বিনয় জানতে চাইল, গুলিতে কতজন মারা গেছে, কত জন জখম হয়েছে, জানেন?
যেখানে কুরুক্ষেত্র চলছে সেখানে কি আমরা গেছি! কী করে বলব? তবে বুম বুম শব্দ হচ্ছিল। গুলি না চললে কি ওরকম আওয়াজ হয়? গুলি চললে মানুষ মরবে, সব্বাই তা জানে। তা পাঁচ সাতজন কি আর মরেনি?
বিনয় আর কোনও প্রশ্ন করল না। মিশন রোর দিকে পা বাড়ালো। ঘটনাস্থলের এত কাছাকাছি চলে এসেছে। নিজের চোখে না দেখলে হয়? হাজার হোক, সে একজন সাংবাদিক।
পুরো জটলাট্টা উৎকণ্ঠায় হাঁ হাঁ করে ওঠে। যাবেন না, যাবেন না। ভীষণ বিপদে পড়বেন।
বিনয় ফিরেও তাকাল না। মিশন রোর এ-মাথায় যেখানে এক দঙ্গল পুলিশ আর পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে চলে এল। মোড় ঘুরে সে যখন মিশন রোতে ঢুকতে যাচ্ছে, একজন মাঝবয়সী, মজবুত চেহারার পুলিশ অফিসার লম্বা লম্বা পা ফেলে তার সামনে চলে এলেন। ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছেন ওদিকে?
আচমকা সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া প্রেস কার্ডটার কথা মনে পড়ে গেল। সেটা সারাক্ষণ বিনয়ের সঙ্গে থাকে। ওটা ছাড়া বহু জায়গায় ঢোকা বা বেরুনো যায় না। কার্ডটা বার করে অফিসারকে দেখাতে দেখাতে বলল, আমি নতুন-ভারত-এর রিপোর্টার। কাগজটা খুব শিগগির বেরুবে। এখন পুলিশের সঙ্গে রিফিউজিদের যে ক্ল্যাশটা চলছে তা আমি দেখতে চাই। একটা রিপোর্ট লিখতে হবে।
দূরে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউর ওধার থেকে তুমুল হইচই, চিৎকার ভেসে আসছে। যদিও রাস্তার এবং দুপাশের অফিস বিল্ডিংগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে, শীতের এই সন্ধেয় গাঢ় কুয়াশার জন্য কোনও কিছুই খুব স্পষ্ট নয়। তবু ঝাপসা ছবির মতো দেখা যাচ্ছে বহু লোক উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়চ্ছে। চোখে পড়ছে অজস্র আর্মড পুলিশ, সার্জেন্ট, পুলিশ অফিসার। তারাও এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করছে। কালো রঙের কত যে পুলিশ ভ্যান আর জিপ রাস্তা আড়াআড়ি আটকে দাঁড় করানো রয়েছে। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে অফিসার বললেন, দেখছেন তো। ওই গোলমালের ভেতর না যাওয়াই ভাল। খুব রিস্কি হয়ে যাবে।
অফিসারের বাইরেটা রুক্ষ, গম্ভীর হলেও ভেতরটা বেশ নরম ধরনের। তিনি চান না বিনয় হাঙ্গামার মধ্যে গিয়ে বিপদে পড়ুক।
সাংবাদিক হিসেবে বিনয় একেবারেই আনকোরা। আগে কখনও এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েনি। অফিসারের মুখের ওপর বলতে পারল না, বিপজ্জনক যে কোনও ঘটনা ঘটলে একজন সাংবাদিককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। তাতে যত ঝুঁকিই থাক না।
চারদিক দ্রুত দেখে নিল বিনয়। এই এলাকা তার খুব ভাল করে চেনা। কেননা ঝিনুকের খোঁজে কলকাতার উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম, কোনও অঞ্চলই সে বাদ দেয়নি। প্রতিটি গলিখুঁজিতে হানা দিয়েছে।
মিশন রোর এই প্রান্তের ডান ধারে একতলা পুরনো একটা বিল্ডিংয়ে কর্পোরেশনের প্রাইমারি স্কুল। সেটার পেছন দিয়ে একটা গলি মিশন রোর পাশাপাশি এঁকেবেঁকে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ অবধি চলে গেছে। এই গলি থেকে পঞ্চাশ ষাট ফিট পর পর একটা করে ফ্যাকড়া মিশন রোতে গিয়ে ঠেকেছে। বিনয় মনস্থির করে ফেলল, প্রাইমারি স্কুলের পেছনের গলিটা ধরে এগিয়ে যাবে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হলে আরও দুতিনটে গলি মিশন বোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লালবাজারের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। সেখান থেকে রাইটার্স আর কতটুকু। একরাতে ওখানে যেতে পারলে সুযোগমতো কোনও একটা ফ্যাকড়া দিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উঠবে। সে আর দাঁড়াল না। নিঃশব্দে গলিটায় ঢুকে পড়ল।
সরু রাস্তাটার বাঁদিকে লাইন দিয়ে উঁচু উঁচু সব অফিস বিল্ডিংয়ের আড়াল। খানিকটা পর পর গলিটা থেকে আরও সরু সরু যে-সব পথ মিশন রোতে গিয়ে পড়েছে সেই ফাঁক দিয়ে ওধারের দৃশ্য চোখে পড়ছে। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউর এদিকটায় তেমন কিছু নেই, সব ফাঁকা ফাঁকা। কিন্তু ওধারে খানিকটা এগুতেই চোখে পড়ল–বিশাল রণক্ষেত্র। রাস্তা সারাইয়ের জন্য এখানে ওখানে প্রচুর খোয়া আর স্টোন চিপ ডাঁই করে রাখা হয়েছে। উদ্বাস্তু আর তাদের সঙ্গী পার্টির ছেলেরা পুলিশের দিকে তাক করে করে খোয়া ছুড়ছে। তাদের চোখমুখের চেহারা বেপরোয়া, হিংস্র। দাঁতে দাঁত চাপা ক্রোধ ফুটে বেরুচ্ছে লোকগুলোর ছোটাছুটিতে, পাথর ছোঁড়ার ভঙ্গিতে। সীমান্তের এপারে পা রাখার পর উদ্বাস্তুদের কীরকম দেখে আসছে বিনয়? একেবারে জড়সড়, এস্ত, ভীরু, উৎকণ্ঠায় দিশেহারা। কিন্তু শীতের সন্ধেয় এই ছিন্নমূল মানুষগুলোকে চেনাই যায় না। তারা যেন আমূল বদলে গেছে।
খোয়া তো ছুড়ছেই, মাঝে মাঝেই উদ্বাস্তুরা পুলিশের বেষ্টনী ভেঙে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দিকে যাবার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে চলছে তুমুল চিৎকার। পুলিশ তৈরিই আছে। তারা লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে তাদের হটিয়ে দিচ্ছে। উদ্বাস্তুরা বেগতিক বুঝলেই রাস্তার দুধারের গলিঘুজিতে ঢুকে পড়ছে। পুলিশ একটু দূরে সরে গেলেই তারা ফের বেরিয়ে এসে খোয়া, পাথর ছুঁড়তে থাকে। বিনয় বারতিনেক পুলিশ এবং রিফিউজিদের এই মহড়া দেখল। সেই বিকেল থেকে নিশ্চয়ই এমনটা অনেকবার হয়ে চলেছে।
মিশন রোর ফুটপাথের ধারে প্রচুর প্রাইভেট কার। তার বেশ কয়েকটা ভেঙেচুরে গেছে। পুলিশের তিন চারটে জিপের হেডলাইট, জানালা চুরমার, মাডগার্ড তোবড়ানো। অজস্র কাঁচের টুকরো, ইট, খোয়া রাস্তাময় ছড়িয়ে আছে।
