আগরপাড়া স্টেশনে এসে শিয়ালদার ট্রেন ধরল বিনয় আর যুগল ধীরে ধীরে, ক্লান্ত পা ফেলে মুকুন্দপুরের দিকে হাঁটতে লাগল।
.
শিয়ালদায় পৌঁছে প্ল্যাটফর্মের থিকথিকে ভিড় ঠেলে ঠেলে বাইরের চত্বরে চলে এল বিনয়। এখানে সারাক্ষণই হট্টগোল। কানে যেন তালা ধরে যায়। এখন এ-সব ভাল লাগছিল না। জোরে জোরে পা ফেলে বাস রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। সামনের সার্কুলার রোড থেকে বাস বা ট্রাম ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ-হ্যারিসন রোডের ক্রসিংয়ে গিয়ে বাকি পথটুকু হেঁটে অফিসে যাবে, এমনটাই ভেবে রেখেছে।
বিশাল চত্বরের সিকিভাগ সবে পেরিয়েছে, হঠাৎ স্টেশনের সমস্ত হইচই ছাপিয়ে স্লোগান ভেসে এল।
আমরা কারা?
বাস্তুহারা।
আমাদের দাবি
মানতে হবে।
কলোনিবাসীদের ক্যাশডোল—
দিতে হবে, দিতে হবে–
ইনকিলাব
জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।
চমকে বাঁদিকে তাকায় বিনয়। শিয়ালদা সাউথ স্টেশন থেকে উদ্বাস্তুদের মিছিল বেরিয়ে আসছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
একটা নয়, পর পর পাঁচটা মিছিল। প্রথম যে মিছিলটা বেরুলো তার সামনে সাদা কাপড়ের বিরাট ফেস্টুন। সেটায় বড় বড় লাল হরফে লেখা ও বাস্তুহারা সংগ্রাম কমিটি। দুটি যুবক ফেস্টুনটা দুধারে ধরে নিয়ে আসছে। তাদের মতো আরও কজন যুবক-যুবতীও আছে। এরা কেউ কেউ ফেস্টুনের আগে আগে হাঁটছে। বাদবাকি মিছিলগুলোর পাশে রয়েছে। সামনের দিকে যারা আছে পালা করে স্লোগানের প্রথম অংশটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে। মিছিলের ছিন্নমূল জনতা স্লোগানের শেষটা গলা মিলিয়ে বলে যাচ্ছে।
যে তরুণ-তরুণীরা মিছিলগুলোকে নিয়ে চলেছে, পোশাকে আশাকে এবং চেহারা দেখে আদৌ মনে হয় না, এরা বাস্তুহারা। চকিতে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পশ্লির ত্রিদিব সেন আর জয়ন্তী বসুর। কথা মনে পড়ে যায় বিনয়ের। অধর বলেছিল, ওরা পার্টির লোক। কমিনিস। ত্রিদিবদের মতো আজ যারা মিছিলগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ে চলেছে তারাও নিশ্চয়ই কোনও পার্টির লোক।
একটার পর একটা মিছিল এগিয়ে আসছে। প্রতিটি মিছিলের সামনে যারা আছে তাদের একজনের হাতে ছোট একটা ফেস্টুন। তাতে লেখা : দেশবন্ধু পল্লি গড়িয়া বা মহামান্য তিলক কলোনি– যাদবপুর, বা রবীন্দ্রনগর কলোনি–ঢাকুরিয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ যে যে অঞ্চলের কলোনি থেকে তারা আসছে তার নাম টাম জানা গেল। প্রতিটি মিছিলের উদ্বাস্তুদের হাতে রয়েছে অগুনতি প্ল্যাকার্ড। চাটাইয়ের চৌকো চৌকো টুকরো কেটে তার ওপর খবরের কাগজ সেঁটে লাল কালিতে যে-সব স্লোগান এখন দেওয়া হচ্ছে তাই লিখে আনা হয়েছে।
মিছিলগুলো একে একে চলে গেল। আচমকা বিনয়ের মনে হয়, উদ্বাস্তুদের নিয়ে খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গে তুমুল আন্দোলন শুরু হবে। অন্যমনস্কর মতো সে স্টেশনের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে সার্কুলার রোড পেরিয়ে হ্যারিসন রোডে এসে পড়ল। একটু পরেই একটা মোটামুটি ফাঁকা ট্রাম পেয়ে উঠে পড়ল। জানালার ধারে জায়গা পেয়ে সে বসে পড়ে।
সেই মিছিলগুলো হ্যারিসন রোডের একটা ধার ঘেঁষে স্লোগান দিতে দিতে চলেছে। বাস ট্রাম বা অন্য যানবাহন মিছিলের কারণে খুব স্পিড তুলতে না পারলেও ধীরে ধীরে চলতে পারছে।
খুব কৌতূহল হচ্ছিল বিনয়ের। মিছিলগুলোর গন্তব্যস্থল কোথায়? তাদের উদ্দেশ্য কী? ট্রাম মিছিলগুলোর কাছে এসে গিয়েছিল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিনয় জিজ্ঞেস করল, কোথায় চলেছেন আপনারা?
একজন রাজনৈতিক কর্মী স্লোগান দিতে যাচ্ছিল, মুখ ফিরিয়ে বলল, বিধান রায়ের বাড়ির সামনে, ওয়েলিংটন স্কোয়ারে।
সেখানে আজ কী আছে?
যুবকটি জবাব দিল না। এখন অত সময় তার নেই। ব্যস্তভাবে স্লোগান দিতে দিতে সে এগিয়ে গেল।
বিনয় যখন অফিসের কাছাকাছি এসে পৌঁছুল শীতের বেলা ঢলে পড়তে শুরু করেছে। ফুটপাথ ধরে জোরে জোরে পা ফেলছিল সে। কিন্তু অফিসে ঢুকবার মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। চোখে পড়ল, ডানদিক থেকে এগিয়ে আসছে ঝুমা।
বুকের ভেতর এলোপাতাড়ি হাতুড়ি পেটার আওয়াজ শুনতে পেল বিনয়।
৪৬-৫০. নতুন ভারত
৪৬.
ঝুমার সঙ্গে নতুন ভারত-এর সামনে দেখা হয়ে যাবে, কল্পনাও করেনি বিনয়। এই দু-তিনটি দিন ঝিনুক তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তার জন্য ছোটাছুটি চলছে বিরতিহীন। এর মধ্যে ঝুমার কথা পলকের জন্যও মাথায় আসেনি। অনন্ত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সে। টের পায় বুকের ভেতর দমাদ্দম আওয়াজটা আরও প্রবল হয়ে উঠেছে।
ঝুমা সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কাধ থেকে চমৎকার একখানা চামড়ার ব্যাগ ঝুলছে। বই খাতায় ঠাসা। চকিতে বিনয়ের মনে হয়, হয়তো কলেজ থেকে বাড়ি না ফিরে এদিকে কোথাও এসেছিল, আচমকা তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু অচিরেই ভুলটা ভাঙল।
ঝুমা লঘু সুরে বলল, তুমি তো ভীষণ ফাঁকিবাজ
বিনয় হকচকিয়ে যায়। মানে?
দুটো থেকে তোমার ডিউটি। পৌনে তিনটে বাজে। এখন তোমার অফিসে আসার সময় হল? অল্প অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ কুঁচকে ঝুমা বলে, তোমার চাকরিটা থাকলে হয়।
বিনয় চমকে ওঠে, কখন আমার ডিউটি শুরু, তোমাকে কে বললে? পরক্ষণে তার মস্তিষ্কে কিছু একটা ঝিলিক দিয়ে যায়, তুমি কি অফিসে গিয়ে আমার খোঁজ করেছিলে?
না হলে জানলাম কী করে?
বিনয়ের যেটুকু বা সংশয় ছিল, নিমেষে উধাও। ঝুমা তার সন্ধানেই এখানে হানা দিয়েছে। আনন্দ তার মামা। মামার কাছ থেকে কৌশলে নতুন ভারত-এর ঠিকানা জেনে নেওয়া তার পক্ষে এমন কি আর শক্ত কাজ? ঝুমা চিরকালই দুঃসাহসী। কতটা বেপরোয়া হলে একটা মেয়ের পক্ষে এভাবে এখানে চলে আসা সম্ভব, যত ভাবছিল ততই বিমূঢ় হয়ে যাচ্ছিল বিনয়। ঝুমাকে দেখতে দেখতে অন্য একটা ভাবনা কোত্থেকে উড়ে এসে তার মাথায় ঢুকে পড়ে। এই তো মাত্র কদিন হল, বিনয় এখানে কাজে লেগেছে। এর মধ্যেই কিনা পরীর মতো এক তরুণী তার সঙ্গে দেখা করতে অফিস অবধি ধাওয়া করেছে! অস্বস্তি, চরম অস্বস্তি। বিনয়ের সামনে একটি ছবি যেন ফুটে উঠতে থাকে। ঝুমার সঙ্গে কথা শেষ করে সে যখন নিউজ ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ঢুকবে, চারপাশ থেকে জোড়া জোড়া চোখ তার দিকে ধেয়ে আসবে। কেউ যদি জানতে চায় ঝুমা কে, বিনয়ের সঙ্গে কীভাবে আলাপ হল, কী সম্পর্ক তাদের দুজনের, তখন কী বলবে সে? সবাইকে খুশি করার মতো একটা জুতসই উত্তর যখন বিনয় হাতড়ে বেড়াচ্ছে, সেইসময় ঝুমা বলে ওঠে, তোমাদের চিফ রিপোর্টার আমাকে ওয়েট করতে বলেছিলেন, কিন্তু চারদিকে পুরুষের ভিড়। একটা মেয়ের পক্ষে সেখানে বসে থাকা যায় না।
