আরে কী হল, অমন ছুটছ কেন? বলতে বলতে ঝুমাকেও গতি বাড়াতে হয়।
হ্যারিসন রোডের মুখে আসতেই চোখে পড়ল, ছোট বড় বেশ কটা মিছিল আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিক থেকে এগিয়ে আসছে। সেই একই স্লোগান, একই রকম প্ল্যাকার্ড, একই রকম ফেস্টুন, উদ্বাস্তুদের সেই শীর্ণ, ক্ষয়াটে, দড়ি পাকনা চেহারা। সঙ্গী পার্টির কর্মীরা।
স্লোগানগুলো সরকার বিরোধী। পলিটিল পার্টির ওয়ার্কারদের বিনয় সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে বা খানিক আগে শিয়ালদা সেশনে দেখেছে, এখন তাদেরই মতো অন্য কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে মিছিলগুলোতে। অর্থাৎ দলটা দ্বাস্তু পুনর্বাসনের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এই আন্দোলন কী আকার নেবে, কে জানে।
বিনয় ভাবতে চেষ্টা করল, ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট কি পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে আসা মানুষদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। কিছুক্ষণ স্মৃতির ভেতর হাতড়ানো চলল। কিন্তু না, এমন খবর তার কাছে নেই।
রাজদিয়া থেকে কলকাতায় চলে আসার পর বিনয় কি নিশ্চিন্ত একটা দিনও কাটাতে পেরেছে? ঝিনুককে নিয়ে অবিরাম নানা সংকটের মধ্যে চলতে হচ্ছে। ঝিনুক নিরুদ্দেশ হবার পর তাকে নিয়ে সর্বক্ষণ উৎকণ্ঠা, সর্বক্ষণ মানসিক চাপ, অবিরল দৌড়ঝাঁপ। এরই মধ্যে আনন্দর সুপারিশে দুম করে নতুন ভারত-এ তার চাকরি। তাকে দেওয়া হয়েছে উদ্বাস্তুদের ওপর অ্যাসাইনমেন্ট যা কিনা সবচেয়ে দুরূহ, সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে জটিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারটা রাজনৈতিক টানাপোড়েন। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান–দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, তুমুল শত্রুতা, বিদ্বেষ, এমন কত কী।
শিয়ালদা স্টেশন, কয়েকটি জবরদখল কলোনি, আর ত্রাণশিবির-এর বাইরে আর কোথাও যাওয়া হয়নি বিনয়ের। এগুলো ছাড়াও রয়েছে অগুনতি রিলিফ ক্যাম্প আর কলোনি। এমনও হতে পারে, সে যে-সব জায়গায় যায়নি তেমন কোথাও কোথাও সরকারি ফরমান জারি করা হয়েছে–পশ্চিমবঙ্গে থাকা চলবে না। ছেলেমেয়েদের হাত ধরে আরও একবার উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হবে বাইরে, বহুদূরে কোনও অচেনা ভূখণ্ডে। ক্যাম্পে কলোনিতে ঘুরে ঘুরে সঠিক খবরটা নিতে হবে বিনয়কে। সরকারি দপ্তরে গিয়ে জানতে হবে সুষ্ঠু পুনর্বাসনের জন্য কী ভাবা হয়েছে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে যারা নেমেছে তাদের কাছেও যাওয়া দরকার। বুঝতে হবে উদ্বাস্তুদের নিয়ে ওদের অভিপ্রায়টা কী। এ-সব সম্পর্কে আধাশেঁচড়া, অস্পষ্ট ধারণা থাকলে উদ্বাস্তু সমস্যা ঠিকমতো তুলে ধরা যাবে না। সাংবাদিক হিসেবে সেটা হবে তার বিপুল ব্যর্থতা। নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক আর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ির তার কাছে প্রচুর প্রত্যাশা। সেটা পূরণ করতেই হবে।
মিছিলগুলো বাঁ পাশে ঘুরে কলেজ স্ট্রিটের দিকে চলে যাচ্ছে। বিনয়ের বিন্দুমাত্র সংশয় নেই, শিয়ালদার সেই মিছিলগুলোও ওই রাস্তা ধরে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেছে। অর্থাৎ ওখানে বড় আকারের সভাটভা হবে।
হিমঋতুর এই পড়ন্ত বিকেলে সমস্ত এলাকাটা মানুষের ভিড়ে সরগরম। রাস্তায় গাড়িটাড়ি আগেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। চারদিকে এখন চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। লোকজন সতর্ক চোখে মিছিলগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে বেশ ভয়ে ভয়েই দূরে সরে যাচ্ছে।
ত্রস্ত, চাপা গলায় ঝুমা বলে, এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। শিগগির চল। এক্ষুনি গণ্ডগোল শুরু হয়ে যাবে।
চমকে মুখ ফেরায় বিনয়, কীসের গণ্ডগোল?
দক্ষিণ দিকে আঙুল বাড়িয়ে দেয় ঝুমা। দূরে সিনেট হলের সামনে পুলিশের ভ্যান আর কটা জিপ ফুটপাথের ধার ঘেঁষে দাঁড় করানো। রাস্তা জুড়ে দু-তিনজন পুলিশ অফিসার আর বেশ কিছু আর্মড কনস্টেবল।
মস্তিষ্কে উত্তেজনা অনুভব করছিল বিনয়। সেটা দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা শরীরে। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা না দেখে যাবার ইচ্ছা ছিল না তার। উদ্বাস্তুদের নিয়ে আজ একটা উত্তেজক ঘটনা ঘটতে চলেছে। প্রসাদ লাহিড়ি এটা নিয়ে কোনও অ্যাসাইনমেন্ট দেননি। এমনটা যে ঘটবে হয়তো তিনি তা জানেন না। বিনয় যদি এটা কভার করে, চিফ রিপোর্টার নিশ্চয়ই খুশি হবেন। কিন্তু ঝুমা একরকম জোর করেই দ্রুত পায়ে তাকে নিয়ে বাঁ পাশের গলিটায় ঢুকে পড়ল। মিছিলগুলো এখনও কলেজ স্ট্রিটে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। যতক্ষণ দেখা যায় সেদিকে ঘাড় ফিরিয়ে রইল বিনয়।
একটু পর তারা যেখানে চলে এল তার দুপাশে উঁচু উঁচু, চাপ-বাঁধা, ছিরিছাঁদহীন সব বাড়ি। কলেজ স্ট্রিট কি কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট দিয়ে এতদিন ট্রাম বাসে যাতায়াত করেছে বিনয় কিন্তু কখনও নেমে ভেতর দিকে ঢোকেনি। এলাকাটা আদি কলকাতার একটা অংশ। পুরোনো, জীর্ণ, মলিন। চারপাশে আবর্জনার ভঁই। চল্লিশ কি পঞ্চাশ ফিট দূরে দূরে একটা করে গ্যাসবাতির পোস্ট।
বিনয় মিছিলটার কথা ভাবছিল। জিজ্ঞেস করল, ওদের কী হতে পারে বল তো?
মিছিল টিছিলের ব্যাপারে আদৌ কোনও আগ্রহ নেই ঝুমার। বলল, এরকম প্রশেসন আজকাল মাঝে মাঝেই বেরোয়। এ নিয়ে মাথা ঘামিও না।
বিনয় আর কিছু বলল না।
অলিগলির ভেতর দিয়ে একসময় ঝুমা শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের উলটো দিকে একটা রেস্তোরাঁর সামনে নিয়ে আসে বিনয়কে। দরজার মাথায় বড় সাইন বোর্ডে লেখা : অজন্তা কেবিন।
