বিনয় অবাক। সংকোচের সুরে বলল, সবে তোমার জ্বর ছেড়েছে। শরীর দুর্বল। এই অবস্থায়
যুগল ততক্ষণে দরজার কাছাকাছি চলে গেছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এই হগল কাম ফালাইয়া রাখতে নাই। আপনে এটু বহেন, আমি জামা কাপর বদলাইয়া আইতে আছি। সে ডানপাশের ঘরে চলে যায়।
কিছুক্ষণ বাদে দুজনে বেরিয়ে পড়ে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে যুগলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় বুক ভরে যায় বিনয়ের। সেই কত বছর আগে হেমনাথের বাড়িতে কামলা খাটত। তাঁদের পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছিল। এতকাল বাদে কোথায় হেমনাথ পড়ে আছেন, আর সীমান্ত পেরিয়ে ভাসতে ভাসতে কোথায় এসে সে ঠেকেছে, তবু হেমনাথের তো বটেই, তার নাতি নাতনি থেকে শুরু করে সকলের ওপর তার কী যে আশ্চর্য টান! বিশেষ করে বিনয়ের ওপর তার অপার মায়া। ঝিনুকের জন্য বিনয়ের যত ব্যাকুলতা, রক্তের সম্পর্কহীন এই নিরক্ষর অনাত্মীয় মানুষটার তার চেয়ে লেশমাত্র কম নেই। লক্ষ পাকে যুগল বিনয়দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ঝিনুকের চিন্তা মাথায় নিয়ে বিনয় মুকুন্দপুর কলোনিতে ছুটে এসেছিল। অন্য কোনও দিকে খেয়াল ছিল না। আচমকা আশু দত্তকে মনে পড়ে যায়। কিছুদিন আগে যুগল আর সে কলোনির স্কুলের সরকারি গ্রান্টের জন্য কোন এক বড় অফিসারের কাছে দরবার করতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে গিয়েছিল। তারপর ওঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, আশু স্যার কি এখানেই আছেন?
যুগল ঘাড় কাত করল, হ। কুলোনিতে তেনার মন বইয়া গ্যাছে। নিশিকান্ত আচায্যিগো একহান বাড়তি ঘর আছে। অহন হেহানেই থাকেন। তেনার লেইগা নয়া ঘর তুলতে আছি। পনেরো বিশ দিনের ভিতরে হইয়া যাইব।
তোমাদের স্কুলের কী হল?
কলোনির শেষ প্রান্তে, কিছুদিন আগে যে জায়গাটা ছিল ঘন ঝোপঝাঁপ আর উঁচু উঁচু প্রাচীন সব বৃক্ষে ঢাকা, সেখানে আর জঙ্গলের চিহ্ন নেই। একটাই মাত্র টালির চাল আর কাঁচা বাঁশের বেড়ার লম্বা ঘর উঠেছে। সেটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলল, উই তো আমাগো ইস্কুল। মাস্টর মশয় কুলোনির পোলাপানগো পড়াইতে আছে। হুনতে আছেন কলরবলর?
এখানে পা রাখার পর অন্য কোনও দিকেই কান ছিল না বিনয়ের। ঝিনুকেই আচ্ছন্ন হয়ে ছিল সে। এবার দূর থেকে অগুনতি কচি কচি গলার কলরোল শুনতে পেল। ধারাপাত মুখস্থ করার আওয়াজ, নাকি ক খ গ ঘ? আজ এখানে আসার পর কেন যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে কলোনির খোলা জায়গায় হুটোপাটি করতে দেখা যায়নি, এবার বোঝা গেল।
কলরবমুখর স্কুল-ঘরটার দিকে কয়েক পলক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে বিনয়। কী অদম্য জেদ আশু দত্তর, কী বিপুল উদ্যম, কী অফুরান সৃজনীশক্তি। ষাট পেরিয়েছেন কবেই। এই বয়সে বিলের ধারে বিজন বনভূমির গায়ে উদ্বাস্তুদের কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে গড়ে তুলেছেন আশ্চর্য এক পাঠশালা। যাঁর প্রতাপে একদা রাজদিয়া হাইস্কুল তটস্থ থাকত সর্বক্ষণ, আয়ুর শেষ প্রান্তে পৌঁছে তিনি ফেলে-আসা জীবনটাকে নতুন করে শুরু করেছেন।
যুগল বলে ওঠে, অ্যাদূর যহন আইছেন, মাস্টর মশয়ের লগে দেখা কইরা যাইবেন?
বিনয় বলল, না, আজ আর সময় হবে না। তুমি আশু স্যারকে বলে দিও, পরে যেদিন আসব তার সঙ্গে দেখা করব। চল মুখ ফিরিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল।
মনের ভাবগতিক বুঝে ওঠা ভার। কখন কোন পথে সেটা যে ধেয়ে যাবে আগে থেকে তার হদিস মেলে না। বিনয় ছুটে এসেছিল ঝিনুকের জন্য। এখন তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে শুধু আশু দত্ত। আর কী আশ্চর্য, আশু দত্তর কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর-একজন প্রাক্তন মাস্টার মশাইয়ের মুখ-জামতলির রামরতন গাঙ্গুলি। বিক্রমপুরের দুই এলাকায় দুজনে তো একই কাজ করেছেন। অশিক্ষার কুশিক্ষার ক্লেদে হাজার বছর ডুবে-থাকা গ্রামগুলোতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। সীমান্তের এপারে এসে সেটা নতুন করে শুরু করতে পেরেছেন আশু দত্ত। কিন্তু রামরতন তো ইণ্ডিয়ায় পৌঁছতেই পারলেন না।
রামরতনের কথা মনে হলেই ছায়া-মায়ারা হুড়মুড় করে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। সব যেন অদৃশ্য কোনও সুতোয় বাঁধা।
রামরতনের স্ত্রী বড় আশা করে আছেন, বিনয় তার দুই মেয়ের চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। করা হয়নি। ভেবেছিল সুধা-সুনীতিদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাঙ্ক থেকে তার ভাগের টাকাটা তুলে রামরতনের স্ত্রীকে দিয়ে আসবে। দেওয়া হয়নি। অধর ভূঁইমালী ঝিনুকের খবরটা দেবার পর সব সংকল্প ভুলে গিয়েছিল।
রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের ব্যাপারে ক্রমশ নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাচ্ছে বিনয়। অপরাধবোধের মধ্যেই আলোর একটা সংকেত আচমকা মাথায় ঝলকে ওঠে। টাকা হাতে পেলে রামরতনের পরিবারকে বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হবে। আগলে রাখার মতো কোনও পুরুষ অভিভাবক নেই। এদিকে ঘাড়ের ওপর দুই পূর্ণ যুবতী মেয়ে। কলকাতা শহর তো স্বর্গরাজ্য নয়। বদমাশ লম্পট এবং মেয়ের দালালে থিক থিক করছে। বিশেষ করে দেশভাগের পর এদের সংখ্যা কত গুণ যে বেড়ে গেছে! ছায়া-মায়ার মতো সরল নিষ্পাপ দুই তরুণী কখন যে কার পাল্লায় পড়বে, ভুজুং ভাজুং দিয়ে কোন নরকের রাস্তায় তারা ওদের পৌঁছে দেবে–এমন বিপদ তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার চেয়ে রামরতনের স্ত্রী যদি মেয়েদের নিয়ে মুকুন্দপুরে এসে থাকেন, দুর্ভাবনার কারণ নেই। এখানে আশু দত্ত আছেন, যুগল আছে, পতিতপাবনেরা আছে। কারও ঘাড়ে এমন মাথা নেই যে এখানে এসে বজ্জাতি করতে পারে। ছায়া-মায়ারা এই কলোনিতে পুরোপুরি নিরাপদ।
