বহুদিন ধরে বিনয়ের যা মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে ফের তা মনে পড়ে যায়। সে এমন এক গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে যার আদি-অন্ত নেই। সে খুঁজে বেড়াচ্ছে ঝিনুককে, ঝুমা ছুটছে তার পিছু পিছু। কতকাল যে চক্রাকারে এই দৌড় চলবে, কে জানে। হয়তো যুগ যুগান্ত, হয়তো আমৃত্যু।
কখন যেন শিবু ডিমের ডেভিল দিয়ে গিয়েছিল। সেটা জুড়িয়ে গেছে। এদিকে ঝুমার গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরছিল। তার খাওয়ার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে গেছে।
পর্দা সরিয়ে শিবু উঁকি মারল, দিদি, আর কী আনব? সে জানে কেবিনে যে যুবক যুবতীরা জোড়ায় জোড়ায় এসে বসে তারা একসঙ্গে সব খাবারের অর্ডার দেয় না। একটা খাওয়া হলে নতুন অর্ডার। অর্থাৎ কেবিনের ভেতর পর্দার আড়ালে যতটা বেশি সময় কাটানো যায় আর কি।
চকিতে রুমালে চোখ মুছে ঝুমা বলল, না, আর কিছু দরকার নেই। তুমি বিল নিয়ে এস।
শিবু অবাক হল। খাবার ফেলে রেখে হুট করে চলে যেতে চায়, এমন খদ্দের আগে সে আর দেখেনি। এক লহমা ঝুমাকে দেখে আচ্ছা বলে অদৃশ্য হল।
ধরা ধরা গলায় ঝুমা বিনয়কে বলল, তুমি খেয়ে নাও
খাওয়ার স্পৃহা বিনয়েরও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সে বলে, না, থাক।
ঝুমা জোর করল না।
একসময় বিল মিটিয়ে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়ে। দুপ্লেট ডেভিল অজন্তা কেবিন-এ পড়ে থাকে।
সন্ধে নামতে এখনও খানিক বাকি। তবু এর মধ্যে চারপাশের রাস্তাঘাট, দোকানপাট আর বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে।
কলেজ স্ট্রিট থেকে অলিগলির ভেতর দিয়ে ঘুরপথে বিনয়রা অজন্তা কেবিন-এ এসেছিল। এবার ঝুমা আমহার্স্ট স্ট্রিট দিয়ে হ্যারিসন রোডে চলে আসে। তারপর সোজা কলেজ স্ট্রিটের মোড়। সারা পথ তারা কেউ একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ দূরমনস্কর মতো হেঁটে এসেছে।
হঠাৎ সেই মিছিলগুলোর কথা মনে পড়ে যায় বিনয়ের। না, তার চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু আবহাওয়া কেমন যেন থমথমে। এসপ্ল্যানেড থেকে শ্যামবাজার কি বেলগাছিয়া রুটের কোনও বাস ট্রাম চলছে না। অন্য যানবাহন চলাচলও বন্ধ। তবে বড়বাজারের দিক থেকে হাওড়া আর হাইকোর্ট রুটের ট্রাম বা বাস এসে কলেজ স্ট্রিটের মোড় ঘুরে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট হয়ে শ্যামবাজারের দিকে যাতায়াত করছে। এই রুটটা খোলা।
বিনয় চকিতে ভেবে নিল, মিছিলগুলো যেখানে গেছে অর্থাৎ ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গিয়ে খোঁজখবর নেবে। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানিয়ে দেয়, কিছু একটা ঘটেছে। নইলে ওধারের ট্রাম বাস বন্ধ হতো না। সে ঝুমাকে বলল, তুমি বাড়ি চলে যাও।
ঝুমা অবাক হল।–আর তুমি? অফিসে যাবে না? হাইকোর্ট-শ্যামবাজারের ট্রাম ধরে একসঙ্গে বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিং অবধি যাওয়া যেত।
আমি এখন অফিসে যাব না। তুমি আর দাঁড়িও না। সন্ধে হয়ে যাচ্ছে বলে ঝুমাকে আর কিছু বলার সময় না দিয়ে কলেজ স্ট্রিটে ঢুকে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
.
৪৮.
রাস্তাটা প্রায় সুনসান। লোকজন নেই বললেই হয়। ডানপাশে প্রেসিডেন্সি কলেজে আলো জ্বলেনি। আবছা, ভৌতিক চেহারা নিয়ে বিশাল ইমারতটা দাঁড়িয়ে আছে। বাঁদিকে সারি সারি বইয়ের দোকান দাশগুপ্ত অ্যাণ্ড কোং, কমলা বুক ডিপো, চক্রবর্তী চ্যাটার্জি, ইউ এন ধর–সব বন্ধ। এখানে খোলা ফুটপাথে যারা পুরোনো বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে তাদের কেউ নেই।
ফাঁকা ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলেছে বিনয়, একদিকে হিন্দু স্কুল, সংস্কৃত কলেজ, কলেজ স্কোয়ারের সুইমিং পুল, অন্যদিকে হেয়ার স্কুল, সেনেট হল, মেডিক্যাল কলেজ টলেজ পেরিয়ে বউবাজার ছাড়িয়ে এগুতে এগুতে এবার কিছু মানুষ চোখে পড়ছে। বাড়ি বা দোকান টোকানের দরজার পাল্লা আধাআধি খুলে তারা দাঁড়িয়ে আছে। বড় রাস্তা থেকে দুধারে অগুনতি গলি ভেতর দিকে অনেকদূর চলে গেছে। সেগুলোর মোড়ে মোড়ে ঘোট ঘোট জটলা। যারা জড়ো হয়েছে তাদের চোখে মুখে শঙ্কা, উত্তেজনা। সবাই দূরে মিশন রোর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কী যেন বলাবলি করছে।
বিনয় মিশন রোর দিকটায় তাকায়। সেখানে প্রচুর পুলিশ। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে যায়। থমকে কয়েক লহমা দাঁড়িয়ে পড়ে সে। তারপর একটা জটলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ওখানে কী হয়েছে বলুন তো? এত পুলিশ!
একজন চাপা উত্তেজনার সুরে বলল, মিশন রোর ও-মাথায় রিফিউজিদের সঙ্গে পুলিশের ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। লাঠি গুলি-টুলি চলছে।
বিনয় চমকে ওঠে।হঠাৎ কী হল, যাতে তার কথা শেষ হতে না-হতেই আর-একজন জানায় দুপুর থেকে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একটার পর একটা মিছিল এসে জড়ো হচ্ছিল। বেলা একটু পড়লে ওখানে মিটিং হয়। তারপর ফের মিছিল করে স্লোগান দিতে দিতে ওরা মিশন রো ধরে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দিকে যেতে থাকে। কিন্তু পুলিশের বিরাট একটা বাহিনী রাইটার্সে পৌঁছবার আগে তাদের আটকে দেয়। রিফিউজিরা যাবেই। এই নিয়ে প্রথমে তর্কাতর্কি, বচসা। তারপর তুমুল হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়। এখনও সেটা পুরোদমে চলছে। আর তারই জেরে এই অঞ্চলের অফিস, দোকানপাট, গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ হয়ে গেছে। কতক্ষণ এই ধুন্ধুমার চলবে, কে জানে। লোকটা বলতে লাগল, স্বাধীনতার আগে আগে সেই রশিদ আলি ডেতে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের লড়াই হয়েছিল এই মিশন রো এলাকায়। রামেশ্বর আর কটা ছেলে গুলি খেয়ে মরল। তারপর রিফিউজিদের সঙ্গে আজকের এই হুজুৎ। অবশ্য দুটো লড়াই দুরকমের।
