বিনয় জবাব দিল না।
ঝুমা থামেনি, তাই তোমাদের অফিস থেকে বেরিয়ে সেই দুটো থেকে একবার হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছি মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের মুখে। ওখান থেকে ফিরে বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিং। নজর রাখছিলাম কখন তুমি আসো। কোনও বাড়ির রোয়াকে যে বসব বা বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকব, তার কি উপায় আছে? কোনও মেয়েকে একা খানিকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখলে লোকে হেঁকে ধরে। কী যে হ্যাংলামি! তাই মুক্তারাম টু বিবেকানন্দ, বিবেকানন্দ টু মুক্তারাম–এই করতে হয়েছে মিনিমাম পঁচিশ বার। একটু থেমে তরল গলায় বলল, পঁয়তাল্লিশ মিনিটে যত হেঁটেছি, সবটা জোড়া লাগালে মিনিমাম চার মাইল লম্বা হয়ে যাবে।
বিনয় এতক্ষণে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে হুঁশে ফিরেছে। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, সেখান থেকে নতুন ভারত-এর অফিসটা বড় জোর পঁচিশ তিরিশ ফিট দূরত্বে। রাস্তায় ওপর মূল দরজাটা হাট করে খোলা। যে উর্দি পরা দারোয়ানটা হামেহাল ওখানে খাড়া থাকে, আপাতত সে নেই। হয়তো কোনও দরকারে কোথাও গেছে। যে-কোনও মুহূর্তে ফিরে আসতে পারে। তবে অফিসে লোকজনের আনাগোনার বিরাম নেই। সাংবাদিক, প্রেস থেকে শুরু করে নানা সেকশনের এমপ্লয়ি, বাইরের ভিজিটর-কেউ ভেতরে যাচ্ছে, কেউ বেরিয়ে আসছে। ওরা তাকে আর ঝুমাকে দেখে ফেলতে পারে। প্রকাশ্য দিবালোকে, হাজার চোখের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনও তরুণীর সঙ্গে গল্প করাটা এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি বিনয়। এখনও রাজদিয়ার সেই গেঁয়ো যুবকটিই থেকে গেছে-ভীরু, লাজুক, জড়সড়। ভীষণ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল সে। এধারে ওধারে তাকিয়ে বলল, চল, ওদিকটায় যাই
বিনয়ের মনোভাব আঁচ করে নেয় ঝুমা। সেও বুঝল অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা স্বস্তিকর নয়, দৃষ্টিকটুও। বলল, হ্যাঁ, চল–
বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে এসে ভয়ে ভয়ে বিনয় জিজ্ঞেস করে, আমার কাছে এসেছিলে কেন? আসার কারণটা কি আর আন্দাজ করতে পারেনি? তবু প্রশ্নটা করল।
তোমার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা আছে। পূর্ণ দৃষ্টিতে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে ধীরে বলল ঝুমা। কণ্ঠস্বরে খানিক আগের সেই তরলতা নেই। সুরটা গম্ভীর, একটু থমথমে।
যে-ঝুমা চঞ্চল, চুলবুলে, সারাক্ষণ হইচই বাধিয়ে চারদিক মাতিয়ে রাখে সে যেন অন্য কেউ। রীতিমতো অবাক হল বিনয়। ঝুমার চোখে চোখ রেখে বলল, যা বলতে চাও বল
রাস্তায় দাঁড়িয়ে অত কথা বলা যাবে না। তুমি অলরেডি লেট করেছ। অফিসে গিয়ে কি ঘণ্টা দুয়েকের ছুটি নিয়ে আসতে পার?
অফিসের কাজে সকালে বেরিয়েছিলাম। এই ফিরছি। পরে সেখানে গেলেও চলবে। কিন্তু
কিন্তু কী?
দুঘণ্টার কথা বললে কেন?
ঝুমা জানায়, লোকচক্ষুর আড়ালে নিরিবিলিতে কোথাও বিনয়কে নিয়ে বসতে চায়। বলে, এস আমার সঙ্গে।
বিনয় বলে, কোথায় যেতে চাও?
এসই না–
যখনই ঝুমা তার কাছে আসে, বিনয় টের পায়, এই মেয়েটার মধ্যে অপার্থিব কোনও শক্তি রয়েছে। প্রবল নিয়তির মত। কী যে তার আকর্ষণ! সে কিছু বললে মুখের ওপর না বলতে পারে না। অথচ বিনয় জানে, তার আর ঝুমার মাঝখানে উঁচু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুক। টের পেল, ঝিনুককে ভেদ করে তাকে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে টেনে নিয়ে চলেছে ঝুমা। এই দূরন্ত টানকে প্রতিরোধ করার কৌশল বা সামর্থ্য কোনওটাই তার নেই। ঝুমা তার শরীর আর মনের সবটুকু জোর শুষে নিয়ে তাকে পুতুল বানিয়ে ফেলেছে। নড়বড়ে, তলতলে, ইচ্ছাশক্তিহীন এমন এক পুত্তলিকা যার রাশ ঝুমার হাতে। মেয়েটাকে দেখলে কী যে হয়ে যায় তার! যে ঝিনুকের জন্য সকাল থেকে ছুটে বেড়াচ্ছে, তার মুখটা যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে। এমনকি শিয়ালদা স্টেশনের উদ্বাস্তুদের যে মিছিলগুলো তাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে সে-সবের কথাও মনে পড়ছে না। নিজের গালে ঠাস ঠাস চড় কষাতে ইচ্ছা হয় বিনয়ের। কী যে দুর্বল সে! কতটা যে অসহায়!
দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। ঝুমার শাড়ি থেকে, চুল থেকে, সেন্টের সেই চেনা সুগন্ধ উঠে এসে নাকের ভেতর দিয়ে শিরায় স্নায়ুতে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কেমন যেন নেশার ঘোর লাগে।
কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে এসে ঝুমা বিনয়কে নিয়ে একটা বাসে উঠে পড়ে। ঠনঠনে কালীবাড়ি পেরুবার পর কেশব সেন স্ট্রিটের মুখে এসে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ করে বাসটা থেমে যায়। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হ্যারিসন রোডের দিকটা দেখতে দেখতে ঝুমা বলল, এই রে, প্রচুর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ জ্যাম।
বিনয় জানতে চায়, কী ব্যাপার বল তো
এখানে বসে কী করে বলব? ঝুমা বলতে লাগল, জ্যাম কখন কাটবে, কে জানে। আমরা প্রায় এসেই গেছি। চল, নেমে পড়া যাক
বাস থেকে নেমে বাঁ পাশের ফুটপাথ ধরে খানিকটা যৈতে না যেতেই স্লোগান ভেসে এল।
এ আজাদি ঝুটা হ্যায়
ভুলো মাত, ভুলো মাত।
ইনকিলাব
জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।
উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গে পুনর্বাসন
দিতে হবে, দিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুদের বাস্তুজমি–
দিতে হবে, দিতে হবে।
উদ্বাস্তুদের অন্য রাজ্যে নেওয়া
চলবে না, চলবে না
স্লোগানগুলো তার চেনা। খানিক আগেই শিয়ালদায় শুনে এসেছে বিনয়। সচকিত হয়ে নিজের অজান্তেই বুঝি বা, লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে থাকে সে।
