ঝুমা বলে, দশটায় ভাত খেয়ে কলেজে গিয়েছিলাম। ছুটির পর বাড়ি যাইনি। ভীষণ খিদে পেয়েছে। ছুরি দিয়ে কাটলেটের একটা টুকরো কেটে মুখে পোরে সে।
নিঃশব্দে কিছুক্ষণ খাওয়ার পর ঝুমা বলে, বাবা বলছিল, তোমার জন্যে একটা ভাল চাকরির ব্যবস্থা করেছেন।
সেদিন সুধাদের বাড়ি গিয়ে ঠিক এই কথাই জানিয়ে এসেছিলেন শিশির। নামকরা ব্রিটিশ ফার্মে লোভনীয় চাকরি। নতুন ভারত-এ যে টাকায় বিনয় ঢুকছে ওখানে শুরুতেই তার চার-পাঁচ গুণ। সে যদি সেখানে জয়েন করে তার ভবিষ্যৎ খুবই ঝলমলে। শিশিরের সুপারিশে তাঁর বন্ধু এমন একটা লম্বা সিঁড়ি বিনয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবেন যার মাথা আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। তর তর করে বিনয়ের শুধু ওপরে, আরও ওপরে, আরও আরও ওপরে উঠে যাওয়া। স্বপ্নের এমনই একটা রঙিন, নিখুঁত ছবি সেদিনই সামনে-পেছনে-ডাইনে-বাঁয়ে টাঙিয়ে দিয়ে এসেছিলেন শিশির।
বিনয় ঝুমার কথার উত্তর দেয় না।
ঝুমা বলতে লাগল, পরে সুধাদির কাছে শুনলাম তুমি বাবার দেওয়া চাকরিটা নিতে চাও না।
বিনয় এবারও চুপ। ঝুমাকে দেখার পর নেশার ঘোর যেমন ছিল, অন্তর্নিহিত একটু অস্বস্তিও বুকের ভেতর চিন চিন করছিল, সেটা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ঝুমা অধীর স্বরে জিজ্ঞেস করে, কেন–কেন নিতে চাও না? বাবার অপরাধটা কী?
বিব্রত মুখে বিনয় বলে, কোনও অপরাধ নেই। কিন্তু, কিন্তু হঠাৎ থেমে যায় সে।
কিন্তু কী?
কেউ অনুগ্রহ করছেন, এটা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। নিজের যোগ্যতায় যেটুকু হয় তাতেই আমি খুশি। চোখকান বুজে সরল সত্যটাই বলে ফেলে বিনয়।
খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ঝুমার। চোখের দৃষ্টি স্থির। চাপা গলায় বলল, আত্মসম্মানে আটকাচ্ছে? তাহলে আনন্দমামার রেকমেণ্ডেশনে কাগজের চাকরিটা নিলে কী করে? তখন মর্যাদাবোধে বাধেনি? তার কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ ফুটে বেরোয়।
বিনয় চমকে ওঠে। আক্রমণটা এমন একটা দিক থেকে আসতে পারে, কে জানতো? সে হকচকিয়ে যায়। সামলে উঠতে একটু সময় লাগে। তারপর বলে, আনন্দদা যোগাযোগটা করে দিয়েছিল ঠিকই। আমি কিন্তু রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে ওখানে ঢুকেছি। তাছাড়া —
তাছাড়া কী?
আমার চাকরির পেছনে আনন্দদার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।
ঝুমার সারা শরীরে তড়িৎপ্রবাহ খেলে যায়। চোখমুখ আঁ আঁ করতে থাকে। সে কিন্তু ক্ষোভে, রাগে বা উত্তেজনায় ফেটে পড়ে না। নিজের স্নায়ুমণ্ডলী নিয়ন্ত্রণে রেখে শান্ত গলায় বলে, ঠিকই বলেছ। আনন্দমামার না থাকলেও আমার বাবার উদ্দেশ্য আছে, স্বার্থও আছে। কেন তিনি তোমাকে লাইফে এস্টাব্লিশড করতে চান, আর আমি কী চাই, তুমি বোঝো না? শেষ দিকে তার গলা কাঁপতে থাকে।
এ-সব নিয়ে সুধার সঙ্গে বিনয়ের কথা হয়ে গেছে। জীবনের এই পর্বটা সে চুকিয়ে দিতে চেয়েছে। রাজদিয়ায় রামকেশবদের বাড়িতে একদিন দুপুরে যা শুরু হয়েছিল তার জের আর টানতে চায় না বিনয়, কিন্তু ঝুমা ছাড়লে তো। প্রায় মরিয়া হয়েই বিনয় বলে, তুমি বোধহয় শোননি, ঝিনুকের খবর পাওয়া গেছে।
কিছু বলতে গিয়ে ঝুমা থমকে যায়। বিনয় যে আচমকা ঝিনুককে টেনে আনবে, সে কল্পনাও করেনি। আলো নিবে এলে যেমন হয়, তার মুখ তেমন মলিন দেখায়। জোরে শ্বাস টেনে নিরুৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করে, কে খবর দিলে?
অধর ছুঁইমালীর নাম বলল বিনয়।
কোথায় আছে ঝিনুক?
কলকাতার আশেপাশেই। আজ সকালে তার সন্ধানে বিনয় যে আগরপাড়া গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কোথায় কোথায় যাবে, তাও জানিয়ে দিল সে।
কেবিনের ভেতর অপার স্তব্ধতা নেমে আসে। পর্দার ওধারেও সব আওয়াজ বুঝি থেমে গেছে।
অনেকক্ষণ পর ঝুমা বলল, শুধু শুধুই তুমি ঝিনুককে খুঁজে বেড়াচ্ছ। ওকে তুমি পাবে না।
বিনয় জোর দিয়ে বলল, কী করে বললে পাব না?
যে নিজের থেকে হারিয়ে যায় তাকে পাওয়া যায় না বিনুদা বলে এক পলক থামে। তারপর ফের শুরু করে, ধরা যাক, খুঁজতে খুঁজতে ঝিনুককে একদিন পেয়ে গেলে, তখন তাকে নিয়ে কী করবে?
প্রশ্নটা আগে আরও একদিন এই ঝুমাই তাকে করেছিল।
অবনীমোহনও সোজাসুজি একই কথা জানতে চেয়েছিলেন। হতচকিত, দ্বিধাগ্রস্ত বিনয় উত্তর দিতে পারেনি। সংস্কার আর দ্বিধা কাটিয়ে ওঠার মতো বিপুল শক্তি তার মধ্যে সেদিন ছিল না। জগৎ সংসারের নাকের ডগায় তুড়ি বাজিয়ে বলতে পারেনি, ঝিনুককে নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। আজও কি সে দ্বিধামুক্ত? গলা ফাটিয়ে সে কি ঘোষণা করতে পারে পচা গলা রদ্দি সংস্কার আমি মানি না? মনের ভেতর কোথাও একটা কুয়াশাঘেরা এলাকা আছে। ঝিনুককে যদি শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায় তাকে নিয়ে কী করবে, সেটা বুঝি বা তার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়।
এই মেয়েটা-ঝুমা, মাঝে মাঝে হুট করে চলে আসে আর ঘাড় ধরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দুরূহ, সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটার সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঝিনুককে পাওয়া গেলে কী করবে তা এই মুহূর্তে বলতে না পারলেও তাকে খুঁজে বার করাটা বিনয়ের জীবনের সব চাইতে বড় দায়। সে বলল, আগেতো ঝিনুককে পাই, তারপর দেখা যাবে
ঝুমা ভারী গলায় বলল, ঠিক আছে, তুমি খুঁজতে থাক। আমিও অপেক্ষা করতে থাকব। তার দুচোখ বাষ্পে ভরে যায়।
হতবাক তাকিয়ে থাকে বিনয়। যে ঝুমাকে সে চেনে সে বেপরোয়া। দুঃসাহসী। হঠকারী। পৃথিবীর কোনও কিছু তোয়াক্কা করে না। যা চায়, প্রবল প্রতাপে ছিনিয়ে নিতেও জানে। কিন্তু যে নারীটি টেবলের উলটো দিকে বসে আছে সে বিনয়ের সম্পূর্ণ অচেনা। এই ঝুমা বড় কোমল, বড় দুর্বল। এই মেয়েটাকে আগে কি কোনওদিন কাঁদতে দেখেছে? বিনয়ের মনে পড়ল না। এতকাল ঝুমাকে দেখলে স্নায়ুতে শিহরন খেলে যেত। আজই প্রথম বড় মায়ায় তার বুকের ভেতরটা ভরে যেতে থাকে।
