তোমাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা জানাইয়াছিলাম। আমার এখনও আশা, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়া পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতেই কাল হউক, পরশু হউক, কী দুই-দশ বছর পরেই হউক, ইহার উদ্ভব ঘটিবে।
একদিকে গভীর অন্ধকার, অন্যদিকে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা। ইহার মধ্যিখানে দাঁড়াইয়া কোনও প্রকার সিদ্ধান্ত লইতে পারিতেছি না। নৈরাশ্য যখন প্রবলভাবে গ্রাস করে তখন ভাবি, ইন্ডিয়ায় চলিয়া যাইব। পরক্ষণে চিন্তা করি, ভাষা আন্দোলনের হাত ধরিয়া সুদিন আসিবার ক্ষীণ একটু সম্ভাবনা তো দেখা দিয়াছে। তবে কেন পলাইয়া যাইব? মনের এক বিভ্রান্ত অবস্থায় দিন কাটাইতেছি। জন্মভূমি হইতে শিকড় উপড়াইয়া লইয়া অন্য দেশে চলিয়া যাওয়া কি সহজ কাজ? যাওয়ার কথা মনে হইলেই বত্রিশ নাড়িতে টান পড়ে।
আমি আর কিছুদিন অপেক্ষা করিয়া দেখিতে চাই। তারপর সকলের পরামর্শ লইয়া যাহা সঙ্গ ত মনে হয় তাহাই করিব। জয়নাল বলিয়াছে, সে সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া উঠিয়াছে। এখন নিয়মিত আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিতে পারিবে। ভরসা দিয়াছে, তুমি পত্র লিখিলে এক সপ্তাহের মধ্যে আমার জবাব তোমার কাছে পৌঁছাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি লিখিলে ওই সময়ের মধ্যেই তোমার উত্তর রাজদিয়ায় লইয়া আসিবে।
আশা করি, কুশলে আছ। তোমরা আমাদের আশীর্বাদ লইও। ইতি–দাদু।
.
চিঠি পড়া শেষ হলে সারা ঘর জুড়ে অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে আসে।
একসময় হতাশার সুরে দ্বারিক দত্ত বলে ওঠেন, পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ! টু নেশন থিওরির ওপর দেশটা ভাগ হল, তা কি হেমের মাথায় নেই! ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, সারাক্ষণ ওর খালি বাঙালি আর বাঙালি। যেন স্বপ্নের ঘোরে থাকে। আরে বাপু, লিয়াকত আলিরা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে, এখন আর বাঙালি টাঙালি না। স্রেফ হিন্দু আর মুসলমান। একটু থেমে ফের বললেন, এত বয়েস হয়েছে, পাকিস্তানে মহাবিপদের মধ্যে রয়েছে, তবু বাস্তববোধটা হল না হেমের।
দ্বারিক দত্তর কথাগুলো খানিক বুঝল নিত্য দাস। বেশিটাই মাথায় ঢুকল না। তবে বাস্তববোধ শব্দটা বেশ মনে ধরেছে। সে আক্ষেপ করতে থাকে, ঠিকই কইছেন। হ্যামকায় এমুন পণ্ডিত মানুষ, কত লিখাপড়া করছেন কিন্তুক আসল বুদ্ধিসুদ্ধিই নাই। কই শাজাহান সাহেবের অত ভালা জমিন আর বাড়িঘরের লগে নিজেগো সোম্পত্তি এঞ্জে কইরা চইলা আইবেন, ইন্ডিয়ায় আইয়া শান্তি মতো থাকবেন, তা না। মাটি কামড়াইয়া পইড়া রইলেন পাকিস্থানে! এমুন সোনার সুযুগ কেও ছাড়ে।
দ্বারিক দত্ত সায় দিলেন, হেমের মতিগতি কিছুই বুঝি না। বদ্ধ পাগল না হলে কেউ এখন। পাকিস্তানে পড়ে থাকে! আরে বাপু, তোমার নাতি-নাতনি, আত্মীয়-বন্ধু সব এপারে চলে এসেছে। শেষ জীবনটা তাদের কাছে আনন্দ করে কাটাও। প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করে আসবে। তোমাকে তো কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।
একটু চুপচাপ।
তারপর দ্বারিক দত্ত আবার শুরু করলেন। বিনয়কে বললেন, একটা কথা ভেবে দেখেছিস?
হেমনাথ সম্পর্কে আগে থেকেই প্রবল দুশ্চিন্তায় ছিল বিনয়। চিঠিটা পড়ার পর সেটা সহস্র গুণ বেড়ে গেছে। দ্বারিক দত্তর দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, কী ভাবব?
হেমনাথের হঠাৎ যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়, বউঠাকরুন আর শিবানীর কী হবে? কে তাদের দেখবে?
কী ইঙ্গিত দিলেন দ্বারিক দত্ত? জমি চাষের অধিকার চেয়েছে আসাদুল। খুবই বিনীতভাবে, সম্ভ্রমের সুরে। কিন্তু তিন-চার মাস বাদে হেমনাথ যখন তাকে ফিরিয়ে দেবেন, কোনও মতেই ভাগচাষে রাজি হবেন না, তখন কী মূর্তি ধারণ করবে আসাদুল মিয়া? জনবল, অর্থবল তার বিপুল। পাকিস্তানের আবহাওয়া যখন বিষবাষ্পে-ভরা, রাতের অন্ধকারে লহমায় অঘটন ঘটে যেতে পারে। হঠাৎ হেমনাথের। অপমৃত্যু হলে একটা প্রাচীন মহাবৃক্ষের পতন ঘটবে। তার প্রতিক্রিয়া হবে নানাদিক থেকে। রাজদিয়া এবং তার চারপাশের বিশ তিরিশটা গ্রামের হতদরিদ্র সব মানুষ–হিন্দু আর মুসলমান–যাদের সুখে দুঃখে আজীবন তিনি জড়িয়ে আছেন, যাদের বিপদের দিনে, সংকটের মুহূর্তে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তারা শোকে একেবারে ভেঙে পড়বে। হেমনাথের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের ওই অঞ্চল জুড়ে হা-হুতাশ চলবে দীর্ঘকাল। তা ছাড়া যে হিন্দুরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে এখনও ওখানে পড়ে আছে, তারা আর এক দণ্ডও থাকবে না। ভিটেমাটি ফেলে বউ ছেলেমেয়ের হাত ধরে তারপাশা কি মুন্সিগঞ্জে গিয়ে গোয়ালন্দের স্টিমার ধরবে। গোয়ালন্দ থেকে রিফিউজি স্পেশাল-এ সোজা কলকাতায়। কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক ক্ষতি হবে শিবানী আর স্নেহলতার। নির্বান্ধব রাজদিয়ায় তাদের বাকি জীবন কাটবে কীভাবে?
হঠাৎ বিনয়ের মাথায় দুশ্চিন্তার বদলে তীব্র ক্ষোভ আর রাগ জমা হতে থাকে। হেমনাথকে মনে হয় চরম অপরিণামদর্শী। এত বয়স হল, এক জীবনে কত কিছু দেখলেন–বহুকাল আগের সেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রথম এবং দ্বিতীয় দুই মহাযুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ, পূর্ববাংলা ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ইন্ডিয়ায় চলে আসা–তবু আকাশকুসুম অলীক এক স্বপ্নের ঘোরেই রয়েছেন। সেই স্বপ্নটিকে লালন করা ছাড়া অন্য কোনও দিকে তার নজর নেই।
নিত্য দাস বলে উঠল, শাজাহান সাহেবের লগে পরশু দেখা হইছিল। জবর তাগিদ দিতে আছেন। অন্য গাহেক তেনারে ছাইকা ধরছে। আমি তেনার হাতে-পায়ে ধইরা চৈদ্দ পনরো দিন সোময় চাইয়া লইছি। এই শ্যাষ। এইর মইদ্যে যদিন হ্যামকত্তা কিছু না করেন, শাজাহান সাহেব অন্যের লগে সোম্পত্তি এচ্চেঞ্জ কইরা পাকিস্থানে চইলা যাইবেন। এত বড় গাহেক আমার হাতে আর এউইক্কাও (একটাও) নাই। তেনি এইবার ছুঁইটা গালে হাত কামড়ান ছাড়া কিছু করনের থাকব না।
