুরি বাদ দিয়েছে। কারণ তাকে কলকাতার দক্ষিণ দিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রিফিউজি কলোনি আর ক্যাম্পগুলোতে যেতে বলা হয়েছিল। আগরপাড়ার কথা জানালে কেন সে উত্তর দিকের ওই এলাকায় গিয়েছিল, এই নিয়ে অনেক জবাবদিহি করতে হবে।
বিনয় যে মিশন রোতে গিয়েছিল তা শুনে খুশি হয়েছেন তারাপদ। তাঁর মুখ নরম দেখায়। বিনয়ের পিঠে হাত রেখে বললেন, খুব ভাল কাজ করেছ। সাংবাদিকদের সবসময় চোখকান খোলা রাখতে হয়।
প্রসাদও বিনয়কে যথেষ্ট তারিফ করলেন, দেখা যাচ্ছে যোগ্য লোককেই রিফিউজিদের সম্পর্কে অ্যাসাইমেন্ট দেওয়া হয়েছে। আই অ্যাম হ্যাপি
তারাপদ আর বসলেন না। তোমরা কাজ কর। আমি চলি। নিজের কামরার দিকে চলে গেলেন তিনি।
যে সাব-এডিটর আর চিফ সাবরা এসেছিল তারাও একে একে উঠে পড়ে।
বিনয় আন্দাজ করে নিল, রিফিউজি আর পুলিশের যে বড় আকারের সংঘর্ষটা আজ হয়েছে সে ব্যাপারে খবর নিতেই তারাপদরা রিপোর্টিং সেকশানে এসেছিলেন। কথায় কথায় তার প্রসঙ্গ উঠেছিল। কেননা উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে যাবতীয় দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছে। নতুন ভারত এখনও বেরোয়নি ঠিকই, তবু আজ এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে, তার প্রতিবেদন লিখে রাখা জরুরি। ভবিষ্যতে হয়তো কাজে লাগবে। কিন্তু বিনয় অফিসে নেই, অন্য রিপোর্টাররাও বেরিয়ে গেছে, তাই মিশন রোতে কারওকে পাঠানো যায়নি। প্রসাধ্যার রাগের কারণ সেটাই। যাই হোক, বিনয় যে অপদার্থ নয়, নিজের অ্যাসাইনমেন্ট সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ, তা প্রমাণ করা গেছে।
প্রসাদ কিছু ভাবছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে বিনয়।
কেন? বিনয় তার মুখের দিকে তাকায়।
রিফিউজিরা এতদিন ভয়ে ভয়ে মুখ বুজে ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ জমা হয়ে আছে। আজ তার বড়রকমের একটা আউটবাঘটেছে। এটাই কিন্তু শুরু। যদি তাড়াতাড়ি ওদের রিহ্যাবিলিটেশনের উপযুক্ত বন্দোবস্ত না করা হয়, অ্যাজিটেশন ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। সারা ওয়েস্ট বেঙ্গল জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে। একটু চুপ করে থেকে বললেন, কতদিন আর এইসব মানুষ ক্যাম্পে ক্যাম্পে, স্টেশন চত্বরে পশুর মতো জীবনযাপন করবে?
.
৪৯.
আরও সপ্তাহখানেক কেটে গেছে। আর ঠিক চারদিন পর নতুন ভারত বাজারে বেরিয়ে যাবে। এই সাতদিনের মধ্যে একটা রবিবার পাওয়া গিয়েছিল। সেদিন ফোন করে আনন্দ আর সুনীতিকে টালিগঞ্জে সুধাদের বাড়িতে আনিয়েছে বিনয়। ভবানীপুরের বাড়ি বিক্রির ঋণ শোধ করে যে টাকাটা বেঁচেছে, অবনীমোহন তার তিন ছেলেমেয়ের নামে ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়েছেন। শেষ যেবার বিনয় বিমল গাঙ্গুলিদের বাড়ি যায় সেদিনই স্থির করেছিল তার ভাগের টাকাটা রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের দেবে। একের পর এক ঘটনায় সে থই পাচ্ছিল না। তাই মনে মনে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল তা পূরণ করা হয় নি। কিন্তু ওটা আর ফেলে রাখা যায় না।
সুধা সুনীতিরা রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের কথা ভাল করেই জানে। বিনয় তার ভাগের টাকা ওদের দিতে চায় শুনে কেউ আপত্তি করেনি। এমনকি দরকার হলে তারাও নিজেদের টাকাটা দিতে চেয়েছে। আপাতত একটা চেক লিখে হিরণকে দেওয়া হয়েছিল। বিনয়ের ভাগের এগারো হাজার টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে সুধার কাছে রাখা আছে। নতুন ভারত বেরুবার পর টাকাটা সে রামরতনের স্ত্রীর হাতে দিয়ে আসবে। এমনটাই ভেবে রেখেছে।
এই সাতদিনে রবিবারটা বাদ দিলে যে অ্যাসাইনমেন্ট তাকে দেওয়া হয়েছে, বিপুল উদ্যমে তা করে চলেছে বিনয়। সকালে উঠেই চান সেরে চা খেয়ে রোজ সে চলে গেছে একটা করে ত্রাণশিবির বা কলোনিতে। পাশাপাশি ঝিনুকের খোঁজ তো চলছেই।
এর ভেতর একদিন প্রসাদ লাহিড়ি তাকে গভর্নমেন্টের উদ্বাস্তু ত্রাণ বিভাগে পাঠিয়েছিলেন। এই বিভাগটা আপাতত দেখছেন মন্ত্রী নিকুঞ্জ বিহারী মাইতি। রিলিফ ডিপার্টমেন্টের অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের কাছ থেকে নানা তথ্য জোগাড় করে জবরদখল কলোনি আর রিলিফ ক্যাম্পগুলো সম্পর্কে মোটামুটি ভালই ধারণা হয়েছে বিনয়ের। এতদিন তার জানাটা তত ব্যাপক ছিল না।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় কলকাতায় তো বটেই, সারা বাংলা জুড়েই প্রচুর মিলিটারি ব্যারাক খাড়া করা হয়েছিল। প্লেন ওঠা-নামার জন্য তৈরি হয়েছিল লম্বা লম্বা কংক্রিটের রানওয়ে। যুদ্ধের পর সেগুলো পোডড়া অবস্থায় ছিল। রাতারাতি রানওয়েগুলোর ধারে নতুন নতুন শেড বানানো হয়েছে। এগুলো হল উদ্বাস্তুদের ত্রাণশিবির। সাময়িক আশ্রয়স্থল। কলকাতার লেক অঞ্চল, নিউ আলিপুর, বিজয়গড়, ব্যারাকপুর, বেহালা ইত্যাদি এলাকা ছাড়াও বনগাঁ লাইনের দুধারে পাকিস্তানের বর্ডার অবধি কত যে রিলিফ ক্যাম্প খোলা হয়েছে তার লেখাজোখা নেই। শুধু কলকাতাকে ঘিরেই না, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, মালদা, দিনাজপুর এবং ওদিকের ইস্ট পাকিস্তানের বর্ডার ঘেঁষেও রিলিফ ক্যাম্পের ছড়াছড়ি। হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষকে সেখানে তোলা হয়েছে। শুধু সরকারের একার পক্ষে এত বড় দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্, মানোয়াড়ি রিলিফ সোসাইটি ইত্যাদি নানা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ত্রাণের কাজ করে চলেছে। দিবারাত্রি। ক্লান্তিহীন। এখন পর্যন্ত রিলিফ ক্যাম্পের যে সংখ্যাটি পাওয়া গেছে তা হল এক শ এগার। জবরদখল কলোনির কোনও হিসেব নেই। কলকাতার ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত বড় বড় জমিদার বাড়ি, আদ্যিকালের জনহীন, জঙ্গলে ছেয়ে যাওয়া বিশাল বিশাল ইমারত কিছু বাকি নেই। উদ্বাস্তুরা সর্বত্র জুড়ে বসছে। যশোর রোড, বি.টি. রোডের ধারের বাগানবাড়ি, পোডড়া জমি, নিচু জলা-ফাঁকা জায়গা পেলেই ঝাঁকে ঝকে উদ্বাস্তুরা দখল করে নিচ্ছে। মাথা তুলছে বাঁশের বেড়া আর টালি বা টিনের চালের সৃষ্টিছাড়া উপনিবেশ। সারা পশ্চিমবঙ্গ যেন এক বিশাল শরণার্থী শিবির এবং উদ্বাস্তু কলোনি। এতেও সবার জায়গা হয়নি। শিয়ালদা এবং কলকাতার আশেপাশের রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলোতে তো বটেই, নদীয়ায় মালদায় দিনাজপুরে চব্বিশ পরগনায় কত মানুষ যে খোলা আকাশের নিচে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রোদে পুড়ে, অঝোর বর্ষায় ভিজে বা হিমঋতুর অসহ্য ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে অবধারিত মৃত্যুর দিন গুনে চলেছে তাদের সংখ্যা কী বিরাট, কে জানে।
