বিনয়কে ঘিরে কলকলানি চলছেই। আপনে আইছেন ছুটোবাবু, কী ভালা যে লাগতে আছে কইয়া বুঝাইতে পারুম না। ইত্যাদি।
এদিকে হইচই শুনে যুগল আর পাখি তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। অন্য সবার মতোই তারাও অবাক। খুশিতে চোখ চিক চিক করছে।
যুগল বলল, আপনে যে আত (হঠাৎ) কুলোনিতে আইবেন, হপনেও ভাবি নাই।
বিনয় বলল, তোমার সঙ্গে দরকারি কথা আছে। তাই আসতে হল।
খুব জরুরি ব্যাপার না থাকলে এভাবে কেউ আসে না। কী একটু ভাবল যুগল। তারপর কলোনির মেয়েদের বলল, তুমরা অহন ঘরে যাও। পরে ছুটোবাবুর লগে কথা কইও বিনয়কে বলল, আহেন–
পাখি আর যুগল বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে তাদের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
কলোনির মেয়েরা বেশ নিরাশ হল। তাদের হয়তো বিনয়ের সঙ্গে একটু আধটু গল্প করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে সুযোগটা যুগল দিল না। অগত্যা সবাই ধীরে ধীরে যে যার ঘরের দিকে ফিরে যেতে লাগল।
বিনয় সামান্য অস্বস্তি বোধ করে। পরক্ষণে খেয়াল হয়, এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনাবশ্যক কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই। যে কারণে মুকুন্দপুর কলোনিতে ছুটে আসা, সেটা সেরেই তাকে কলকাতায় ফিরতে হবে।
সেবার এসে বিলের লাগোয়া যে ঘরটায় বিনয় এক রাত কাটিয়ে গিয়েছিল, যুগল তাকে সেখানে নিয়ে আসে। তক্তপোশে বিছানার ওপর পরিষ্কার একখানা চাদর পরিপাটি করে পাতা। বলল, বহেন ছুটোবাবু, বহেন। পাখিও তাদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। তাকে বলল, তরাতরি চা কইরা লইয়া আয়–
পাখি দৌড়ে উঠোনের কোণে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
বিনয়কে বিছানায় বসিয়ে একটা জলচৌকি টেনে এনে পায়ের কাছে বসে পড়ে যুগল।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, আজ বাড়ি থেকে বেরোওনি যে?
শরীলে জুইত নাই ছুটোবাবু-যুগল জানায়, টালকি (ঠাণ্ডা) লাইগা জ্বরে পড়ছিলাম। কাইল রাইতে জ্বরটা ছাড়ছে কিন্তুক শরীল জবর কাহিল। কাইক (পা) ফালাইতে কষ্ট হয়। হেই লেইগা ঘরেই আটকা আছি। কাইল থিকা আবার বাইর হমু–
আগে সেভাবে লক্ষ করেনি বিনয়। এবার তার চোখে পড়ল, যুগলের চেহারায় অসুস্থতার ছাপটা খুব স্পষ্ট। ফ্যাকাসে মুখ, চোখ দুটো ঘোলাটে। ভাঙা গালে খাড়া খাড়া দাড়ি। ভীষণ রোগা দেখাচ্ছে। বলল, আরও দু-চার দিন বিশ্রাম নিয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বেরিয়ে।
আমাগো লাহান মাইনষের কি বইয়া থাকলে চলে ছুটোবাবু? দিন আনি, দিন খাই। ঘরে জামাইনা : ট্যাকা-পহার (জমানো টাকাপয়সার) পাহাড় নাই যে নিচ্চিন্তে পায়ের উপুর পাও তুইলা থাকুম। জ্বরে পইড়া তিনদিন বাইর অইতে পারি নাই। কতখানি ক্ষতি যে হইয়া গ্যাছে!
কথাটা ষোল আনা ঠিক। বিনয় উত্তর দিল না।
যুগল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সুধাদের খবর নিতে লাগল।
পাখি পরিষ্কার কাঁচের গেলাসে চা নিয়ে আসে। সঙ্গে প্লেটে সস্তা বেকারির কড়কড়ে এস (বড় হরফের এস-এর মতো দেখতে) বিস্কুট। বিনয় মাঝে মাঝে কলোনিতে আসবে, এই আশায় একজোড়া কাঁচের গেলাস কিনে এনে যত্ন করে রেখে দিয়েছে যুগলরা।
যুগল পাখিকে বলে, ছুটোবাবু খাইয়া যাইব। রান্ধন বহাইয়া দে। ঘরে মাছ নি আছে?
মুখখানা মলিন হয়ে যায় পাখির। বিব্রত ভাবে সে মাথা নাড়ে, নাই
প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় যুগল। মাছ ছাড়া কেওরে কি ভাত দ্যাওন (দেওয়া) যায়! যাই বিলে গিয়া জালের খ্যাও (খেপ) দিয়া দেহি কী মিলে—
ঘরের কোণে একটা ঝাঁকি-জাল টাঙানো রয়েছে। যুগল সেদিকে পা বাড়াতে যাবে, বিনয় তাকে থামিয়ে দেয়। বলে, না না, এখন তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না। আমি খেয়ে এসেছি। ডাহা মিথ্যেই বলল সে। এছাড়া যুগলকে ঠেকানোর অন্য কোনও উপায় নেই।
স্থির চোখে কিছুক্ষণ বিনয়কে লক্ষ করে যুগল। তারপর বলে, সাচা (সত্যি) নি কন ছুটোবাবু? দুগা মাছ-ভাত কইরা দিতে পাখির কিন্তুক কুনো কষ্ট হইব না।
মিথ্যে বলার অভ্যাস নেই বিনয়ের। অস্বস্তি বোধ করলেও মুখচোখ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে সে বলল, বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি।
যুগল বিশ্বাস করল। সে জানে, বিনয়ের মুখ থেকে কখনও মিথ্যে বেরোয় না। তবে তার ছুটোবাবুকে না খাওয়াতে পারার জন্য দুঃখ থেকেই গেল। বলল, এই দুফার বেইলে বেলায়) দুই গরাস ভাত খাইয়া না গ্যালে।
বিনয় বলল, আর-এক দিন এসে খাব–
একটু নীরবতা।
তারপর যুগল গলা নামিয়ে বিমর্ষ মুখে শুধোয়, ঝিনুক বইনের কুনো খবর বাতরা (বার্তা) নি পাইলেন?
বিনয় বলল, সামান্য একটা খবর পেয়েছি। সেই জন্যেই আজ তোমার কাছে আসা। জানি না কোনও কাজ হবে কি না
যুগলের সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। নিষ্প্রভ চোখ দুটো ঝলকে ওঠে। সে প্রায় চেঁচিয়ে বলে, চেঁচিয়ে কী খবর পাইছেন কন ছুটোবাবু, কন- তার স্বর তীব্র উত্তেজনায় কাঁপছে।
অধর ভুঁইমালীর সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে থানায় গিয়ে দিবাকর পালিতের সঙ্গে যোগাযোগ করা অবধি সব জানিয়ে বিনয় বলে, পুলিশ এই লাইনের কলোনি আর ক্যাম্প ট্যাম্পগুলোতে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। ওরা ওদের মতো খুঁজুক। তুমি তো এদিকের ট্রেনে যাতায়াত কর। লক্ষ রেখো যদি ঝিনুককে দেখতে পাও। আর কলোনির লোকজনদেরও বলে দিও তারাও যেন নজর রাখে–
যুগল বলে, না, কুলোনির কেওরে অহন জানামু না। ঝিনুক বইন যে নিখোঁজ হইয়া গ্যাছে হেইটা এহানকার কেও জানে না। হগলের মন তত এক না। বেশির ভাগই ভালা। দুই চাইর জন । কুচুইটা (কুচুটে) আছে। আবডালে এ নিয়া গুজগুজানি করতে থাকব। যা করনের আমিই করুম। টেরেনে নজর তো রাখুমই, আশপাশের ইস্টিশানের ধারে ধারে যেই হগল কুলোনি বইছে, হেই হেই জাগাতেও যামু-বলতে বলতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায় তার, আরে আরে, মাস দ্যাড়েক হইল আগরপারা ইস্টিশানের উই ধারে একহান নয়া কুলোনি বইছে। লন যাই ছুটোবাবু, অহনই বাইর হইয়া পড়ি। মা কালী যদিন মুখ তুইলা চায়, হেইহানে ঝিনুক বইনেরে পাইয়াও যাইতে পারি।
