বিনয় বলল, আচ্ছা যুগল, তোমাদের কলোনির পুবদিকের জঙ্গল সাফ করে যেখানে স্কুল বসেছে ওখানকার সব জমি কি বিলি হয়ে গেছে?
যুগল বলল, না। ক্যান কন তো?
ওখানে একটা রিফিউজি ফ্যামিলিকে কাঠা চারেক জায়গা দিতে পারবে?
আপনে যহন কইছেন চাইর কাঠা ক্যান, যতনি চাই দিমু।
বিনয় খুশি। বলল, খুব ভাল হল। একটা ফ্যামিলি বেঁচে যাবে।
যুগল জিজ্ঞেস করে, যাগো লেইগা জমিনের কথা কইলেন হেরা কারা?
বিনয় বিশদভাবে এখন কিছু জানাতে চাইল না। শুধু বলল, পরে শুনো
আর কোনও কৌতূহল দেখায় না যুগল।
ছুটোবাবু যখন মুখ ফুটে চেয়েছেন তখন কাদের জন্য এই জমি, তারা মানুষ কেমন, এ নিয়ে লেশমাত্র মাথাব্যথা নেই যুগলের। ছুটোবাবুর ইচ্ছা মানে তার কাছে হুকুম। সেই হুকুম তাকে পালন করতে হবে। পুবদিকের জঙ্গল সাফ করার পর যে জমি বেরিয়েছে তার অনেকটাই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কোথায় কোথায় ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে, মনে মনে তার খোঁজ করতে লাগল সে।
বিনয়ও আর কিছু বলল না। নীরবে মেঠো পথের ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। আশু দত্ত, রামরতনের স্ত্রী এবং তার মেয়েরা দ্রুত ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। সমস্ত ভাবনা জুড়ে ফিরে এল ঝিনুক।
.
৪৫.
আগরপাড়া স্টেশনে এসে লাইন পেরিয়ে পশ্চিম দিকে মিনিট সাতেক হাঁটার পর ডানপাশে একটা গ্রাম পড়ল। ফুটিফাটা জং-ধরা পুরোনো টিন, ভাঙা টালি, কি খড়ের চালের অগুনতি বাড়িঘর গা-জড়াজড়ি করে রয়েছে। দরজা জানালা খোলা, হা হা করছে। লোকজন চোখে পড়ে না। চারপাশ নিঝুম। দেখেই বোঝা যায়, একসময় এগুলো ছিল হতদরিদ্র মানুষদের বাসস্থান।
বিনয় অবাক। পরিত্যক্ত গ্রামটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ওখানে কারওকে দেখছি না তো? সব গেল কোথায়?
এই অঞ্চলটা ভাল করেই জানে যুগল। হাতের তালুর মতো সব তার পরিচিত। বলল, এইটা আছিল মুসলমানগো গেরাম। দ্যাশভাগের পর এহানকার বেবাকটি (সকলে) পাকিস্থানে চইলা গ্যাছে।
চকিতে বিনয়ের মনে পড়ল, ইন্ডিয়া থেকে ওপারে গিয়ে বহু লোক হিন্দুদের ফাঁকা বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুসলমানেরা। কিন্তু এখন অবধি সে যেটুকু দেখেছে, পুর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুরা কোনও মুসলমানের ফাঁকা জমি জায়গায় জোর করে বসে পড়েনি। অবশ্য সে কতটাই বা দেখেছে। পশ্চিমবঙ্গ তো একটুখানি জায়গা নয়। কোথায় কী হচ্ছে, সবটা তার জানা নেই।
জনশূন্য গ্রামটা পেছনে ফেলে আরও মিনিট দশেক হাঁটার পর নতুন উদ্বাস্তু কলোনিটায় চলে এল বিনয়রা। এখানে মুকুন্দপুরের মতো বিল বা জঙ্গল নেই। আন্দাজ করা যায় এলাকাটা ছিল পোড়ো অনাবাদী ডাঙা + তার খানিকটা চৌরস করে বেশ কিছু ঘর তোলা হয়েছে। টিন, টালি আর কাঁচা বাঁশের একএকটা খাঁচা। আর দশটা জবরদখল কলোনির সঙ্গে কোনও তফাত নেই। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির সামনে বাঁশের খুঁটিতে টিনের ফলকে কলোনির নাম লেখা ছিল। এখানে তেমন কিছু নেই। আসতে আসতে যুগল যা বলেছিল তাই। একেবারে নতুন কলোনি। সবে পত্তন হয়েছে। বোধহয় নামকরণ হয়নি।
বিনয়দের দেখে একটা বয়স্ক লোক–পরনে ময়লা ফতুয়া, ময়লা খাটো ধুতি, গালে বড় কালো জডুল-কোত্থেকে যেন বেরিয়ে এল। বিনয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, বাবু, আপনেরা?
নিজেদের পরিচয় দিয়ে এখানে আসার উদ্দেশ্যটা জানিয়ে দেয় বিনয়। ঝিনুকের নাম, বয়স এবং চেহারার বর্ণনাই শুধু না, অধর ছুঁইমালীর দেখা ঝিনুকের সঙ্গী অজানা আধবুড়ো লোকটার কথাও জানালো। তারপর বলল, এরা কি এই কলোনিতে থাকে?
জডুলওলা বেশ জোর দিয়ে বলল, না বাবু, অ্যামন কেও এহানে নাই। আমরা সবসুদ্ধ চাল্লিশ ঘর রিফুজ। হগলে হগলেরে চিনে। যাগো কথা কইলেন ত্যামন কেও থাকলে ঠিক জানতে পারতাম।
খানিক চিন্তা করে বিনয় জিজ্ঞেস করে, এমনও তো হতে পারে, ওরা এখানে কারও কাছে এসেছিল।
জডুলওলা তক্ষুনি জবাব দিল না। কয়েক পলক চুপ করে থেকে বলল, আপনেরা এটু খাড়ন। আমি বেবাকটিরে ডাইকা আনি– সে কলোনির ভেতর দিকে চলে গেল। মিনিট তিন চারেক বাদে যখন ফিরল, সঙ্গে বড় সড় একটা দঙ্গল। রিফিউজিরা যেমন হয়, এরাও অবিকল তেমনই। শীর্ণ, ক্ষয়াটে চেহারা। ভাঙা গালে পাঁচ সাত দিনের দাড়ি। চুলে বহুকাল তেল পড়ে না। গর্তে বসা চোখের তলায় কালি। সারাক্ষণ ত্রস্ত, সারাক্ষণ উৎকণ্ঠিত।
সামনের দিকে রয়েছে পুরুষেরা। পেছনে খানিক দূরে কিশোরী, যুবতী, নানা বয়সের ঘোমটা-টানা সধবা মেয়েমানুষ আর বাচ্চারা। সবার চোখে অনন্ত কৌতূহল।
বয়স্ক জডুলওলা লোকটা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। তবু বিনয় কলোনির পুরুষগুলোকে আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু সবারই এক উত্তর। ঝিনুকের হদিস কেউ দিতে পারল না। সে হতাশ হয় ঠিকই, তবে মুষড়ে পড়ে না। এর মধ্যেই সে বুঝে নিয়েছে, এত সহজে ঝিনুককে পাওয়া। যাবে না।
একসময় নতুন কলোনির বাসিন্দাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিনয়রা ফিরতে থাকে।
নীরবে হাঁটছিল তারা। বিনয়ের ম্রিয়মাণ মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে যুগলের। খুব নরম গলায় সে বলে, ভাইবেন না ছুটোবাবু, ঝিনুক বইনেরে ঠিক পাওয়া যাইব।
বিনয় কতটা সান্ত্বনা বা ভরসা পেল, কে জানে। সে উত্তর দেয় না।
