দ্বারিক দত্ত জোরে জোরে মাথা নাড়েন, ঠিকই বলেছিস।
নিত্য দাস বলে, এমুন গাও-এলাইনা (গা-এলানো) ভাব করলে চলে! পাকিস্থানে দিনকে দিন। অবোস্থা খারাপের থিকাও খারাপ হইয়া যাইতে আছে। শুনাশুন কানে আইছে, যে কুনোদিন এচ্চেঞ্জ বন্ধ হইয়া যাইব।
সুধা অসীম উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে ছিল। বলল, এখন উপায়?
নিত্য দাস বলল, উপায় একহানই। (একখানাই)। আপনেরা কেও একজন পাকিস্থানে গিয়া জোর কইরা হ্যামকস্তারে রাজি করান। সুস্সু মখি (সামনা সামনি) বইয়া কথা কইলে আমার মনে লয় কাম হইব।
কিন্তু এই মুহূর্তে কে যাবে পাকিস্তানে? সুধারা চুলচেরা আলোচনা করে দেখল, হিরণের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। বাকি থাকে দুজন। আনন্দ আর বিনয়। আনন্দ মাত্র দুবারই রাজদিয়ায় গেছে। পথঘাট, লোকজন কারওকেই চেনে না। যখন সে গিয়েছিল তখন দিনকাল ছিল একরকম। এখন আমূল সমস্ত কিছু পালটে গেছে। এই প্রচণ্ড দুঃসময়ে জলেস্থলে যখন ঘাতকবাহিনী শিকারের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আনন্দ ঝুঁকি নিয়ে যাবে না। হেমনলিনীও তাকে কোনওভাবেই যেতে দেবেন না। বাকি থাকে বিনয়। তার নতুন চাকরি। তাদের কাগজ নূতন ভারত বেরুবার মুখে। এ অবস্থায় সেও যেতে পারবে না।
সব শোনার পর নিত্য দাস বলল, আপনেরা যা কইলেন, বেবাক ঠিক। কেও যাইতে পারলে ভালা অইত। তা যহন সোম্ভব না তহন এক কাম করেন।
কী কাজ? সবাই উন্মুখ হল।
আপনেরা হলে (সকলে), একহান কইরা চিঠি ল্যাখেন। ছোটবাবু, সুধা বইন, সুনীতি বইন, দুই জামাইবাবু, দ্বারিককত্তা–কেও য্যান বাদ না যায়। এমুনভাবে জোর দিয়া ল্যাখবেন যাতে হ্যামকত্তার হুশ হয়। দ্যাশ দ্যাশ কইরা এতকাল তো নাচানাচি করলেন। কী পাইলেন শ্যাষ তরি (অবধি)! পাকিস্থানে আর কিছুদিন থাকলে পরানে বাঁচতে অইব না। পত্রগুলি লিখা অইলে এক লগে খামে ভইরা রাইখেন। আমি দিন দুই পরে আইয়া লইয়া যামু ।
নিত্য দাস লেখাপড়া খুব একটা শেখেনি। তবে তার জাগতিক বুদ্ধি খুবই তীক্ষ্ণ। তার যুক্তিতে ধার আছে। বিনয় একা চিঠি লিখলে যতটা কাজ হবে, একসঙ্গে সবাই মিলে লিখলে তার বহুগুণ। ফল পাওয়া যাবে। এতজনের সমবেত চাপে হেমনাথ অটল থাকতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি বিনিময়ে রাজি হয়ে যাবেন।
দ্বারিক দত্ত বললেন, খুব ভাল বলেছিস নিত্য। আমরা সবাই লিখব।
নিত্য দাস আর বসল না। সে যখন উঠে পড়েছে, হঠাৎ অধর ভুইমালীর কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। সে ব্যস্তভাবে নিত্যকে বলল, দাস মশাই, একজন রিফিউজি তার পাকিস্তানের সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ করতে চায়। দেশ থেকে আসার সময় বুদ্ধি করে দলিলপত্র নিয়ে এসেছে। আপনি কি তাকে সাহায্য করতে পারবেন?
নিত্য দাসের চোখেমুখে ঝিলিক খেলে যায়। ব্যগ্র স্বরে সে বলে, নিয্যস (নিশ্চয়ই) পারুম। এই কইরা কইরা হাড়ি পাকাইয়া ফালাইতে আছি। কই থাকে লোকটা? তেনির নাম-ঠিকানা দ্যান
অধর ভুইমালীর নামটা জানিয়ে দিল বিনয়। তারপর সে যেখানে থাকে সেই সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পশ্লিতে কীভাবে যেতে হবে, বিশদভাবে বুঝিয়ে দিল।
নিত্য দাস বলল, কাইল বিহানে (সকালে) গিয়াই অধর ভুইমালীর লগে দেখা করুম। মাস খানেকও লাগব না, তেনিরে কইলকাতার ধারে কাছে জমিজিরাতের ভালা বোন্দবস্ত কইরা দিমু একটু থেমে আক্ষেপের সুরে বলে, এইরকম বুদ্ধি যদিন হ্যামকার থাকত!
নিত্য দাস যখন গেল, প্রায় বারোটা বাজে। অফিসের সময় হয়ে এসেছে। বিনয় স্নান করে ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ল।
.
৪৪.
কাল সকালে দিবাকর পালিতের সঙ্গে দেখা করতে থানায় গিয়েছিল বিনয়। তাই কোনও রিফিউজি কলোনি বা ক্যাম্পে যাওয়া হয়নি। আজও গেল না। ঝিনুকের চিন্তাটা তাকে এমনই উতলা করে রেখেছে যে সকালে উঠেই চা আর জলখাবার খেয়ে সে মুকুন্দপুরে ছুটল। সুধাকে বলল, দুপুরে খেতে আসবে না। অফিস করে ফিরবে সেই রাত্তিরে।
দিবাকর পালিত কাল বলেছেন, শিয়ালদা মেন লাইনে যত থানা রয়েছে, সব জায়গায় খবর পাঠাবেন। এই বিশাল এলাকার প্রতিটি থানার ওসি যাতে তাদের আওতায় সমস্ত কলোনি আর গ্রামগঞ্জ তোলপাড় করে ঝিনুককে খুঁজে বার করার ব্যবস্থা করেন তা বিশেষভাবে বলে দেবেন।
দিবাকরকে যতটুকু বিনয় দেখেছে, মনে হয়েছে মানুষটি যথেষ্ট আন্তরিক। হৃদয়বান। ঝিনুকের হদিস যে এতকাল পাননি সেজন্য তার সংকোচ আর আক্ষেপের শেষ নেই। লোকদেখানো ব্যাপার নয়। সত্যি সত্যিই ঝিনুকের জন্য তিনি বিচলিত।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রাম, বাস পালটে পালটে শিয়ালদা চলে এল বিনয়। বেশ কয়েকবার যাতায়াতের ফলে এদিকের রাস্তাটাস্তা সড়গড় হয়ে গেছে তার।
স্টেশন চত্বরটা অবিকল আগের মতোই। বরং ওপার থেকে আসা মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে। যেদিকেই তাকানো যাক, সারি সারি শীর্ণ, শঙ্কাতুর, মলিন মুখ। জলের কলগুলোর সামনে লম্বা লাইন। লাইন অল্প কটি পায়খানার সামনেও। চারদিকে ধুলো ময়লা আবর্জনার ভঁই। রয়েছে থুতু, দলা দলা কফ, পোড়া বিড়ির অগুনতি টুকরো। এধারে ওধারে কত যে বাচ্চা মুক্ত আকাশের তলায় পায়খানা করছে, পেচ্ছাপে ভাসিয়ে দিচ্ছে। গু, মুত আর পচা জঞ্জালের দুর্গন্ধ এখানকার বাতাসে অনড় হয়ে আছে। যখনই বিনয় শিয়ালদায় আসে এই চিরস্থায়ী কদর্য গন্ধটা নাক দিয়ে ঢুকে ভেতরে যায়। পেটের নাড়িগুলো পাক দিয়ে ওঠে। আজও তাই হল।
