নাকে কোঁচার খুট ঠেসে ধরে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যেতে লাগল বিনয়।
এখানে ভোরে চোখ মেলার সঙ্গে সঙ্গে কারণে অকারণে শুরু হয়ে যায় ঝগড়া। কুৎসিত গালিগালাজ। খিস্তিখেউড়। বেলা যত বাড়তে থাকে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেয়োখেয়ির মাত্রাও চড়ে যায়। সমস্ত দিন হইচই, গলা-ফাটানো চিৎকার, তীব্র উত্তেজনা। রাত্তিরে যতক্ষণ না দু-চোখ জুড়ে আসছে অবিরল হট্টগোলে চতুর্দিক উচ্চকিত হয়ে থাকে। যতক্ষণ শরীরে শেষ এনার্জিটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটা চলতেই থাকে। যতক্ষণ ঘুমোয় সেই সময়টুকুই যা শান্তি।
পরস্পর কামড়াকামড়ি চুলোচুলি করে মনুষ্যজাতির যে অংশটা পাকিস্তানে সর্বস্ব খুইয়ে এসে এই স্টেশনে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ কী? কী করবে তারা? কোথায় যাবে? এদের মানুষের মতো বেঁচে থাকার ব্যবস্থা কি সরকার করে দেবে? না কি এই চত্বরেই তারা বিলীন হয়ে যাবে?
শিয়ালদা স্টেশনে এলে এইসব চিন্তা নানা অদৃশ্য সুড়ঙ্গ দিয়ে বিনয়ের মাথায় ঢুকে পড়ে। যতবার আসে, তার মন বিষাদে ভরে যায়। সেই রেশ থাকে অনেকক্ষণ। আজও মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য। তার পুরো ভাবনা জুড়ে রয়েছে ঝিনুক। গাদাগাদি করে পড়ে থাকা এই উদ্বাস্তুদের নিয়ে দুশ্চিন্তাটা উড়ো মেঘের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
স্টেশন বিল্ডিংয়ে ঢুকে আগরপাড়ার টিকেট কাটল বিনয়। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ডাউনের দিকের গাড়িগুলোতে এ-সময় ভিড় থাকে না। প্রায় কঁকা একটা কামরায় উঠে বসে পড়ল সে। কয়েক মিনিট বাদেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
জানালার চৌকো ফ্রেমে বাইরের পরিচিত চলমান সব দৃশ্য বিনয়ের চোখের সামনে দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে। ডোবা, খাল, মাঝে মাঝে লোকালয়, কঁকা মাঠ ইত্যাদি। আনমনা তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেয়াল হল, আগে না জানিয়ে হঠাৎ চলে এল। যুগলকে রুজি রোজগারের ধান্দায় বেরিয়ে যেতে হয়। বিলের মাছ মেরে বেলঘরিয়ায় বেচতে গেলে তাড়াতাড়িই সে ঘরে ফিরতে পারে। কিন্তু রোজ তো আর জাল কি পলোতে মাছ পড়ে না। তখন সস্তা মালপত্র ফেরি করতে বেয়োয়। এ তো ঘড়ি-ধরা কাজ নয় যে অমুক সময়ে বেরিয়ে অমুক সময়ে চলে এলাম। ফেরি করতে বেরুলে কখন ফিরবে তার ঠিক থাকে না। কলোনিতে গিয়ে যদি যুগলকে পাওয়া না যায়?
বিনয় ভাবল, তাকে দুটোয় অফিসে হাজিরা দিতে হবে। যুগলের সঙ্গে দেখা না হলে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে না। অগত্যা পাখিকে বলে আসবে, যুগলকে যেন দুচার দিনের ভেতর কলকাতায় সুধাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।
আগরপাড়া স্টেশনে নেমে ফসলকাটা, শূন্য মাঠের ভেতর দিয়ে বিনয় যখন মুকুন্দপুর কলোনিতে পৌঁছল, দিনের তাপাঙ্ক অনেকটাই বেড়েছে। যদিও ঠাণ্ডা উত্তুরে হাওয়া বইছে তবু তপ্ত রোদ শরীরে আরাম ছড়িয়ে দিচ্ছিল। এতটা পথ যে সে হেঁটে এল, একটুও ক্লান্তি লাগছে না।
মুকুন্দপুরে বেশ কয়েকবার এসেছে বিনয়। এখানকার নাড়িনক্ষত্র তার জানা।
কলোনির মাঝখানের লম্বা ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে যুগলদের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিনয়ের চোখে পড়ল, দুপাশের প্রতিটি বাড়িতেই মেয়েরা গেরস্থালির কাজে ভীষণ ব্যস্ত। রান্নাবান্না, ঘর নিকানো, ঝটপাট ইত্যাদি। বেশ কিছু থুড়থুড়ে বুড়োবুড়ি খোলা আকাশের তলায় জলচৌকি কি চটের আসনে বসে সারা শরীরে রোদের তাপ শুষে নিচ্ছে। এধারে ওধারে থোকায় থোকায় কিছু সদ্যযুবতী আর কিশোরকিশোরী কলকল করে সমানে গল্প করছে।
বিনয় যখনই মুকুন্দপুরে আসে, চোখে পড়ে কলোনির বাচ্চাগুলো খোলা জায়গাটায় হুল্লোড় করছে। কিন্তু আজ তাদের একজনেরও দেখা নেই। একটু অবাক হল সে। চকিতের জন্য মনে হল কোথায় যেতে পারে তারা?
যুগলদের বাড়ির কাছাকাছি যখন এসে পড়েছে, সেইসময় কোনও মেয়েমানুষের উঁচু গলা কানে এল, ছুটোবাবু না?
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বিনয়। বাঁদিকের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে যুগলের পিসতুতো বোন টুনি। চোখেমুখে অপার বিস্ময়।
টুনি বলল, আপনে যে আইজ আইবেন, যুগল তো আমাগো কয় নাই!
বিনয় বলে, আমি হঠাৎ চলে এসেছি। যুগলকে আগে কিছু জানাইনি। জিজ্ঞেস করে, যুগল কি বাড়িতে আছে?
আছে। হ্যায় আইজ কামে বাইরায় নাই।
যাক, সারা রাস্তা যে চিন্তাটা বিনয়ের মাথায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল সেটা এখন উধাও। যুগলের সঙ্গে দেখা হচ্ছেই।
এদিকে টুনি আনন্দে, উত্তেজনায় কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এমনিতে নিচু গলায় সে কথা বলতে পারে না। এই মুহূর্তে কণ্ঠস্বর কয়েক পর্দা চড়িয়ে কলোনির লোকজনদের ডাকাডাকি করতে লাগল, তরা হগলে দেইখা যা। আমাগো ছুটোবাবু আইছে রে, ছুটোবাবু আইছে–
ঘরের কাজকর্ম ফেলে চারপাশের বাড়িঘর থেকে নানা বয়সের বউ-ঝিরা বেরিয়ে আসে। এই সময়টা শক্তসমর্থ পুরুষরা কলোনিতে থাকে না। ঘরে পড়ে থাকলে পেটের ভাত জুটবে কোত্থেকে? অথর্ব বুড়োবুড়ি, মেয়েমানুষ আর বাচ্চারা ছাড়া অন্য কারওকে এখন পাওয়া যায় না।
রাজদিয়ার হেমকর্তার নাতিকে মুকুন্দপুরবাসীদের ভীষণ পছন্দ। বিন্দুমাত্র অহমিকা বা নাকউঁচু ভাব নেই। বড় বংশের ছেলে কিন্তু সবার সঙ্গে এমনভাবে মেশে যেন সে তাদেরই একজন।
