বিনয় অবাক। জিজ্ঞেস করল, এখানে কী?
ঝুমা বলল, আমার কথাগুলো বলতে হবে না?
এই রেস্তোরাঁয় বসে? ধন্দ-ধরা মানুষের গলায় বলে ওঠে বিনয়, তুমি না বলেছিলে কোনও নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে যাবে?
তেমন জায়গা এখানেই আছে। চল–
বিমূঢ়ের মতো ঝুমার সঙ্গে অজন্তা কেবিন-এ ঢুকল বিনয়।
.
৪৭.
রেস্তোরাঁটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ডান পাশে উঁচু কাউন্টারে বসে আছে মাঝবয়সী একটা লোক। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর গরম চাদর। খুব সম্ভব সে অজন্তা কেবিন-এর প্রোপ্রাইটর। তার সামনের দিকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে পনেরো ষোলটা টেবল পাতা। প্রতিটি টেবল ধবধবে চাদরে ঢাকা। দূরে পেছন দিকের দেওয়ালে বড় চৌকো একটা ফোকর। তার ওধারে কিচেন।
রেস্তোরাঁর চারপাশ থেকে গুঞ্জন উঠে আসছে। হালকা চালে কথাবার্তা, মাঝে মাঝে দমকা হাসি। শীতের এই বিকেলে একটা টেবলও খালি নেই।
বিস্ময়ের মাত্রাটা চড়ছিল বিনয়ের। ঝুমা বলেছিল, নিরিবিলিতে তার সঙ্গে কথা বলবে। এই কি নিরিবিলির নমুনা।
ঝুমাদের দেখে কাউন্টারের লোকটি তৎপর হয়ে ওঠে। –আসুন দিদি, আসুন—
ঝুমা জিজ্ঞেস করল, কেবিন খালি আছে?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। শিবু- গলা চড়িয়ে লোকটা হাঁক দিল, অ্যাই শিবু
একটা ঢ্যাঙা মতো রোগাটে চেহারার অল্পবয়সী বয় কিচেনের দিক থেকে ছুটে এল। গায়ে পাজামা, হাফ শার্টের ওপর রোঁয়াওলা খেলো উলের সোয়েটার। কাঁধে সাদা ঝাড়ন।
কাউন্টারের লোকটা শিবুকে বলল, দিদিদের তিন নম্বর কেবিনে নিয়ে বসা। টেবিল ফেবিলগুলো ভাল করে ঝেড়ে দিবি। ঝুমাদের শাঁসালো খদ্দের ভেবেই হয়তো লোকটা এমন খাতির করছে।
শিবু ঘাড় কাত করল। তারপর ঝুমাদের সঙ্গে করে ডান ধারের শেষ প্রান্তে নিয়ে গেল। এখানে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে কাঠের পার্টিশান দেওয়া সারি সারি খুপরি। সেগুলোর সামনে পর্দা ঝুলছে।
একটা পর্দা সরিয়ে শিবু বলল, দিদিরা, একটু দাঁড়ান- কেবিনে টেবল এবং সেটার দুধারে দুটো করে চেয়ার পাতা। সবই ফিটফাট, সাফসুতরো। তবু সেগুলোর ওপর যত্ন করে ঝাড়ন বুলিয়ে দিয়ে বলল, বসুন
ঝুমা আর বিনয় মুখোমুখি বসে পড়ে। শিবু জিজ্ঞেস করে, কী খাবেন বলুন
ঝুমা বলল, তোমাদের রেস্টুরেন্টে কী পাওয়া যাবে?
ফাউল কাটলেট, মাটন চপ, ডেভিল, কষা মাংস, চিংড়ির কাটলেট, কোর্মা, মোগলাই পরটা–গড় গড় করে নামতা পড়ার মতো লোভনীয় সব খাদ্যবস্তুর নাম আওড়ে গেল শিবু।
ঝুমা বলল, দু প্লেট ফাউল কাটলেট নিয়ে এস। টাটকা ভাজিয়ে আনবে।
আমাদের এখানে বাসি মাল থাকে না। সব টাটকা। আর কী আনব?
পরে অর্ডার দেব।
পর্দা ফেলে দিয়ে শিবু চলে যায়।
পর্দার ওপাশে লোজন, হইচই। কিন্তু ভেতরটা নির্জন। ভিড়ের মধ্যে থেকেও এক টুকরো দ্বীপের মতো। বিচ্ছিন্ন, ভূমণ্ডলের সঙ্গে সংযোগহীন।
কেবিন ব্যাপারটা নিয়ে ধন্দে ছিল বিনয়। এবার খানিকটা বোধগম্য হল। কেন এখানে তাকে টেনে আনা হয়েছে সেটাও মোটামুটি আঁচ করা যাচ্ছে।
ঝুমা ব্যাখ্যা করে বলল, কলকাতায় মানুষ এত বেড়ে গেছে যে কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই। যেখানেই যাও ভিড়। তাই রেস্তোরাঁর কেবিন ছাড়া আলাদা ভাবে কথা বলার জায়গা নেই। কফি হাউসের দোতলার ব্যালকনিতে গিয়ে বসতে পারতাম। ওখানে লোকজন বেশি যায় না। কিন্তু আজ কলেজ স্ট্রিটে মিছিল গেছে। গণ্ডগোল হবার খুবই সম্ভাবনা। তাই এখানে চলে এলাম।
বিনয় উত্তর দিল না। হঠাৎ করে চলে আসা অনেকগুলো মিছিল, তাদের তপ্ত স্লোগান, পুনর্বাসনের জন্য উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন-এ-সব তাকে আনমনা করে রেখেছিল। কিন্তু এই মূহূর্তে কেবিনে সে আর ঝুমা ছাড়া অন্য কেউ নেই। পুরানো শিহরনটা নতুন করে ফিরে এল। বহুদিন আগে রাজদিয়ায় এক বিজ দুপুরে রামকেশবদের বাড়ির সবাই দিবানিদ্রায় যখন আচ্ছন্ন, তখন একটা ফাঁকা ঘরে সেদিনের কিশোরী ঝুমা গলা জড়িয়ে ধরে তাকে চুমু খেয়েছিল। জীবনে কোনও নারীর সেই প্রথম চুম্বন। আশ্চর্য এক নেশার ঘোরে সারা শরীর ঝিম ঝিম করছিল। এত বছর বাদেও সেই ঘোর কাটেনি।
অনেকক্ষণ নীরবতা।
তারপর ঝুমা বলল, তুমি আমাদের খুব কষ্ট দিয়েছ।
বিনয় কুমার চোখে চোখ রাখে, কষ্ট দিয়েছি। তার মানে? তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।
বাবা সুধাদিদের ওখানে গিয়ে তোমাকে আমাদের বাড়িতে আসার জন্যে বার বার বলে আসেননি?
বিনয় দমে যায়। ঢোক গিলে বলে, হ্যাঁ, বলেছিলেন।
ঝুমা বলে, বাবার কথাটা কিন্তু তুমি রাখোনি।
বিনয় চোখ নামিয়ে নেয়। উত্তর দেয় না।
বাবা মা ঠাকুরদা ঠাকুমা আমি–সবাই রোজ তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছি এই কদিন। কিন্তু তুমি আসোনি।
এই প্রসঙ্গটাই যে উঠবে, নতুন ভারত পত্রিকার অফিসের সামনে ঝুমাকে দেখে তখনই আঁচ করেছিল বিনয়। সে চুপ করে থাকে।
শিবু কাটলেট নিয়ে আসে। নুন, গোলমরিচের কৌটো, টোমাটো সসের শিশি টেবলের একধারে সাজানো ছিল। কাটলেটে সস মাখাতে মাখাতে ঝুমা বয়টাকে নতুন অর্ডার দেয়, আধ ঘণ্টা পরে এক প্লেট করে ডেভিল দিয়ে যেয়ো। শিবু চলে গেলে বিনয়কে বলল, খাও
সেই কোন সকালে আগরপাড়ায় ছুটেছিল বিনয়। স্টেশনের দুধারে দুই কলোনিতে উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ঝাঁপ করে ঝিনুককে খোঁজাখুজি করেছে। উৎকণ্ঠায় খিদে-তেষ্টার বোধটাই ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সামনে খাবার দেখে সেটা চাড়া দিয়ে ওঠে। নিঃশব্দে কাটলেটে নুন আর গোলমরিচ ছড়াতে থাকে সে।
