ইতিমধ্যে দুইটি ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা আমার মনোবল অনেকখানি ভাঙিয়া দিয়াছে।
প্রথম ঘটনাটি এই প্রকার। তুমি গিরিগঞ্জের আসাদুল মিয়াকে নিশ্চয়ই চেন। আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে আসিত। আমাকে নিজের বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করিত।
আসাদুল বড় ধানী গৃহস্থ। প্রায় দেড় শ কানি জমির মালিক। গিরিগঞ্জের বাজারে নদীর ধার ঘেঁষিয়া তাহার ধান এবং পাটের বড় বড় আড়ত। ভূসম্পত্তি ছাড়াও তাহার পঞ্চাশখানা নানা ধরনের নৌকাও আছে–এক মাল্লাই, দোমাল্লাই, চারমাল্লাই, কোষ আর এক শ মণী দুই শমণী ভড়।
সেই আসাদুল গত সপ্তাহে আমাদের বাড়ি আসিয়া হাজির। এমনিতে খুব ভদ্র এবং বিনয়ী। সে আমাকে আগের মতোই প্রণাম করিল। তারপর মিঠাই খাইতে খাইতে একথা সে-কথার পর সসংকোচে বলিল, একহান কথা কমু যদিন কিছু মনে না করেন বড়ভাই।
বিনু, তোমার কি মনে আছে, আসাদুল আমাকে বড়ভাই বলিয়া ডাকে? তাহার হাবভাব এবং ভণিতা লক্ষ করিয়া আমি ভিতরে ভিতরে সতর্ক হইলাম। নিশ্চয়ই কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য লইয়া সে আমার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছে। আমার মনোভাব তাহাকে বুঝিতে না দিয়া বলিলাম, মনে করব কেন? যা বলবি বল
কিছুক্ষণ ইতস্তত করিয়া আসাদুল বলিল, দ্যাশের গতিক নিজের চৌখেই দ্যাখতে আছেন। দিনকে দিন খারাপের দিকে যাইতে আছে। ভালা যে হইব তার কুনো লক্ষণ নাই। আমি একহান মোন্দ খবর পাইছি
কী খবর রে?
কিছু শয়তান লোক তলে তলে আপনের বিষয় সোম্পত্তি দখল করনের লেইগা মতলব করতে আছে।
আসাদুলের কথা শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, তুই জানলি কী করে?
আসাদুল জানাইল, শুনাশুন কানে আইছে।
এই লোকগুলো কারা?
মাপ করেন, হেইটা আমি কইতে পারুম না বড়ভাই।
কী করে দখল করবে? আমি তো এখনও দেশেই আছি। তা হলে কি আমাকে মেরে ধরে কেড়ে নেবে, নাকি খুন করবে?
জানো বিনু, আমার প্রশ্নটার উত্তর না দিয়া আসাদুল বলিল, এক কাম করেন বড়ভাই, আপনের জমিন বাঁচাইতে হইলে আমারে দিয়া দ্যান। এমুনভাবে লিখাপড়ি হইব যে চাষ এবং দেখাশুনার লেইগা আমারে দিতে আছেন। চাষের বেবাক খরচপাতি আমার। আপনে ফসলের আধাআধি ভাগ পাইবেন।
বিনু, বুঝিতে পারিলাম, এতদিন যে হুমকি দেওয়া চিঠি পাইয়াছি সেগুলি আসাদুলই পাঠাইয়াছে। তাহা ছাড়া কেউ আমাকে খুন করিয়া জমিজমা কাড়িয়া লইতে চায় না। কাল্পনিক হত্যাকারীর ভয় দেখাইয়া আসাদুলই কৌশলে উহা গ্রাস করিতে চায়। একবার লিখিয়া পড়িয়া চাষের অনুমতি দিলে আসাদুলকে ইহজন্মে আর হটানো যাইবে না। সে জানে, তোমরা কেউ আর রাজদিয়ায় ফিরিয়া আসিবে না। আমি বৃদ্ধ হইয়াছি। আমার মৃত্যুর পর আমাদের জমির উপর তাহার স্বত্ব পুরাপুরি কায়েম হইবে। আসাদুল অবশ্য বলিয়াছে, এখনই লেখাপড়া করিতে হইবে না। এই বিষয়ে চিন্তা করিবার জন্য সে আমাকে তিন-চার মাস সময় দিয়াছে।
এই সেদিন পাকিস্তানের জন্ম হইল। ইহারই মধ্যে মানুষ কত বদলাইয়া গিয়াছে। কেউ গায়ের জোরে অসহায় মানুষের বিষয় আশয় ছিনাইয়া লইতেছে। আবার আসাদুলের মতো কেউ ফন্দি আঁটিয়া কাজ শুছাইয়া লইতেছে।
সেই যে আসাদুল আসিয়াছিল, তারপর তাহার সম্বন্ধে অনেক কথাই কানে আসিতেছে। ভালমানুষ সাজিয়া সে আমাকে যা প্রস্তাব দিয়াছিল, ঠিক সেই উপায়েই রাজদিয়ার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির অনেকেরই জমি মুঠায় পুরিয়াছে। এই লোকটিকে তাহার বাল্যকাল হইতে দেখিয়া আসিতেছি। যে-আসাদুলকে চিনিতাম, সে আর তেমনটি নাই। এখন সে কূট, চতুর, অতীব ধুরন্ধর। মানুষ সম্পর্কে আমার ধারণা দ্রুত পালটাইয়া যাইতেছে।
বিনু, এবার তোমাকে দ্বিতীয় ঘটনাটির কথা জানাইতেছি। ইহা আরও মারাত্মক।
রাজদিয়ার দক্ষিণ দিকে সোনাখালি গ্রামের ধনা আর মনা বারুই-এর কথা মনে আছে কি? এই দুই ভাই সুজনগঞ্জের হাটে গিয়া পান বেচিত। হতদরিদ্র, সাদাসিধা মানুষ। ধনারা সম্প্রতি ভয়ে কিংবা চাপে মুসলমান হইয়াছে। খবরটা শুনিবার পর তোমাদের প্রাক্তন হেড মাস্টার মোতাহার হোসেন তাহার কয়েকজন পুরানো ছাত্রকে সঙ্গে লইয়া এই ঘটনার প্রতিবাদ করিতে সোনাখালি গিয়াছিল। মোতাহার মনে করে, মানুষ যদি স্বেচ্ছায় পিতৃপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করিয়া অন্য ধর্ম গ্রহণ করে, কিছু বলিবার নাই। কিন্তু ত্রাস বা জুলুমের কারণে করিলে তাহা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।
সোনাখালি গিয়া মোতাহারেরা রাজাকার আর পশ্চিমাদের হাতে প্রচণ্ড মার খাইয়া আসিয়াছে। মোতাহারের মুখ মাথা ফাটিয়া গিয়াছে। একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড। হাঁটু এবং ডান হাতের হাড় ভাঙিয়াছে। হাতে-পায়ে প্লাস্টার আর মুখে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় বর্তমানে সে শয্যাশায়ী। রোজই তাহাকে দেখিতে যাই। শারীরিক আঘাত সে যতটা পাইয়াছে, তাহার সহস্র গুণ আঘাত পাইয়াছে মানসিক দিক হইতে। ইদানীং সর্বক্ষণ মোতাহার মুহ্যমান হইয়া থাকে।
এদিকে তোমার দুই দিদা চারিদিকের হাল দেখিয়া অস্থির হইয়া উঠিয়াছে। তাহারা আর দেশে থাকিতে চাহিতেছে না। স্বীকার করিতে দ্বিধা নাই, আমার আত্মবিশ্বাস কিছুটা হইলেও টলিয়া গিয়াছে।
তোমাকে আগের পত্রে জানাইয়াছিলাম, বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হইয়াছে। সেই আন্দোলন দ্রুত নানা জিলা এবং মহকুমার শহরে শহরে ছড়াইয়া পড়িতেছে। এমনকি আমাদের এই ক্ষুদ্র রাজদিয়ায়ও বাদ যায় নাই।
