বিনয় সরু, চাপা গলিটার মুখ অবধি যায়নি; মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছিল।
সন্ধে নেমে গেছে। হঠাৎ একসময় শতিনেক মারমুখি উদ্বাস্তু এবং তাদের সঙ্গী পার্টির ছেলেরা পুলিশবহ ভেদ করার শেষ মরিয়া একটা চেষ্টা করে। পুলিশও তাদের রাইটার্সে যেতে দেবে না, রে রে করে উদ্বাস্তুদের ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে তিন চার জন কনস্টেবল টিয়ার গ্যাস শেল ফাটাতে থাকে। চারদিক চকিত করে শব্দ ওঠে-বুমবুমবুম। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে শীতের বাতাসে। লাঠির ঘায়ে উদ্বাস্তুদের অনেকেরই হাত-পা ভেঙে যায়। কারও কারও মাথা মুখ ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। অনেকে রাস্তায় আছড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে। পুলিশও রেহাই পায়নি। খোয়া আর ইটের ঘায়ে তাদেরও কয়েকজনের কপাল কি থুতনি থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে।
অনেকক্ষণ লড়াইয়ের পর বিধ্বস্ত উদ্বাস্তুরা এবার ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে লাগল। পুলিশের মাথায় খুন চড়ে গিয়েছিল। তারা উদ্বাস্তুদের ঘাড় ধরে, কারওকে বা টেনে হেঁচড়ে কালো ভ্যানগুলোতে তুলতে থাকে। পার্টির লোকদেরও নিস্তার নেই। পুলিশ তাদেরও ছাড়েনি। প্রায় শখানেক আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হল।
বিনয় যে ঘুপচি গলিটায় রয়েছে, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া হাওয়ায় হাওয়ায় সেখানে ঢুকে পড়েছে। চোখ ভীষণ জ্বালা জ্বালা করছিল তার।
মিশন রো দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। পুলিশ যাকে পেরেছে তাকে তো ধরছেই, যে উদ্বাস্তুরা চোট খেয়ে রাস্তায় পড়েছিল, এখন তাদের চ্যাংদোলা করে ভ্যানে পুরে ফেলছে।
শীতের সন্ধে আর কতক্ষণ? ঝপ করে রাত নেমে এল। কতজন উদ্বাস্তু আর পলিটিক্যাল ওয়ার্কারকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কতজন জখম হয়েছে, তা মোটামুটি আন্দাজ করেছে বিনয়। সঠিক সংখ্যাটা ওই হুলস্থূলের মধ্যে জানতে পারেনি। সে আনকোরা প্রতিবেদক। কীভাবে জানা সম্ভব তার ধারণা নেই। এই নির্জন অন্ধকার সরু গলিতে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। যেদিক দিয়ে সে এসেছিল সেই পথেই ওয়েলিংটনের দিকে মিশন রোর অন্যপ্রান্তে চলে এল। এখন এই রাস্তা দিয়ে শ্যামবাজার রুটের ট্রাম বাস চলতে শুরু করেছে। তবে খুব বেশি নয়, মাঝে মাঝে দু-একটা।
একটা আধাআধি ফাঁকা ট্রামে উঠে পড়ল বিনয়। মিনিট পনেরোর ভেতর বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিংয়ে নেমে বাকি পথটা হেঁটে অফিসে পৌঁছে গেল।
.
নতুন ভারত-এর নিউজ ডিপার্টমেন্টের এক কোণে রিপোর্টিং সেকশানে রীতিমতো হইচই চলছিল। চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি রোজ যেমন থাকেন তেমনই রয়েছেন। অন্য রিপোর্টাররাও আছে। আজ নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক তার কামরা ছেড়ে ওখানে এসে বসেছেন। বেশ কজন সাব-এডিটর এবং চিফ সাবকেও সেখানে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিন এমনটা দেখা যায় না।
তেতলায় নিউজ ডিপার্টমেন্টে ঢুকে নিজের সেকশানের দিকে যেতে যেতে বিনয় ভাবল, অন্য বিভাগের সাংবাদিকরা মাঝে মাঝেই তাদের সেকশানে আসে। কিন্তু নিউজ এডিটরকে কখনও ওখানে দেখেনি সে। কী এমন হতে পারে যাতে তিনিও চলে এসেছেন!
উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন প্রসাদ, হঠাৎ বিনয়কে দেখে তার কপাল কুঁচকে গেল। গলার স্বর অনেক উঁচুতে তুলে প্রায় চিৎকার করে তাকে বললেন, কটায় ডিউটি তোমার? এখন কটা বাজে? আঙুল তুলে বার্তা বিভাগের বিশাল ওয়ালক্লকটা দেখিয়ে দিলেন।
বিনয় দেখল, আটটা বেজে সতেরো। সে কৈফিয়ৎ দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই ফের চেঁচিয়ে উঠলেন প্রসাদ, জানো আজ কী ঘটেছে? তোমাকে রিফিউজিদের সমস্ত ব্যাপারটা কভার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ তোমার অফিসে আসার কথা দুটোয় আর তুমি এলে কি না এত রাত করে! এদিকে বিকেলে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে পুলিশের বিরাট ক্ল্যাশ হয়ে গেছে। অন্য রিপোর্টারদের যে পাঠাব তার উপায় নেই। তারা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বেরিয়ে গেছে। কী যে করব
তাকে থামিয়ে দিয়ে তারাপদ বলেন, আজই প্রথম উদ্বাস্তুদের ওপর এত বড় আকারে লাঠি আর টিয়ার গ্যাস চলেছে। আমাদের কাগজ না হয় এখনও বেরোয়নি, কিন্তু চালু থাকলে অবস্থাটা কী দাঁড়াত, ভাবতে পার? ওয়েস্ট বেঙ্গলের সবচেয়ে জ্বলন্ত সমস্যা যাদের নিয়ে তাদের এত বড় একটা ঘটনা কীভাবে আমরা ছাপতাম?
অনন্ত দুঃসাহসে বিনয় তারাপদদের কথার ফাঁকে বলে ওঠে, আপনারা কি মিশন রোর ঘটনাটার কথা বলছেন? আমি সোজা সেখান থেকেই আসছি।
কিছুক্ষণ একেবারে চুপ হয়ে রইলেন তারাপদ। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওখানে গেলে কী করে? এমন একটা ব্যাপার ঘটবে, তা কি জানতে?
বিনয় জানায়, প্রসাদ তাকে রোজ একটা করে উদ্বাস্তু কলোনি বা ক্যাম্পে গিয়ে সে-সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করে একটি করে প্রতিবেদন তৈরি করতে বলেছেন। সেই মতো আজ গড়িয়ার ওধারে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে গিয়েছিল। সেখান থেকে কাজ সেরে একটা দরকারে কলেজ স্ট্রিটে আসে। তখন বিকেল। চোখে পড়ে সিনেট হলের সামনে বেশ কিছু পুলিশ রয়েছে। ট্রামবাস বন্ধ। খবর নিয়ে জানতে পারে, ওয়েলিংটনে উদ্বাস্তুরা মিটিং সেরে রাইটার্সে গেছে, বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে দাবিপত্র জমা দেবার জন্য। শোনামাত্র সেখানে চলে যায় বিনয়, তারপর যা ঘটেছে তার সবিস্তার বিবরণ দিয়ে গেল।
